palanquin in kolkata

সিদ্ধার্থ বসু

সেকালের বাহন

সে কালে বাংলাদেশের পথঘাট যেমন উন্নত ছিল না, তেমনই শুধুমাত্র স্থলপথে যোগাযোগ ব্যবস্থা বলতে ছিল হাঁটা, ঘোড়ার গাড়ি, ডুলি আর পালকি। ঘোড়ার গাড়ির আগে এসেছিল পালকি। কলকাতা শহরে এই পালকির ব্যবহার শুরু হয়েছিল অষ্টাদশ শতাব্দীর গোড়াতেই। পালকির ব্যবহারকারীরা ছিলেন অবস্থাপন্ন মানুষ। সাধারণ মানুষের ভরসা ছিল নিজের পা। অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ দিকে ঘোড়ার গাড়ির প্রচলন হয়। এই গাড়ি ব্যবহারকারীগণ ছিলেন কলকাতার সাহেবসুবোরা। তবে এটা সত্যি যে অনেক সাহেবসুবোরই আবার পছন্দের তালিকায় ছিল পালকি। সাহেবদের ঘোড়ার গাড়ির যেমন সংখ্যা বেড়েছিল, তেমনি পাশাপাশি এটাও সত্যি যে, পালকির সংখ্যা দিনে দিনে কমে তো নি-ই, বরং উত্তরোত্তর বেড়েছিল।

পালকি শুধু যে এ দেশি বড়লোক, ধনী-জমিদাররা ব্যবহার করতেন তা নয়, খোদ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বড়ো কর্তারাও এই পালকি ব্যবহার করতেন। আর এই পালকির জন্য থাকত বেহারা। এই বেহারার সংখ্যা ছিল এক একটি পালকিতে মোট চার জন। কিন্তু মজার কথা হচ্ছে, এই পালকিকে ঘিরেও ছিল লড়াই, বড়ো কর্তাব্যক্তিদের সঙ্গে ছোটো কর্তাদের। কারণ বড়ো কর্তাদের নির্দেশে ছোটো কর্তারা পালকি ও বেহারা রাখতে পারতেন না। ছোটো কর্তা অর্থাৎ রাইটারদের পালকি ব্যবহার নিষিদ্ধ ছিল। এর দু’টো কারণ ছিল, একটি অর্থনৈতিক এবং অপরটি ছিল পদমর্যাদার। অর্থনৈতিক দিক থেকে সেই সময়ে পালকির ব্যবহার ছিল ব্যয়বহুল। আর বড়ো কর্তা ও ছোটো কর্তা যদি একই সঙ্গে পালকি ব্যবহার করে, সেটা পদমর্যাদা অনুযায়ী ভালো দেখায় না। আসলে এর কারণ হল পদমর্যাদার অহংকার।

পালকি কী ভাবে এল?

পালকির উৎপত্তি কী ভাবে বা কখন তা সঠিক ভাবে জানা যায় না। পালকির অভিধানগত অর্থ ‘মনুষ্যবাহিত যানবিশেষ’, শিবিকা। মনুষ্যবাহিত যান সম্বন্ধে ক্ষিতীন্দ্রনাথ ঠাকুর (মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের তৃতীয় পুত্র হেমেন্দ্রনাথ ঠাকুরের পুত্র) লিখছেন, “ঠিকা গাড়ির বিষয়ে কিছু বলিবার পূর্বে সেকালের অন্যতম বাহন পালকি সম্বন্ধে দুইচারিটি কথা যাহা মনে আসিতেছে, তাহা বলিয়া ফেলি। পালকি শব্দের ব্যুৎপত্তি কি অথবা পালকি সর্ব্বপ্রথম কোথা হইতে আমদানি হইল, সে সমস্তের আলোচনা করিবার ভার আমা অপেক্ষা যোগ্যতর অন্য কোনও ব্যক্তির স্কন্ধে নিক্ষেপ করিলাম।” কিন্তু কোথায় কী ভাবে এর উৎপত্তি, সে বিষয়ে নানা মত থাক বা না থাক, এ কথা সত্যি যে অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রথম থেকেই এই যান বাংলাদেশের অভিজাত শ্রেণির অন্যতম বাহন হয়েছিল। এবং এটাও সত্যি যে শুধুমাত্র দেশীয় অভিজাত শ্রেণির মানুষ নয়, খোদ ইংরাজরা এই পালকিকে অন্যতম বাহন হিসেবে দেখেছে। তাই এর কদর ঘোড়ার গাড়ি থাকা সত্ত্বেও কমেনি, বরং বেড়েছে।

পালকি কারা ব্যবহার করতেন

যদিও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ছোটো কর্তাদের ওপর বড়ো কর্তাদের নির্দেশ ছিল পালকি ব্যবহার না করার, তবুও তাঁরা এই নির্দেশ অমান্য করেই পালকি ব্যবহার করতেন। শুধুমাত্র সরকারি ছোটো-বড়ো কর্তারাই নন, অনেক বেসরকারি সাহেবও এই পালকি ব্যবহার করতেন। বাঙালি ধনী ও উচ্চশিক্ষিত সম্প্রদায়ও এই পালকি ব্যবহার করতেন। শিক্ষাব্রতী মহাত্মা ডেভিড হেয়ার মহাশয় জীবনে কোনো দিন ঘোড়ার গাড়ি ব্যবহার করেননি। তিনি সব সময়ই ব্যবহার করতেন পালকি। স্বয়ং বিদ্যাসাগরমশাই এই পালকি চড়ায় আগ্রহী ছিলেন। তিনি ঘোড়ার গাড়ি চড়ায় তেমন আগ্রহী ছিলেন না। এ ছাড়া জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে এর ব্যবহার ছিল।

st. john's catgedral kolkata 1826, painting by James Baillie Fraser
১৮২৬-এ কলকাতার সেন্ট জনস ক্যাথেড্রাল, জেমস বেইলি ফ্রেজারের আঁকা।

বাঙালি সমাজের সম্ভ্রান্ত ধনী পরিবারের মহিলারা এই পালকি ব্যবহার করতেন। বিশেষ করে কোনো পরবের দিনে তাঁরা পালকি করে গঙ্গাস্নানে যেতেন। ঘেরাটোপ দেওয়া এই পালকি যাত্রীসুদ্ধ গঙ্গার জলে চোবানো হত। তাঁরা এই পালকির বাইরে এসে স্নান করতেন না। এবং আবার এই পালকিতেই তাঁরা ফিরতেন। এই মহিলাদের পালকিতে যাতায়াত বিষয়ে ক্ষিতীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন, “আমাদের বাড়ীর সীমানার ভিতরেও এ বাড়ী ও বাড়ী অর্থাৎ দেবেন্দ্রনাথের বাড়ী হইতে তাঁহার ভাই গিরীন্দ্রনাথের বাড়ী যাতায়াত করিতে গেলেও পালকি ব্যতীত হাঁটিয়া যাওয়া নিষিদ্ধ ছিল, পদব্রজে যাইলে সম্ভ্রমের হানি হইবে বলিয়া বিশ্বাস ছিল। পালকি বাড়ীর ভিতরের বা অন্তঃপুরের ফটকে রাখা হইত।”

সে কালের অল্প মাইনের কেরানিবাবুরাও অফিসের কাজে যাতায়াতের জন্য এই পালকি ব্যবহার করতেন।

পালকির অন্দর ও বাহিরের কথা

পালকির দু’টি শ্রেণিভেদ ছিল। একটি ছিল নিজস্ব পালকি এবং অন্যটি ছিল ভাড়া করা পালকি। নিজস্ব পালকির তলাটা ছিল বেতের বোনা। এই বেতের ওপর থাকত একটা গদি আর পিঠের দিকে থাকত একটা আরামদায়ক তাকিয়া। গদির দু’পাশে থাকত ওই রকমই আরামদায়ক তাকিয়া। এই তাকিয়া ও গদি মোড়া থাকত মরক্কো-চামড়া দিয়ে। এ দেশের রাজা মহারাজাদের পালকি ছিল আরও জাঁকজমকপূর্ণ। তাঁদের পালকি ছিল কিংখাপের ঝালর দেওয়া। মোগল দরবারেও এই পালকির কদর ছিল। তাঁদের পালকি ছিল সুদৃশ্য ঝালরদার। বিশিষ্ট মানুষেরা এই পালকি ব্যবহার করতেন মোগল সম্রাটদের অনুমতিতে। মোগল দরবারে এই পালকি একটা বিশেষ সম্মানের ব্যাপার ছিল, তাই এটি উপহারও দেওয়া হত বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গকে।

পালকির দু’পাশে থাকত দরজা। পালকিতে আরোহী চড়ার পর পালকির দরজা বন্ধ হয়ে যেত। ভাড়ার পালকির জায়গা ছিল ছোটো ও তেমন সুদৃশ্য নয়। ভাড়ার পালকিতে এই গদি ও তাকিয়া মোড়া হত সরু কাঠির মাদুর বা শীতলপাটি দিয়ে। এর খরচও ছিল কম। কলকাতার ধনী সম্ভ্রান্ত পরিবারের লোকেরা এক একটা পালকি তৈরিতে খরচ করতেন সেই সময়ে হাজার তিনেক টাকা।

মহিলারা পালকি চড়ার পর পালকির দরজা বন্ধ করে দিতেন। বালিশের খোলের মতো সুদৃশ্য পালকির খোল থাকত। তা দিয়ে ঘেরা হত পুরো পালকির আরোহী-বসার স্থানটা। এই ঘেরাটোপ এক একটা ধনী পরিবার এক এক রকমের বাহারি সুদৃশ্য করে তৈরি করতেন দামি কাপড় দিয়ে। এই ঘেরাটোপের উদ্দেশ্য ছিল একটাই, মহিলা আরোহী যাতে বাইরের লোক দেখতে না পান। এই সঙ্গে পালকির পাশের বর্ণনা দিয়েছেন ক্ষিতীন্দ্রনাথ ঠাকুর, “সঙ্গে একটি পরিচালিকা একখানি সুপরিষ্কৃত বস্ত্র পরিয়া-পুরাতন দাসী হইলে সাধারণত কোনও ক্রিয়া কর্ন্মে প্রাপ্ত একখানি তসরের শাড়ী পরিয়া একপার্শ্বে ছুটিয়া চলিবে; অপর পার্শ্বের বাড়ীর কোনও পুরাতন চাকর যথোপযুক্ত বেশ পরিহিত হইয়া ছুটিয়া চলিবে; এবং পালকির সন্মুখে চুড়িদার পায়জামা ও চাপকান পরিহিত ও চাপরাশধারী এক পুরাতন দ্বারবান মাথায় তক্‌মাবিশিষ্ট শামলা পাগড়ী পরিয়া অগ্রে অগ্রে ছুটিয়া চলিবে। এত কাণ্ডের পর তবে মহিলাদের সম্ভ্রম রক্ষিত হইল বলিয়া বিবেচিত হইত।”

শেষের কথাটিতে ক্ষিতীন্দ্রনাথ স্ত্রীজাতির সামনে একটা প্রশ্ন খাড়া করে দিয়েছেন। কারণ তারা অবলাজাতি বলে আমরা সমাজে তাদের চিরকাল এমন ভাবে রেখেছি, সেখানে তারা তাদের আত্মমর্যাদা ও আত্মরক্ষার যে বিশ্বাস তা হারিয়েছিল। সে বিষয়েই তিনি আবার লিখেছেন – “বিবেচনা করিয়া দেখলে বুঝা যাইবে যে, এই সমস্তের মূলে স্ত্রীজাতির আত্মরক্ষার ক্ষমতা সম্বন্ধে অবিশ্বাস লুক্কায়িত ছিল। মূলে যাহাই থাক, ঘেরাটোপে বন্ধ হইয়া মহিলাদিগের যাতায়াতের অসঙ্গত প্রথা তখন প্রচলিত হইয়া পড়িয়াছিল।”

এই সম্ভ্রম রক্ষা নিয়ে তিনি তীব্র ব্যঙ্গও করছেন। তিনি গাজিপুরে গিয়ে দেখেন সেখানকার মাড়োয়ারি মহিলারা এই ঘেরাটোপে আক্রান্ত হয়ে পড়েছেন এবং তিনি জানান যে আগে এখানে এ প্রথা ছিল না। বঙ্গ-মহিলারাই নাকি এই প্রথা প্রচলিত করেছে। ফলে কী হয়েছে সে বিষয়ে তিনি লিখেছেন, “এখন মাড়োয়ারী প্রভৃতি সকল জাতির মধ্যেই বদ্ধমূল ধারণা দাঁড়াইয়াছে এই যে, এই প্রকার ঘেরাটোপ বদ্ধ পালকিতে চড়িয়া না গেলে মহিলাদের সম্ভ্রমে আঘাত পড়ে।” (চলবে)

ঋণ স্বীকার

ক্ষিতীন্দ্রনাথ ঠাকুর – কলকাতায় চলাফেরা       

বীরেশ্বর বন্দ্যোপাধ্যায় – বাংলাদেশের সঙ প্রসঙ্গে

রাধারমণ মিত্র – কলিকাতা দর্পণ

 

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here