rabindranath tagore
শম্ভু সেন

… একদিন দুপুরবেলা তিনি কী একটা বই যেন পড়াইতেছেন, বোধ করি ব্রাউনিঙের কোনো নাটক হবে। এমন সময়ে সাধুচরণ তাঁহার হাতে একটি কাচের গেলাসে করিয়া কী একটা পানীয় আনিয়া দিল। কাঁচা সোনার মতো বর্ণ। তিনি পান করিতেছেন, আর আমার লুব্ধ দৃষ্টি ঐ গেলাসটার চারিদিকে মাথা ঠুকিয়া ঘুরিয়া মরিতেছে। পান শেষ করিয়া আমার দিকে চাহিয়া বলিলেন, “কী রে, খাবি নাকি?” আমি বিনীতভাবে বলিলাম, “তা মন্দ কী!” তিনি সাধুচরণকে ইঙ্গিত করিলেন। সাধুচরণ আর একটি গেলাসে পানীয় আনিয়া দিল। আমার সহপাঠী অধ্যাপকগণ তখন আমার সৌভাগ্যের নিশ্চয় ঈর্ষা করিতেছিলেন। এক চুমুক পান করিয়া দেখি, নিমের পাতা-সিদ্ধ জল। সর্বনাশ! এ যে নিদারুণ রসাভাস! কিন্তু তখন তো আর ফিরিবার উপায় ছিল না, তলানিটুকু নিঃশেষে হাসিমুখে গিলিয়া ফেলিলাম। জিজ্ঞাসা করিলেন, “কিরকম লাগল?” আমি অত্যন্ত সপ্রতিভভাবে বলিলাম, “চমৎকার! এইরকম জিনিস আপনি প্রতিদিন খান!” আমার কথা শুনিয়া সহপাঠীদের অনেকের রসনা নিশ্চয় চঞ্চল হইয়া উঠিয়াছিল। কারণ অনেকেই উসুখুসু আরম্ভ করিলেন। তখন রবীন্দ্রনাথ রহস্যভেদ করিয়া বলিলেন, “আপনারা অকারণ চঞ্চল হবেন না, নিমের জল।…

প্রমথনাথ বিশী হাসিমুখে নিমের জল খেয়েছিলেন। খাওয়ার কারণও হয় তো ছিল। আকৈশোর শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রসান্নিধ্যে প্রতিপালিত, কবিতা লিখতেন, যাত্রাপালাও লিখতেন। সে সব কথা রবীন্দ্রনাথের কানে পৌঁছেছিল। প্রমথনাথের লেখা কিছু কিছু পড়েও ছিলেন, কিন্তু কোনো মন্তব্য করেননি। রবীন্দ্রনাথের কাছ থেকে প্রশংসাবাণী শোনার একটা আকাঙ্ক্ষা প্রমথনাথের থাকতেও পারে। তাই হয় তো হাসিমুখে নিমের জল খেয়েছিলেন। কিন্তু তাতে যে কবীন্দ্রের শংসাপত্র জুটেছিল, এমন কোনো খবর মেলেনি।

তবে বনফুলের এমন কোনো আকাঙ্ক্ষা স্পষ্টতই ছিল না। তাই এ ক্ষেত্রে দেখি বিপরীত চিত্র।

juice of neem leavesএক দিন সকালে বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় তথা বনফুল গিয়েছেন শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে দেখা করতে। কবি তখন জীবনসায়াহ্নে। ঘরে ঢুকে বনফুল দেখেন বৃদ্ধ কবি আরামকেদারায় বসে একটা পাথরের গেলাসে অল্প অল্প চুমুক দিচ্ছেন। বনফুল প্রণাম করতেই রবীন্দ্রনাথ তাঁকে হাতের গেলাস দেখিয়ে বললেন, খাবে নাকি? গেলাসের পানীয়রহস্য বনফুলের জানা ছিল। তিনি সবিনয় বললেন, না, না, ওটা তো নিমপাতাবাটা শুনেছি। এই সাতসকালে তেতো খেতে ইচ্ছে করছে না। কবি ঈষৎ হেসে বললেন, ওহ! তুমি শুনে ফেলেছো। আসলে কি জানো অনেকে এটা পেস্তার সরবৎ বলে ভুল করে। তাই ভাবলাম -। আচ্ছা, তুমি তবে চা-ই খাও। আমিও খাই।

কবির চা-পান নিয়ে সৈয়দ মুজতবা আলির পর্যবেক্ষণে এক বার চোখ বুলিয়ে নেওয়া যাক। এক বার নাকি কী করে চাউর হয়েছিল, কবিগুরু চা পান করেন না। এ ব্যাপারে আলিসাহেব লিখেছেন, “আমি তাঁকে বহুবার চা খেতে দেখেছি, এ-দেশী চা, যাকে সচরাচর ব্ল্যাক টী বলা হয়, উত্তম গোত্রবর্ণের অর্থাৎ উজ্জ্বল সোনালী রঙের চা হলে তারিফ করতে শুনেছি। একবার চিন দেশ থেকে গ্রীন টী (যদিও গরম জলে ঢালার পর রঙ এর হয়ে যায় ফিকে লেমন ইয়েলো) আসে গুরুদেবের কাছে। সে-চায়ের শেষ পাতাটুকু পর্যন্ত তাঁকে সদ্ব্যবহার করতে দেখেছি।”

drinking teaতা হলে কবিগুরু ‘চা-পান করতেন না’, এই লিজেন্ডের জন্ম হল কী ভাবে? এ ব্যাপারে আলিসাহেবের ব্যাখ্যা: চা বাগানের কুলিদের উপর বর্বর ইংরেজ ম্যানেজার যে পৈশাচিক অত্যাচার করত তার খবর বাঙালি জনসাধারণের কাছে পৌঁছেছিল। তখন চা-কে বলা হত, ‘কুলির রক্ত’। অনেক বাঙালিই এই ‘কুলির রক্ত’ চায়ের পাতা বাড়ি থেকে চিরতরে নির্বাসনে পাঠিয়েছিলেন। স্বাভাবিক ভাবেই রবীন্দ্রনাথও সে খবর রাখতেন। বিশেষ করে যে শশীন্দ্র সিংহ তাঁর সাপ্তাহিক ইংরেজি কাগজে চা-বাগানের কুলিদের উপর অবর্ণনীয় অত্যাচারের কাহিনি লিখতেন, সেই শশীন্দ্র রবীন্দ্রনাথের সুপরিচিত ছিলেন। হয় তো সে সব পড়ে এবং শুনে রবীন্দ্রনাথ কিছু দিনের জন্য চা বয়কট করেছিলেন, তবে নিঃসন্দেহে সেটা কিছুদিনের জন্য। কারণ আলিসাহেব তাঁকে ১৯২১ থেকে ১৯২৬ পর্যন্ত বহু বার চা পান করতে দেখেছেন। সেই সময় রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতনে ‘দেহলী’ বাড়ির উপরের তলায় থাকতেন। তার সঙ্গে লাগোয়া নতুন বাড়িটি ছিল হস্টেল ঘর। তার সর্বশেষ কামরাটি রবীন্দ্রনাথের প্যান্ট্রি হিসাবে ব্যবহার হত। এবং ওই প্যান্ট্রির আগের কামরাটিতেই থাকতেন অনাথনাথ বসু এবং আলিসাহেব। সুতরাং রবীন্দ্রনাথের পানীয় ও আহার্য, কিছুই চোখ এড়াত না আলিসাহেবের। তবে সকাল-বিকেল ছাড়া অবেলায় টিপিক্যাল বাঙালির মতো তাঁকে কখনও বেমক্কা চা খেতে দেখেননি আলিসাহেব। আর প্রায়ই চা ছেড়ে কবি অন্য কোনো পানীওয় চলে যেতেন। গরমের দিনে বিকেলে চা বড়ো একটা খেতেন না – বদলে খেতেন বেলের বা তরমুজের শরবত। আর নিমের শরবতের কথা তো আগেই বলা হয়েছে।

আরও একটি পানীয় রবীন্দ্রনাথের খুব প্রিয় ছিল। পুত্রবধূ প্রতিমা দেবীকে লেখা চিঠি থেকে জানা যায়, মধ্যাহ্নভোজনে নিয়মিত খেতেন এক পাইন্ট ঘোল। ঘোল পছন্দের পানীয় হওয়া সত্ত্বেও দুধের প্রতি অনুরাগ কোনো দিনই ছিল না কবিগুরুর। শৈশবেই দুধের প্রতি অনাসক্তি জন্মায়। এবং ভৃত্যরাও সেই অনাসক্তি বিতাড়নে কোনো রকম উৎসাহী ছিল না। তাদের আফিমের নেশার জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ দুধ পান করার প্রয়োজন পড়ত। আর সেই দুধ তারা সংগ্রহ করত ঠাকুরবাড়ির শিশুদের জন্য বরাদ্দ দুধ থেকে। সুতরাং শিশু রবি যখন গোড়াতেই দুধ পানে অনাগ্রহ দেখাত, তখন ভৃত্যও তাকে দুধ খাওয়ার জন্য পীড়াপীড়ি করত না। তাই দুধ রবীন্দ্রনাথের পানীয়ের তালিকায় বরাবরই ব্রাত্য থজেকে গিয়েছিল। পিতৃদেবের সঙ্গে হিমালয় ভ্রমণে এসে তাই কিছুটা মুশকিলে পড়ে গিয়েছিল কিশোর রবি। বাবার সামনে দুধ খেতে হত। রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, “ভৃত্যদের শরণাপন্ন হইলাম। তাহারা আমার প্রতি দয়া করিয়া বে নিজেদের প্রতি মমতাবশত বাটিতে দুধের অপেক্ষা ফেনার পরিমাণ বেশি করিয়া দিত।” (চলবে)

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here