muthuvel karunanidhi
এম করুণানিধি। ছবি সৌজন্যে উইঅন।
দেবারুণ রায়

জীবনের শেষ প্রাণবিন্দু পর্যন্ত তো বটেই, নিস্প্রাণ দেহ যখন হিমঘরে তখনও লড়াই চালিয়েছেন মুথুভেল করুণানিধি। তামিল রাজনীতির সাত দশকের সূত্রধর, দ্রাবিড় জাতীয়তার অবিকৃত প্রতীক, ভারতের রাজনীতিতে অগ্রাধিকার বদলে দেওয়ার অন্যতম পথিকৃৎ এবং ধর্মনিরপেক্ষতায় মৌলিক ও দলিত-অনগ্রসর-সংখ্যালঘু জনতাকে মূলস্রোত করে তোলার আন্দোলনের নেতা পাঁচ বার মুখ‍্যমন্ত্রীর মেয়াদ কাটিয়েও কিন্তু কখনও প্রধানমন্ত্রী হতে চাননি। যদিও ৯৪ পর্যন্ত ক্রিজে টানা দাঁড়িয়ে থেকে পরের পর বাউন্ডারি, ওভারবাউন্ডারি হাঁকিয়েছেন, একাধিকবার কিংমেকারের তকমা নিয়েও দিল্লির দরবারের খেতাব অথবা দাক্ষিণ্যের তোয়াক্কা করেননি। প্রধানমন্ত্রীরা বা তাঁদের মসনদি ম‍্যানেজাররা চেন্নাই ছুটেছেন  কালিঞ্জরের  দরবারে তাঁদের আর্জি নিয়ে। কিন্তু কখনও নিজের ঝোলা পাতেননি কোনো মুশকিল আসানের বিনিময়ে। তাঁকে ‘কালিঞ্জর’ বলেই ডাকতেন তামিলনাড়ুর আবালবৃদ্ধবনিতা। বিশেষ করে ছিন্নমূল হতদরিদ্র তামিলবাসী।

ভারতীয় রাজনীতির কোয়ালিশন পর্বে দিল্লির মসনদি চিত্রনাট্য কালিঞ্জরের কলমের ছোঁয়ায় চূড়ান্ত হত। তার আগেও, ইন্দিরাযুগে কংগ্রেসের সঙ্গে আঞ্চলিকদের শরিকি সম্পর্কের সূচনা করেছিলেন তিনি। তাঁর সময় থেকেই তামিল রাজনীতি কংগ্রেসের মতো সর্বভারতীয় দলের আধিপত্য কাটিয়ে উঠতে শুরু করে। তামিলভূমির গৌরবোজ্জ্বল অতীতকে বর্ণময় বর্তমানের সঙ্গে মিলিয়েছিলেন গান্ধীজির প্রিয় নিচু তলার মানুষের নেতা কামরাজ। রাজাগোপালাচারির পদচিহ্ন তামিল ভূখণ্ডে রীতিমতো স্পষ্ট থাকাকালীনই কামরাজের প্রভাব জোরালো। নিরীশ্বরবাদী পেরিয়ারের ব্রাহ্মণ‍্যবাদ-বিরোধী আন্দোলন বিপুল সাড়া জাগানো সত্ত্বেও। পেরিয়ারের পথে আন্নাদুরাই আলোড়ন জাগালেন বৈষম্যের বিরুদ্ধে। তামিল সিনেমার প্রখ্যাত চিত্রনাট্যকার করুণানিধি মানুষের স্বপ্ন সেলুলয়েডে ফুটিয়ে তুলতে অভ‍্যস্ত। তিনি দেখলেন, তাঁর লক্ষ্যপূরণের চূড়ান্ত মাধ্যম হতে পারে রাজনীতিই‌। এবং আন্নার আন্দোলনের সঙ্গেই যুক্ত হলেন। ফলে এমজিআর-এর রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠার আগেই তামিলনাড়ুর নবযুগের নেতা হিসেবে স্বীকৃত করুণানিধি। কার্যত ডিএমকে ভাগ হওয়ার পর সমান্তরাল নেতা হিসেবে মানুষের ভালোবাসা আদায় করে নেন এম জি রামচন্দ্রন। তিনি ও তাঁর জনপ্রিয় নায়িকা জয়ললিতা ছিলেন তামিলদের স্বপ্নের রাজা-রানি। এমজিআরই ডিএমকে ভেঙে আন্না ডিএমকের জন্মদাতা। এঁরা ছিলেন তামিল রুপোলি পর্দায় বাংলার উত্তম-সুচিত্রার মতোই সফল জুটি। কিন্তু তৎসত্ত্বেও করুণানিধির অবিসংবাদী নেতৃত্বের আসনটি তামিল জনতার কাছে ছিল অন্য সম্মানের। এই দক্ষিণী রাজ্যে পাঁচ বছর অন্তর সরকার পরিবর্তনের রেওয়াজ থাকলেও ডিএমকে, এডিএমকে দু’ দলের ক্ষেত্রেই ব‍্যতিক্রম ঘটেছে। এবং এই দুই দল সব সময় দুই মেরুতে। একবার শুধু এই দুই দলকেই দেখা গিয়েছিল একই মোর্চার ছাতার তলায়। অটলবিহারী বাজপেয়ীর নেতৃত্বাধীন এনডিএ সরকারের ভেতরে করুণানিধি ও জয়ললিতার  দলের মন্ত্রীরা ছিলেন এক সঙ্গেই। যদিও তামিলনাড়ুর পালাবদলের অঙ্কে পরিবর্তন আসেনি।

আরও পড়ুন রাজনীতিকে চলচ্চিত্রের অধীন করে দিয়েছিলেন তিনি

তা ছাড়া অনগ্রসর ও সংখ্যালঘু রাজনীতির মঞ্চ এবং ধর্মনিরপেক্ষতার মতাদর্শ অবিকৃত রাখতে অতীতের পদক্ষেপ যে ভুল ছিল কাজের মধ্যে দিয়েই তা স্বীকার করে নিয়েছিলেন করুণা। বাজপেয়ীর তেরো মাসের মন্ত্রিসভায় থাকলেও কংগ্রেস-সহ বাম ও অন‍্য সেকুলার দলগুলোর সঙ্গ ছাড়েননি।  যে কারণে ২০০৪-এ মনমোহন সরকারে  গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন তাঁর দলের মন্ত্রীরা। টুজি কেলেঙ্কারির দায় শুধু রাজা আর কানিমোঝির ঘাড়ে চাপানো এবং তাঁদেরই বলির পাঁঠা করার দরুন কংগ্রেস নেতৃত্বের ওপর ক্ষোভ থাকলেও মতাদর্শ আর রাজনৈতিক মূল্যবোধকেই অগ্রাধিকার দিয়েছেন। রাজা ও কানিমোঝির কারাবাস সত্ত্বেও শিবির বদলাননি। আম্মা জয়ললিতার চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে তাঁকে রোখার বাধ্যতা বুঝে প্রধানমন্ত্রী মোদীর সঙ্গে হাত মেলাতে পারতেন। কিন্তু মুফতির অবর্তমানে মেহবুবাকে ম‍্যানেজ, নীতীশকে নিখুঁত ভাবে একঘরে, জয়ললিতাকে জয়, নবীনকে নির্বিষ, চন্দ্রশেখরকে চোখ রাঙিয়ে, এবং জগনকে জব্দ আর চন্দ্রবাবুকে চ‍্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিতে সফল হলেও মোদী-শাহ নেটওয়ার্ক কিন্তু  নাজেহাল শিল্পীর তালুকে। কালিঞ্জরের অর্থ শিল্পী। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মোদী বারংবার ছুটেছেন চেন্নাই, কালিঞ্জরের কুশল জানতে। কংগ্রেসমুক্ত ভারত গড়ার কৌশলে। তাৎক্ষণিক চেষ্টা ছিল, পালানিস্বামী সরকারের পালাবদল হলে, অর্থাৎ গোয়েন্দা বা দলের সাংগঠনিক সূত্র থেকে তামিলনাড়ুর রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে যে ভবিষ্যদ্বাণী শোনা যাচ্ছে, উনিশের ভোটে স্ট্যালিনকে পাশে পাওয়া। মুখ্যমন্ত্রী পালানিস্বামী অমিত শাহর খেরোর খাতায় নাম লিখিয়েছেন। ভেতরে চাপে আছেন। চাপ পনির সেলভমের। তিনিই আম্মা জয়ললিতার আসল আস্থাভাজন। তাই যে কোনো সময় পাশা পালটে যেতে পারে। কিন্তু কেন্দ্রে মোদী সরকারের নেপথ্যে বিজেপির একক গরিষ্ঠতার অঙ্ক যেমন কার্যত অতীত, তেমনি এডিএমকে সরকারের  সংখ্যার জোর। আগামী দিন তাদের নয়, এ কথা রাজনৈতিক মহলে স্পষ্ট। অন্য দিকে, রজনীকান্ত বা কমল হাসনরা হতাশ করেছেন বিজেপিকে।

রাজ‍্যসভার ডেপুটি চেয়ারম্যান নির্বাচন শত্রুর মুখে ছাই দিয়েছে বলে ঢ‍্যাঁড়া পেটাচ্ছে বিজেপি। যদিও তারা বিলক্ষণ জানে, কুমিরের ছানা দেখানোর এই কৌশলে কোনো লাভ হবে না। লোকসভার সংখ্যাই হোক কিংবা রাজ‍্যসভার সমীকরণ, সবই অতীতের লোকসভা বা বিধানসভা নির্বাচনগুলোর ফলাফলের ভিত্তিতে। এগুলোর মধ্যে বর্তমান পরিস্থিতি প্রতিফলিত নয়। বর্তমান অবস্থার পরিচয় পাওয়া যাবে সমস্ত উপ-নির্বাচনের ফলাফলে, মিডিয়ায় উঠে আসা মানুষ ও রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের প্রতিক্রিয়ায়, শাসক জোটের শরিকদের অভিমত ও গতিবিধিতে এবং শাসক ও বিরোধী নেতাদের জনসভায় লোকসমাগমে। এগুলোই সরকার বা শাসক দলের জনপ্রিয়তা যাচাইয়ের নিরিখ।

আরও পড়ুন সংখ্যায় করুণানিধি: এক দীর্ঘ জীবনের সংক্ষিপ্ত সফর

আমৃত্যু মানুষের নাড়ির খবর রাখা করুণানিধি উনিশের ভোটে জোট নিয়ে দল ও মোর্চার হাতে গোনা ক’জনকে তাঁর মতামত ও পথনির্দেশ জানিয়েছেন। তাঁর ছোটো ছেলে স্ট্যালিনকেই উত্তরসূরি হিসেবে রণনীতি ও কৌশলে পারদর্শী করেছেন। এতে পরিবারতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হলেও যোগ্যতার প্রশ্নটি মীমাংসীত। লালুর বড়ো ছেলে তেজপ্রতাপের মতো করুণানিধির বড়ো ছেলে আলাগিরিও নেতৃত্বগুণে তেমন যোগ্য বলে বিবেচিত নন। তাই লালু যেমন তেজস্বীকে উত্তরসূরি করেছেন, তেমনি করুণানিধি বেছেছেন স্ট্যালিনকে। তামিল রাজনীতির এ হেন ত্রিকালজ্ঞ অভিভাবকের মৃত্যুর পরের ঘটনা আরও একবার ঘোষণা করল তাঁর আইডেনটিটি। ওঁর শেষ ইচ্ছে তো ছিলই, সেই সঙ্গে ছিল সাধারণ তামিলবাসীর দাবি, মেরিনা সমুদ্র সৈকতই সমাধিস্থ হবেন কালিঞ্জর। কিন্তু বাধ সাধলেন মুখ‍্যমন্ত্রী। ‘আইনি বাধা আছে। মেরিনায় সমাধি হবেনা।’ ডিএমকে অগত্যা কোর্টে গেল। পরিবেশ দূষণের যুক্তিতে কিছু জনস্বার্থের মামলা ছিল। জননেতার অন্ত‍্যেষ্টির স্বার্থে সেগুলো তুলে নিলেন মামলাকারীরা। ডিএমকের কৌঁসুলির সওয়ালের পর রাতেই রায় দিতে চান বিচারপতিরা। কিন্তু ফ‍্যাকড়া তোলেন সরকারি আইনজীবী। আদালত পরদিন সকালে তাঁকে বলতে বলেন এবং সকালে তাঁর যুক্তি খারিজ করে মেরিনায় সমাধিতে সবুজ সংকেত দেন। প্রতীত হয়, সংগ্রামলগ্নে যাঁর জন্ম, সংগ্রাম তাঁর সঙ্গ ছাড়ে না, মৃত্যুর পরেও। তামিলনাড়ুর ব্রাহ্মণ‍্যবাদী সংস্কৃতি মধ‍্যযুগীয় কুসংস্কারকে পাথেয় করে অন্ধকার ছড়িয়েছিল দক্ষিণ ভারতে। শেষ পর্যন্ত রামস্বামী পেরিয়ার নিরীশ্বরবাদী প্রচার আন্দোলনের পথেই সমাজসংস্কারের চেষ্টা শুরু করেন। দ্রাবিড় রাজনীতির সূচনা সেই থেকেই। কংগ্রেসের সামাজিক ন‍্যায়বিচার ও কমিউনিস্টদের যুক্তিবাদ এই রাজনীতিকে পুষ্ট করে। ফলত, স্বাভাবিক মিত্রতার সম্পর্ক রূপান্তরিত হয় আঁতাঁতে বা মোর্চায়।

আরও পড়ুন প্রয়াত করুণানিধির জীবনের কিছু বিরল এবং অদেখা ছবি

কংগ্রেস ষাটের দশক থেকেই ডিএমকের সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলে। মূলত ইন্দিরাযুগে। কিন্তু ইন্দিরার জরুরি অবস্থার প্রতিবাদে সরব হন করুণানিধি। পরে কেন্দ্রে শাসনে যখন এসেছে তামিলনাড়ুর ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে হাত মিলিয়েছে। কখনও ডিএমকে, কখনও এডিএমকে। শেষ পর্যন্ত রাজীব গান্ধীর সঙ্গে আম্মার আঁতাঁত জোরালো হয়। কংগ্রেস সমর্থিত চন্দ্রশেখর সরকার কংগ্রেসের চাপেই ৩৫৬ জারি করে করুণানিধির সরকার ভেঙে দেয়। রাজ‍্যপাল সুরজিৎ সিং বার্নালাকে ডেকে কথামতো রিপোর্ট দিতে  বলে। অকালি দলের প্রবীণ নেতা বার্নালা ৩৫৬-বিরোধী আন্দোলন করেই কেন্দ্রের প্রথম অ-কংগ্রেসি সরকারের মন্ত্রী হয়েছিলেন। ফলে তাঁর অবস্থান কার্যত করুণানিধির পক্ষে যায়। সারা দেশের অ-কংগ্রেসি ও অ-এসজেপি সরকার ও দলগুলো ডিএমকের পক্ষে দাঁড়ায়। যাঁদের পুরোভাগে ছিলেন বিশ্বনাথপ্রতাপ সিংহ, জ‍্যোতি বসু, এন টি রাম রাও, রামকৃষ্ণ হেগড়ে, বিজু পট্টনায়েক, নাম্বুদিরিপাদ প্রমুখ। নতুন পরিস্থিতি নতুন ভাবে ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক জোটের জন্ম দেয়। এলটিটিইর সঙ্গে করুণানিধিকে জড়িয়ে দেওয়া হয় ‘৯১-এর পর। ‘৯৭-তে জৈন কমিশনের রিপোর্টকে কেন্দ্র করে সীতারাম কেশরীর নেতৃত্বাধীন কংগ্রেস গুজরাল সরকার থেকে ডিএমকে মন্ত্রীদের বাদ দেওয়ার দাবি জানায়। কিন্তু জনতা দল ও বামেরা আপত্তি করায় কংগ্রেস সমর্থন তুলে নেয় গুজরাল সরকারের ওপর থেকে। লড়াইয়ের ময়দানে অ-কংগ্রেসি সেকুলার জোট সমদূরত্বের লাইনে যায় এবং বাজপেয়ীর নেতৃত্বে এনডিএ কেন্দ্রের ক্ষমতায় আসে। ভেঙে যায় কংগ্রেস কেশরীর জমানাতেই। বাংলায় তৃণমূল কংগ্রেসের জন্ম হয়। সেকুলার জোটও ভেঙে যায়। করুণানিধিও সরে যান। তেরো মাসের বাজপেয়ী সরকার এক ভোটে আস্থায় হেরে ইস্তফা দেয়। নির্বাচনের পর গরিষ্ঠতা পায় এনডিএ, চন্দ্রবাবুর বাইরে থেকে সমর্থনে। এর পরের পাঁচ বছরে সমদূরত্বের লাইনের অসারতা মালুম হয় বামেদের। সনিয়ার নেতৃত্বে কংগ্রেসও বাস্তবতা বুঝে একক সরকারের কৌলীন্য বিসর্জন দিয়ে জোট রাজনীতির পাঠ নেয়। এ কাজে দলের বাইরের যিনি সনিয়াকে ব্রতী হতে সাহায্য করেন তিনি হলেন রাজীবকে ক্ষমতাচ্যুত করার মূল নায়ক বিশ্বনাথপ্রতাপ সিংহ। তাঁর উদ্যোগই বামেদের ও করুণানিধির মতো নেতাকে অতীত ভুলিয়ে কংগ্রেসের কাছে নিয়ে আসে। তার পর এনডিএ-র হার ও ইউপিএ-র জন্ম। বিশ্বনাথপ্রতাপ তথা ভিপি আগাগোড়া নেপথ্যে থেকে এগিয়ে দেন সনিয়াকে। যাঁর চাক্ষুষ পরামর্শদাতা হরকিষেণ সিং সুরজিৎ, জ‍্যোতি বসু ও করুণানিধির মতো নেতা।

এর আগে ‘৯৬-এর যুক্তফ্রন্ট সরকার গড়ার প্রথম পর্বের কথা উল্লেখ না করলে কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে করুণানিধির ভূমিকার মূল‍্যায়ন অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।

hegre, jyoti basu, NTR, karunanidhi and vp singh
রামকৃষ্ণ হেগড়ে, জ্যোতি বসু, এনটিআর, করুণানিধি, বিশ্বনাথপ্রতাপ সিংহ। ছবি সৌজন্যে ফ্রন্টলাইন।

নরসিংহ রাওয়ের কংগ্রেস সরকার ‘৯৬-তে ভোটে হারার পর ত্রিশঙ্কু লোকসভায় বিজেপি ছিল প্রথম স্থানে। বাজপেয়ী সরকার গড়ার ডাক পেলেন প্রথমে, কিন্তু গরিষ্ঠতা জোটাতে না পেরে তেরো দিনেই তাঁর সরকার পড়ে গেল। এ বার রাষ্ট্রপতি শংকরদয়াল শর্মার ডাক পেয়ে দ্বিতীয় দলের নেতা নরসিংহ রাও বলে এলেন, তাঁর হাতে গরিষ্ঠতা নেই‌। কিন্ত তিনি একটি সেকুলার সরকার গড়ার লক্ষ্যে ও নতুন নির্বাচন এড়ানোর চেষ্টা করছেন। এ জন্য তাঁকে সময় দেওয়া হোক। সেকুলার দলগুলোর সঙ্গে এমনই কথা হয়েছিল রাওয়ের। কিন্ত জনতা দল ও বাম নেতাদের এ কথা জানিয়ে তিনি জানলেন, ওই শিবিরের প্রধানমন্ত্রী কে হবেন তা-ই ঠিক হয়নি। প্রবীণ নেতাদের সঙ্গে কথা বললেন রাও। যাঁদের মধ্যে ছিলেন করুণানিধি। হেগড়ে, রামরাও, লালু, জয়পাল, জর্জ, সুরজিৎ, ইন্দ্রজিৎ গুপ্ত সবাইকে নিয়ে করুণানিধি হাজির ভিপির তিনমূর্তির বাংলোয়। এ দিকে এমন কিছু ঘটতে চলেছে আঁচ করেছিলেন ভিপি। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এসপিজি পেতেন। সেই সূত্রেই পেয়েছিলেন নেতাদের আগমনবার্তা। শুনেই আর কালবিলম্ব না করে বিশ্বনাথ রক্ষীদের বললেন, দ্রুত বেরোবেন, তিনি তৈরি। বিধিমাফিক তারা জানতে চাইল কোথায়। ভিপি বললেন, আনসিডিউলড। এর পর ময়ূরবিহারে হিন্দুস্তান টাইমস আ্যপার্টমেন্ট হয়ে ইউপির দিকে লং ড্রাইভ। খবর পেয়েছেন রাস্তায় বেরিয়েই। করুণানিধির নেতৃত্বে প্রতিনিধিদল বসে আছেন। যখনই ফিরুন, দেখা না করে ওঁরা যাবেন না। কারণ, রাষ্ট্রপতির কাছে যেতে হবে। তার পর শপথ। কিন্তু ভিপির সিদ্ধান্ত ছিল, তাঁর লক্ষ‍্য সরকারে না থেকে সরকারের আ্যজেন্ডা তৈরি করা। লক্ষ‍্য হবে সমাজ পরিবর্তন। তাঁর হাতে সুসংগঠিত দল নেই। শরীরও সঙ্গ দিচ্ছে না। তাই ভোটেই দাঁড়াননি। তিনি চান, জ‍্যোতি বসুর নেতৃত্বে সরকারে থাকুন সবাই বিজেপির স্থায়ী বিকল্প তৈরি করতে। নেতাদের মুখোমুখি হলে সরাসরি প্রত‍্যাখ‍্যান করতে পারবেন না। কারণ তাঁরা নিজেরা প্রধানমন্ত্রীর মতো পদের মোহ ছেড়ে তাঁকে বসাতে চান। তাই ভিপি লং ড্রাইভেই থাকলেন রাত পর্যন্ত। ফিরে গেলেন করুণানিধিরা। সেটা মোবাইল যুগ ছিল না। মোবাইল যুগ হলে যাঁদের কথা ফেলতে পারতেন না ভিপি, তাঁদের একজন কালিঞ্জর। ওই গম্ভীর গলায় সীমিত শব্দে ঘোষিত সিদ্ধান্তটি তাঁর বলার গুণে এতটাই অমোঘ হয়ে উঠত যে তা অগ্রাহ্য করার নয়। যদিও করুণানিধিকে ফেরত পাঠানোর পর ভিপি তাঁদেরই সঙ্গে নিয়ে ইতিহাসের মোড় ঘোরাতে চেয়েছিলেন। তিনি বসুকে বিকল্প‌ নেতা চান শুনে করুণানিধি সহ সবাই সহমত হয়েছিলেন। কিন্তু মানতে পারেননি বসুর দলেরই কয়েক জন। যাঁদের মধ্যে ছিলেন বাংলার ডাকসাইটে সিপিএম নেতারা, কেরলের কারাটের নেতৃত্বে। সে দিন ওই কারাটপন্থীদের প্রশংসা শুনেছিলাম লালকৃষ্ণ আডবাণীর মুখে।

দীর্ঘকাল সরকার চালানো, আঞ্চলিক দলের সীমাবদ্ধতা, বা কখনও রাজনৈতিক বাধ্যতার স্বার্থে মতাদর্শগত সমঝোতার ঘটনাও ঘটেছে তাঁর জীবনে‌। দুর্নীতির বা কেলেঙ্কারির কালি লেগেছে দল ও সরকারের গায়ে। অবশ্য সবই এসেছে রাজ্যে বা কেন্দ্রে বিরোধীদের হাতে অস্ত্র হয়ে। তবু প্রতিহিংসার রাজনীতি এড়িয়ে চলতে চেয়েছেন। কংগ্রেসের সঙ্গে অনেক প্রেম ও ঘৃণার অতীত পেরিয়েছেন। শেষ পর্যন্ত সনিয়ার নেতৃত্বাধীন জাতীয় কংগ্রেস অচ্ছেদ‍্য বন্ধন গড়ে ডিএমকের সঙ্গে। রাজনৈতিক বিচক্ষণতা আর দায়বদ্ধতার জন্য লালু যাদবকে স্নেহ করতেন। পারস্পরিক শ্রদ্ধার সম্পর্ক ছিল জ‍্যোতি বাবু, প্রণববাবু ও এ বি বর্ধনের সঙ্গে। বামেদের মধ্যে সিপিআইয়ের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী ঘনিষ্ঠতা ছিল। সিপিএমের সঙ্গে সম্পর্কের উত্থানপতন স্পষ্ট হয়েছে বারবার। সিপিএম কখনও ভাইকো বা গোপালস্বামীর এমডিএমকে অথবা আম্মার এডিএমকের সঙ্গে হাত মিলিয়েছে, যেমন করেছে কংগ্রেস, বিজেপিও। যদিও জীবনের সারাংশে এসে কালিঞ্জর কালবেলা চিনতে ভুল করেননি। ভোটে কখনও হারেননি, অনন্য বাগ্মীর কণ্ঠস্বর কখনও বেসুরে বাজেনি আমজনতার কানে।

উত্তর দিন

আপনার মন্তব্য দিন !
আপনার নাম লিখুন