হিন্দু-মুসলমান একতা। ছবি হাফিংটন পোস্ট ডট ইন।
jahir raihan
জাহির রায়হান

উপলক্ষ জাগ প্রদান। দাদার ফরমায়েস ছিল ভালো মানের দুটো কাচের জাগ কিনতে হবে তাদের জন্য। জেলার মুসলিম পরিবারে কাচের বাসনকোসনের নিত্য ব্যবহার হয় জেনেই দাদার এই ফরমায়েস। তো জাগ ক্রয় অভিযানে বেরিয়ে রাস্তা পারাপারের সময় উড়ন্ত বাইকের ধাক্কা খেয়ে আমার বাহন, সবেধন সাধারণ সাইকেলখানি তুবড়ে গেল, পায়ের গোড়ালির কাছে কেটে গিয়ে রক্তপাতও হল বিস্তর। মধ্যমগ্রামে বসে বসে ভাইয়ের এই রক্তারক্তি কাণ্ডের হদিস দাদা পাননি, আসলে আমি দিইনি। এই লেখা পড়ার পর দাদা বিশুদ্ধ ইংরাজিতে বেশ কিছু উৎকৃষ্ট মানের আন্তর্জাতিক গালাগালি যে আমায় দেবেন, তা জানি আমি ।

তা যাক গে, জাগ কিনে বাড়িতে রাখা হল। হিসেব করে দেখলাম, কাচের জাগ মধ্যমগ্রাম পৌঁছে দিতে যা রাহা খরচ হবে তা রীতিমতো লোকসান অর্থাৎ লাভ করি আমি, খেয়ে যায় হরিপদ নামক পিঁপড়ে। সুতরাং উপযুক্ত সময়ের অপেক্ষা করতে থাকলাম দাদা-ভাইয়ে। এ দিকে মনে মনে ঠিক করেছি জাগ কিনতে গিয়ে শরীর থেকে যে পরিমাণ রক্ত ঝরেছে খামোখা, তার তোড় তুলব দাদার বাড়িতে চর্ব-চষ্য-লেহ্য-পেয় সাঁটিয়ে উদরস্থ করে। বেশি দিন অপেক্ষা করতে হল না। মেসেজ পেলাম, ১৪ জুলাই শনিবার হাবড়া এসো, আমার পৈতৃক ভিটে দেখে যাও। ১৪ জুলাই আমার চাকরিজীবনের প্রথম দিন। সেই দিনটি এমন বিদগ্ধ ব্যক্তির সান্নিধ্যে কাটবে, সেটা জেনে মনে মনে খুশি হলাম। যাওয়ার আগে আরও একটি ফরমায়েস এল, ভালো মানের একটা বাংলা কোরাণ শরীফ যেন নিয়ে যাওয়া হয়।

আরও পড়া রবিবারের পড়া ২ / ছাপোষা ভোটকর্মীর কিসসা

জানতাম হাবড়া গেলে দাদার শ্বশুরবাড়িও যেতে হবে, কারণ শ্বশুরের মেয়ের বাবার বাড়ি ওই এলাকাতেই। অতএব কাচের জাগ, কোরাণ শরীফ-এর সাথে যোগ হল, এক হাঁড়ি মনোহরা। প্রসঙ্গত পাঠকবন্ধুদের জানাই, ফুলকপি, কাঁচালঙ্কা, গামছা ও মনোহরা আমার ছাপোষা শহর বেলডাঙ্গার নাম করা বিষয়আশয়। এবং ওই সম্পদগুলোর প্রতি আমি দুর্নিবার গর্ব অনুভব করি। আপনারা আমায় নিমন্ত্রণ করলে যথারীতি তার স্বাদ আস্বাদ পেতে পারেন।

রানাঘাট থেকে বনগাঁ যাওয়ার রেললাইন রয়েছে, জানি অনেক আগে থেকে, যদিও ও পথে যাইনি কখনও। খাতা-কলম নিয়ে হিসেব করতে বসে দেখলাম রানাঘাট থেকে ভায়া দমদম হাবড়া ১০৩ কিমি পথ. আর ওই একই হাবড়া ভায়া বনগাঁ গেলে ৬৬ কিমি মাত্র। তা হলে কেনই বা দমদম যাব? নতুন পথেই যাব, রথ দেখা কলা বেচা দুইই হবে। মনে পড়ল, ১৪ জুলাই আবার রথযাত্রার দিন। দাদার বাড়ি না গেলে মাহেশ যেতাম রথ দেখতে। রিষড়ার সুদীপ পালকে যখন জানালাম ভাই, মাহেশ এ বছর আর যাওয়া যাচ্ছে না। সে দুঃখ-কাতর ইমোজি পাঠাল বড়ো করে।

ভাগীরথী এক্সপ্রেস ধরে রানাঘাট, লোকাল ট্রেনে বনগাঁ, সেখান থেকে ট্রেন বদলিয়ে হাবড়া। স্টেশন যখন ঢুকছি, আকাশ ভেঙে মূষলধারে হয়ে চলেছে রথযাত্রার বৃষ্টি। নিজের মাথার কথা বাদ দিয়ে মাথায় এল মনোহরার হাঁড়ি বাঁচানোর চিন্তা। বৃষ্টির জলে মনোহরা গলে হাবড়াময় হবে কিনা কে জানে। ও দিকে পকেটে বাজছে মিঃ সরকার। তুলে হ্যালো বলতেই বললেন, টিকিট কাউন্টারের সামনে দাঁড়িয়ে আছি, তাড়াহুড়ো করার দরকার নেই ধীরে সুস্থে এসো।

বনগাঁ, গোবরডাঙা, হাবড়া, অশোকনগরের বহু ছেলেমেয়ে পড়ত আমার সঙ্গে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে। অনেকের সঙ্গেই হৃদতা, ঘনিষ্ঠতা ছিল আমার। এক জনের প্রতি তো দুর্বলও ছিলাম বাড়াবাড়ি রকমের, অবশ্য সে ইউনি’তে আমার জুনিয়র ছিল। এবং কোনো দিনও জানতে পারেনি আমার হৃদয়প্রাবল্যের কথা। দাদার সঙ্গে কোলাকুলিটা হয়ে গেল প্ল্যাটফর্মেই। রিকশায় উঠে দাদা বললেন, হিজলপুকুর চলো।

আরও পড়ুন রবিবারের পড়া : সেই সব লেখক আর সেই সব প্রকাশক

হিজলপুকুর দাদার শ্বশুরঘর। চেপে ধরলাম তাঁকে, এ কথা তো ছিল না দাদা, আমি তো জানি আপনার বাড়ি যাচ্ছি। একে আমি বিধর্মী, শুনে মুসলমান, আপনার সাথে আমার আদানপ্রদানে সমস্যা হয় না, কিন্তু আপনার শ্বশুরবাড়ির লোক অপরিচিত এই ভুলভাল বেজাতীয় লোককে মানবে কেন? দাদা বললেন, জাহির তোমার কোনো অসুবিধে হবে না, অসুবিধে হলে আমরা প্রফুল্লনগরের বাড়ি চলে যাব। আমি তা-ও মানতে চাইলাম না। কারণ থালা-বাটি-গেলাস, শালপাতা-বেলপাতা কোনো কিছুতেই আমার কোনো সমস্যা হয় না, কিন্তু আমার উপস্থিতির কারণে তাদের যদি কোনো অসুবিধে হয়, সে দায়ি্ত্ব কে নেবে?

যে গুটিকতক মানুষের কথার বিরুদ্ধাচারণ করি না, অভিজিৎ দাস সরকার তাঁদের মধ্যে একজন। অগত্যা হিজলপুকুর। কলিংবেলের ধ্বনি শুনেই দরজা খুলল বৌঠান, ডায়েটিং-এর খপ্পরে পড়ে শুকিয়ে আমসি। প্রকাণ্ড বাড়ি, দৃষ্টিনন্দন। বাড়ির কর্তা বাইরে। দাদার শাশুড়ি-মা অর্থাৎ বাড়ির কর্ত্রীকে প্রণামপর্বের পরই সামান্য আলাপচারিতাতেই বুঝলাম, অন্তত আমি এ বাড়িতে অচ্ছুত নই। বরাবরই হিন্দু পরিবারের সঙ্গে আমার মেলামেশা। আমার বন্ধু, আমার সহকর্মীদের বাড়িতে আমার নিত্য যাতায়াত, কোনো দিন তাদের সঙ্গে মেলামেশায় অস্বস্ত্বিকর অবস্থায় পড়তে হয়নি, আজও হল না। আমি তাঁর জামাইয়ের ভাই, রক্তের সম্পর্ক নেই, মনের সম্পর্ক রয়েছে। তিনি সেটা জানেন। না জানলেও অসুবিধে ছিল না, ততক্ষণে তাঁর মধ্যে আমি সেই সত্তার খোঁজ পেয়ে গেছি যাকে আমরা ডাকি ‘মা’ বলে।

দাদা আবার বেরোলেন, আমি গেলাম ঘুমের দেশে। আসলে এসেছিও সেই কারণে, খাব আর ঘুমোব। কোনো কাজ নেই, কোনো তাড়া নেই এবং মোবাইল ফোন তালাক-তালাক-তালাক। গোটা বাড়ি জুড়ে হরেক দেবদেবীর ছবি ও মূর্তি। এ-ঘর ও-ঘর করে বেড়াচ্ছি, পরণে বারমুডা, পায়ে চপ্পল, তাতেও দেখলাম কোনো দেবতা ক্ষুণ্ণ হচ্ছেন না। বৌঠান বলল, আমাদের ঠাকুরঘর দেখবে? উত্তর করলাম, স্নানের পর। তার পরেই নিজের বোধে নিজেই খুশি হলাম। তাই তো, ধর্ম, দেবতা, আল্লা, ফেরেস্তা মানুন না মানুন সমস্যা নেই। কিন্তু কারো বিশ্বাসের যদি যথাযোগ্য মর্যাদা দেওয়া যায় তাতেও তো বহু সমস্যার সমাধান হয়।

আরও পড়ুন রবিবারের পড়া : বইয়ের প্রাচীনত্ব, প্রাচীনতম বই

আমি কোনো দিন জান্নাতবাসী হব, বিশ্বাস করি না। আমি কোনো দিন নরকবাসী হব কিনা, তা-ও জানি না। আমি শুধু জানি সরস্বতীপুজোয় নিষ্ঠাভরে পুষ্পাঞ্জলি দিলে আমার কোনো ক্ষতি হবে না। আমি শুধু জানি কৃষ্ণনগরের চার্চে অথবা জগদ্ধাত্রীপুজোর নরনারায়ণ সেবায় সবার সাথে বসে খিচুড়ি খেলে আমার ক্ষুধানিবৃত্তি হয়, আমি শুধু জানি বর্ধমানের মুসলিম যুবক তার অনাথ হিন্দু বন্ধুর শ্রাদ্ধশান্তি করতে পারে কোনো দ্বিধা ছাড়াই, আমি শুধু জানি রক্তের রঙ হয় লাল আর তার গ্রুপ হয় এ, বি, এবি, ও ইত্যাদি ইত্যাদি, হিন্দু-মুসলিম-খ্রিস্টান-জৈন-বৌদ্ধ নয়। আমি শুধু জানি আমার দাদা, অভিজিৎ দাস সরকার কোরাণ শরীফ পড়তে চান, তাঁর শ্বাশুড়ি মা শ্রীমতি চন্দ্রা কর্মকার চমৎকার ও নির্ভুল উচ্চারণে আরবী আয়াত হুবহু বলতে পারেন, যা আমিও পারি না।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here