Palanquins-of-Kolkata

সিদ্ধার্থ বসু

পালকির বেহারা প্রসঙ্গ

প্রথম দিকে বেহারা বা বাহকরা ছিল বাঙালি দুলে ও বাগদি শ্রেণির মানুষ। গ্রামবাংলার এই পালকিবাহকদের জন্য ধনী, জমিদাররাই গড়ে তোলেন তাদের বসবাসের স্থান। তারা শুধুমাত্র পালকিবাহকের কাজই করত না, তারা জমিদারবাবুদের লেঠেলবাহিনী হিসেবেও কাজ করত। যত দূর জানা যায়, এই দুলে ও বাগদি শ্রেণির বাহকদের সরিয়ে রাজা নবকৃষ্ণ প্রথম ওড়িয়া পালকি-বেহারাদের কলকাতা শহরে নিয়ে আসেন। কারণ দুলে-বাগদিরা অচ্ছুত। এটাই মূল কারণ ছিল বলে শোনা যায়। তিনি এই ওড়িয়া বাহকদের মদত করায় তারা ক্রমশই কলকাতায় ছড়িয়ে পড়ে। ফলে কাজ হারায় বাঙালি দুলে ও বাগদি শ্রেণির মানুষজন। এ কথা যে সত্য, তার প্রমাণ পাই ক্ষিতীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখায়, “আশ্চর্য এই যে, জীবনের এই সুদীর্ঘকালের মধ্যে উড়িয়া ভিন্ন অপর কোন জাতির ব্যক্তিকে কলিকাতায় পালকি কাঁধে করিতে দেখিলাম না”।

পরবর্তীকালে অবশ্য ধীরে ধীরে ওড়িয়া বেহারাদের জায়গা দখল করল হিন্দুস্থানি বেহারার দল। ওড়িয়া ও হিন্দুস্থানি বেহারাদের দাপটে সামান্য কিছু টিকে থাকা বাঙালি বেহারা কাজ হারিয়ে কলকাতা থেকে চলে গেল। এই কাজ-হারানো বাঙালির ছবি পাওয়া যায় বাংলাদেশের সঙে, ছড়ায় ও গানে। ‘দেশের দুর্দশা-বাঙালি কোথায়’ ছড়ায় লেখা হচ্ছে – ‘বাগদী, পাইক, বরকন্দাজ/পায় না এখন খুঁজে কাজ,/তার বদলে করে বিরাজ,/শিখ, গুর্খা নেপালী আজ।

এই কাজ-হারানো বাঙালির প্রসঙ্গে আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় তাঁর ‘অন্ন সমস্যায় বাঙালির পরাজয় ও তার প্রতিকার’ গ্রন্থের অবতরণিকায় লিখেছেন, “বাংলার আর্থিক দুর্গতির আর একটি প্রধান কারণ রহিয়াছে। আমি যখন বোম্বাই, লাহোর, মাদ্রাজ, এলাহাবাদ ও দিল্লি অঞ্চলে যাই, তখন একটি বিষয় সর্ব্বাগ্রে আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করে। সেই সকল শহরে ও প্রদেশে সমস্ত শ্রমজীবী ও চাষী তত্তৎপ্রদেশবাসী, অর্থাৎ সেখানকার যাবতীয় মুটে, মজুর, পাহারাওয়ালা প্রভৃতি সেই দেশের লোক। লাহোরে কেবল মুটে, মজুর নহে, যত বড় বড় ব্যবসাদার সবাই পাঞ্জাবী”।ক্ষিতীন্দ্রনাথ ঠাকুর ওড়িয়া বাহকদের বিষয়ে সেই সময় কী ভাবতেন? তিনি লিখেছেন, “সেকালে আমরা অতশত জানিতাম না – উড়িয়া মাত্রকেই ‘দাস’ বা ‘দাসপুয়া’ অর্থাৎ দাসপুত্র বলিয়া জানিতাম এবং মনে করিতাম যে, প্রধানত পালকি বহনের জন্যই উহাদের জন্ম”। এ প্রসঙ্গে বলা ভালো যে পালকিবাহকের কাজ যে খুব সম্মানের ছিল না সে সময়ের ওড়িয়া সমাজে, তা জানা যায় তাঁর লেখাতেই, “এখন বুঝিতেছি যে, উড়িয়াদের মধ্যে গৌড় বাউড়ি প্রভৃতি দুইচার জাতি আছে। যাহারা একমাত্র পালকি বহনের অধিকারী — অপর কেহ জাতির কেহ পালকি বহিলে তৎক্ষণাৎ তাহার জাতি যাইবে”। সুতরাং বুঝতে অসুবিধে নেই যে পালকির বাহকেরা সমাজের চোখে কী রকম ছিলেন। কী দৃষ্টিভঙ্গিতে তাদের দেখা হত। তাই যখন কবিতায় ‘পালকি চলে পালকি চলে / গগন তলে আগুন জ্বলে’ পড়ি তখন সেই বাহকদের সামাজিক সম্মান ও মর্যাদার কথা কি কেউ মনে রাখি? তাই যখন দেখি ক্ষিতীন্দ্রনাথ ঠাকুর লেখেন, “কি শীত, কি গ্রীষ্ম, পালকি বহন করিতে তাহাদের কষ্ট হওয়া দূরে থাক, তাহারা যেন এই কার্যে আনন্দলাভ করিত”, তখন স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে সত্যিই কি আনন্দলাভ করার জন্যই তারা এই কাজ করত? নাকি সমাজে এর চেয়ে অন্য কাজে তাদের গ্রহণ করা হবে না জেনেই জীবনধারণের তাগিদেই বাধ্য হয়ে মুখে হাসি রেখে তারা এই কাজ করত?

পালকির আড্ডা বা আড়া

সে সময়ে পালকিবাহকেরা কলকাতার নানা জায়গায় তাদের আড্ডা জমাত। কারণ তখন তাদের পালকি রাখার জন্য কোনো স্থান নির্দিষ্ট ছিল না। তাই তারা যত্রতত্রই আড্ডা মারত পালকি নামিয়ে। পালকিবাহকেরা যে স্থানে এক সঙ্গে থাকত সেইখানে পরবর্তীকালে কর্পোরেশন থেকে একটা বাঁশের খোঁটায় লিখে দেওয়া হত ‘Palanquin Stand’। এই লেখাটি দেখলেই বোঝা যেত এখানে কাছাকাছি আছে পালকিবাহকদের আড্ডা বা আড়া।

আরও পড়ুন: বিরারের পড়া ১ / হিন তাল হিন তাল : প্রথম পর্ব

যারা পালকি নিতে চায়, সেই আড্ডাস্থলে গিয়ে তারা হাঁক পাড়াত ‘বেহারা’ অথবা ‘দাসপো’ বলে। তাতেই তারা গা ঝাড়া দিয়ে উঠে এসে বাবুটির সামনে হাজির হত। কখনও এ রকমও হত যে পালকিবেহারারা একটু দূরে গেলেই ডাক শুনে ধীর পায়ে হাঁটতে হাঁটতে হাজির হত। জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির কাছে এই রকম তিন-চারটি আড়া বা আড্ডা ছিল। এগুলো সবই ছিল ঠাকুর জমিদারদের। কলকাতায় তখন এই রকম পালকিবাহকদের আড়া বা আড্ডার স্থল অনেকগুলো ছিল।

পালকি বেহারা বা বাহকদের বুলি

পালকির বাহকসংখ্যা ছিল এক একটা পালকিতে চার জন। তারা যখন পালকি বহন করে নিয়ে যেত, কঠিন শীতে অথবা প্রচণ্ড দাবদাহে, তখন তারা মুখে একটা শব্দ বা ধ্বনি প্রকাশ করত। তার যে সত্যিই কোনো মানে থাকত তা হয়ত নয়, তবে তা পালকির গতির সঙ্গে সঙ্গতি রেখেই উচ্চারিত হত। ক্ষিতীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই বুলির সুন্দর বর্ণনা করেছেন। উড়িয়া পালকি বাহকেরা উচ্চারণ করত – “ধাককুনাবড় হেঁইয়া নাবড়’ এই ছন্দের বুলি শুনিতে শুনিতে স্কুলে যাতায়াত হইত – পালকি বেহারাদিগের প্রতিধ্বনি করিয়া আমিও বলিতাম – ‘ধাক্‌কুনাবড় হেঁইয়া নাবড়”।

আবার গ্রামাঞ্চলে ওড়িয়া বেহারাদের স্থলে বাঙালি বাহকগণ যে বুলি বলে পালকি বইত তার উল্লেখ পাই তাঁরই লেখায়। “আমরা তিন ভাই একটা পালকিতে যাইতেছি। চতুর্দ্দিকে দিগন্ত বিস্তৃত মাঠ, অন্ধকার রাত্রি-জ্যোৎস্নাবিহীন; বেহারারা লইয়া চলিয়াছে- মুখে তাহাদের একটি মাত্র বুলি ‘হিন তাল-হিন তাল’ — উড়িয়াদের মতো বিবিধপ্রকারের বুলি নয়”।

পালকির ভাড়া

পালকির ভাড়া নেওয়া হত দূরত্ব হিসাবে। তখন কত মাইল পালকি যাবে তার উপর ঠিক করা হত ভাড়া। এখন মোটরগাড়ি ভাড়ার মতোই খানিকটা। তবে ঘণ্টা হিসাবে সে সময়ও ভাড়া নির্ধারণ করা হত। এক মাইল পর্যন্ত ভাড়া ছিল তিন আনা। এর পর যদি পালকি যেত তবে তার ভাড়া ছিল মাইল প্রতি বা মাইলের অংশবিশেষে তিন আনা।

আবার ঘণ্টা হিসাবে এই পালকির ভাড়া হত ছ’ আনা। অর্থাৎ প্রতি ঘণ্টায় ছ’ আনা, এক ঘণ্টার বেশি হলে প্রতি ঘণ্টায় যোগ হত তিন আনা করে। এ ছাড়া যদি কেউ পালকি আধবেলা বা ঘণ্টা পাঁচেকের জন্য ভাড়া নিত সে ক্ষেত্রে ভাড়া নির্ধারিত হত এক টাকা। আবার যদি পুরো এক দিন বা ন’ ঘন্টার জন্য ভাড়া নিত সে ক্ষেত্রে তাকে দিতে হত দেড় টাকা। পালকির ভাড়ার হার সরকারি ভাবে নির্ধারণ করা হয়েছিল।

পালকি ধর্মঘট

কলকাতায় সে সময় পালকিবাহকেরা ধর্মঘট করেছিল। অবশ্য কোনো ঐতিহাসিক এই বিষয়টিকে লিপিবদ্ধ করেছেন এমন নয়। এই ধর্মঘটের কারণ এখনকার মতোই। কারণ তাদের খেয়ালখুশি মতো ভাড়া নেওয়া। যাত্রীদের ওপর অযথা জুলুম করা, তাদের দাবিমতো ভাড়া না দেওয়া হলেই যাত্রীদের হয়রানির শিকার হতে হত। কারণ তখনও অবধি ভাড়ার ওপর কোনো রকম সরকারি নিয়ন্ত্রণ জারি হয়নি। ফলে তারা তার সুযোগ নিত। যাত্রীরা এই বিষয়টি সরকারের গোচরে আনেন আবেদন করে। ফলে সরকারি ভাবে পালকি বাহকদের ওপর নির্দেশ জারি হয়।

(১) সরকারের ঠিক করা ভাড়া অনুযায়ী তাদের ভাড়া নিতে হবে।

(২) প্রতিটি বেহারার হাতে চাকতি লাগাতে হবে, তাতে নম্বর দেওয়া থাকবে। এই চাকতি বা ব্যাজ বাধ্যতামূলক।

(৩) পালকিতে নির্দিষ্ট নম্বর থাকবে।

পালকিবাহক বা বেহারারা এই কোনোটাতে রাজি হয়নি। তারা সরাসরি সরকারি হুকুমনামার বিরোধিতা করেছিল। কারণ চাকতি পরলে তাদের জাত যাবে। ১৮২৭ সনের এই সিন্ধান্তের কথায় মনে পড়ে যায় পরবর্তী সময়ে ১৮৫৬-৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহের কথা। সেখানে সিপাহিরা বন্দুকের টোটা ব্যবহার করতে অস্বীকার করেছিল জাত যাওয়ার ভয়ে। কারণ টোটার কাগজে গরু বা শুয়োরের চর্বি আছে, এই আশঙ্কায়।

বেহারারা এই সরকারি হুকুমনামার বিরুদ্ধে পালকি চালানো বন্ধ করে ধর্মতলায় জমায়েত হয়। তাদের মুখে একটাই আওয়াজ, পালকি বন্ধ করে তারা দেশে ফিরে যাবে। এই ধর্মঘটের ফলে সে সময়ে কলকাতায় যানসমস্যা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সরকারও থাকে অনমনীয়।

পালকি থেকে ‘ব্রাউনবেরি’

১৮২৭ সালে যখন পালকি ধর্মঘট চলছে, তখন কলকাতায় ছিলেন ব্রাউনলো সাহেব। তিনি এই পালকিকে দেখে একটি গাড়ির কল্পনা করেন সে সময়। তিনি পালকির ডান্ডা দু’টো খুলে ফেলে তলায় চারটে চাকা লাগিয়ে দেন। এবং এই গাড়ির সঙ্গে জুড়ে দিলেন একটি ঘোড়া। ঘোড়ায় টানা এই গাড়ি পরিচিত হয় তাঁর নামেই ‘ব্রাউনবেরি’।

পালকি চড়ার আনন্দ

এই পালকি চড়ার মজা বা আনন্দের চিত্র এঁকেছেন ক্ষিতীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তাঁর কথায় পালকির মজা যদি সত্যিই উপভোগ  করতে হয় তবে মফস্‌সলে আসতে হয়। তিনি লিখছেন, “একবার আমাকে নিদাঘের প্রখর রৌদে মহানদীর সুতপ্ত সুপ্রশস্ত বালুচর ভেদ করিয়া পালকিতে যাইতে হইয়াছিল — চতুর্দ্দিক নিস্তব্ধ — সুদূরে গরুগুলি চরিতেছে— বেহারাদিগের সমস্বরে উচ্চারিত পদগুলি সেই নিস্তব্ধতাকে যেন আরও নিস্তব্ধতর করিয়া তুলিয়াছিল! সে যে কি আনন্দ ও আরাম পাইয়াছিলাম তাহা বলিতে পারি না”।

পালকির অবসানে

পালকির দিন শেষ হল। তার স্থন দখল করল রিকশা। মানুষটানা দু’ চাকা অথবা তিন চাকার রিকশা। যার আসল নাম ‘জিন রিকশ’ যা চলতি কথায় সংক্ষিপ্তকারে ‘রিকশ’। পালকির অবসান বিষয়ে ক্ষিতীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায় জানাই, “দু’দশ বৎসর পরে কিন্তু যখন আর একবার বাধ্য হইয়া পালকি চড়িয়া স্কুলে গিয়েছিলাম, তখন স্কুলের ছেলেরা বড়ই ঠাট্টা-বিদ্রুপ করিতে লাগিত — তখন সভ্যতার সুর বদলাইয়া গিয়াছে। আমরাও অগত্যা পালকি ছাড়িয়া পায়ের গাড়ীতেই স্কুলে যাইতে লাগিলাম”। এ ভাবেই হারিয়ে গেল একটি যান। যা শুধু এখন ধরা স্মৃতির মণিকোঠায়, মিউজিয়ামের দ্রষ্টব্যের তালিকায়। (শেষ)

ঋণ স্বীকার

ক্ষিতীন্দ্রনাথ ঠাকুর – কলকাতায় চলাফেরা       

বীরেশ্বর বন্দ্যোপাধ্যায় – বাংলাদেশের সঙ প্রসঙ্গে

রাধারমণ মিত্র – কলিকাতা দর্পণ

4 মন্তব্য

    • এই লেখাটি আমাদের দিয়েছেন লেখক সিদ্ধার্থ বসু। ‌‌‌যিনি প্রবীণ মানুষ। কলকাতার পুরানো ইতিহাস নিয়ে লেখালেখি করেন। লেখাটি কলকাতা থেকে প্রকাশিত একটি সংবাদপত্রের রবিবারের পাতায় প্রকাশিত হয়েছিল।

উত্তর দিন

আপনার মন্তব্য দিন !
আপনার নাম লিখুন