rabindranath tagore

কবি মনে করতেন শুধু রান্না ভালো হলেই হয় না, খাদ্য পরিবেশনের পাত্র, পরিবেশনের পদ্ধতি, খাবার ঘরের সজ্জা, সব কিছুতেই শিল্পের ছোঁয়া থাকা চাই।

ধনী জাপানির বাড়িতে নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে গিয়ে কবির কী অনুভূতি হয়েছিল, তার প্রমাণ রয়েছে তাঁর ‘জাপান-যাত্রী’ লেখায় – “সেদিন একজন ধনী জাপানি তাঁর বাড়িতে চা-পান অনুষ্ঠানে আমাদের নিমন্ত্রণ করেছিলেন। তোমরা ওকাকুরার Book of Tea পড়েছ, তাতে এই অনুষ্ঠানের বর্ণনা আছে। সেদিন এই অনুষ্ঠান দেখে স্পষ্ট বুঝতে পারলুম, জাপানির পক্ষে এটা ধর্মানুষ্ঠানের তুল্য।… কোবে থেকে দীর্ঘ পথ মোটরযানে করে গিয়ে প্রথমেই একটি বাগানে প্রবেশ করলুম।… ছায়াপথ দিয়ে গিয়ে এক জায়গায় গাছের তলায় গর্ত করা একটা পাথরের মধ্যে স্বচ্ছ জল আছে, সেই জলে আমরা প্রত্যেকে হাত মুখ ধুলুম। তার পরে একটা ছোট্ট ঘরের মধ্যে নিয়ে গিয়ে বেঞ্চির উপড়ে ছোট ছোট গোল গোল খড়ের আসন পেতে দিলে, তার উপরে আমরা বসলুম। নিয়ম হচ্ছে এইখানে কিছুকাল নীরব হয়ে বসে থাকতে হয়।… আস্তে আস্তে দুট-তিন্টে ঘরের মধ্যে বিশ্রাম করতে করতে, শেষে আসল জায়গায় যাওয়া গেল। সমস্ত ঘরই নিস্তব্ধ, যেন চিরপ্রদোষের ছায়াবৃত; কারও মুখে কথা নেই।…

আরও পড়ুন: রবিবারের পড়া : খুশখানেওয়ালা রবীন্দ্রনাথ/প্রথম পর্ব

“ঘরগুলিতে আসবাব নেই বললেই হয়, অথচ মনে হয় যেন এ-সমস্ত ঘর কী একটাতে পূর্ণ, গম্‌গম্‌ করছে। একটিমাত্র ছবি কিংবা একটিমাত্র পাত্র কোথাও আছে। নিমন্ত্রিতেরা সেইটি বহুযত্নে দেখে দেখে নীরবে তৃপ্তিলাভ করেন। যে-জিনিস যথার্থ সুন্দর তার চারি দিকে মস্ত একটি বিরলতার অবকাশ থাকা চাই। ভালো জিনিসগুলিকে ঘেঁষাঘেঁষি করে রাখা তাদের অপমান করা – সে যেন সতী স্ত্রীকে সতীনের ঘর করতে দেওয়ার মতো। ক্রমে ক্রমে অপেক্ষা করে করে, স্তব্ধতা ও নিঃশব্দতার দ্বারা মনের ক্ষুধাকে জাগ্রত করে তুলে, তার পরে এইরকম দুটি-একটি ভালো জিনিস দেখালে সে যে কী উজ্জ্বল হয়ে ওঠে, এখানে এসে তা স্পষ্ট বুঝতে পারলুম।…

আরও পড়ুন: রবিবারের পড়া : খুশখানেওয়ালা রবীন্দ্রনাথ/দ্বিতীয় পর্ব

“তার পরে গৃহস্বামী এসে বললেন, চা তৈরি এবং পরিবেশনের ভার বিশেষ কারণে তিনি তাঁর মেয়ের উপরে দিয়েছে। তাঁর মেয়ে এসে নমস্কার করে চা তৈরিতে প্রবৃত্ত হলেন। তাঁর প্রবেশ থেকে আরম্ভ করে চা তৈরির প্রত্যেক অঙ্গ যেন কবিতার ছন্দের মতো। ধোয়া মোছা, আগুনজ্বালা, চা-দানির ঢাকা খোলা, গরম জলের পাত্র নামানো, পেয়ালায় চা ঢালা, অতিথির সম্মুখে এগিয়ে দেওয়া, সমস্ত এমন সংযম এবং সৌন্দর্যে মণ্ডিত, সে না দেখলে বোঝা যায় না। এই চা-পানের প্রত্যেক আসবাবটি দুর্লভ ও সুন্দর। অতিথির কর্তব্য হচ্ছে, এই পাত্রগুলিকে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে একান্ত মনোযোগ দিয়ে দেখা। প্রত্যেক পাত্রের স্বতন্ত্র নাম ও ইতিহাস। কত যে তার যত্ন, সে বলা যায় না।”

আরও পড়ুন: রবিবারের পড়া ১ : খুশখানেওয়ালা রবীন্দ্রনাথ / তৃতীয় পর্ব

পাঠক, দীর্ঘ গুরুপাক আহারের পর শেষ পাতে একটু চাটনি। রবীন্দ্রনাথ ছিলেন রসিক। সাহিত্যরস, শিল্পরস, নানা রসের কারবারি, সে কারবারে হাস্যরসেরও নির্দিষ্ট স্থান ছিল। খাওয়া নিয়ে তাঁর হাস্যরসের একটা নমুনা পেশ করে এই নিবন্ধ শেষ করছি।

আরও পড়ুন: রবিবারের পড়া : খুশখানেওয়ালা রবীন্দ্রনাথ/চতুর্থ পর্ব

ভানুদাদা তাঁর রানুকে লিখছেন, “আজ দুপুরবেলায় যখন খেতে বসেছি, এমন সময় – রোসো, আগে বলে নি কী খাচ্ছিলুম – খুব প্রকাণ্ড মোটা একটা রুটি – কিন্তু মনে কোরো না তার সবটাই আমি খাচ্ছিলুম। রুটিটাকে যদি পূর্ণিমার চাঁদ বলে ধরে নেও তা হলে আমার টুকরোটি দ্বিতীয়ার চাঁদের চেয়ে বড়ো হবে না। সেই রুটির সঙ্গে কিছু ডাল ছিল, আর ছিল চাটনি, আর একটা তরকারিও ছিল। যা-হোক বসে বসে রুটি চিবোচ্ছি, এমন সময় – রোসো আগে বলে নিই রুটি, ডাল, চাটনি এল কোথা থেকে। – তুমি বোধ হয় জান, আমার এখানে প্রায় পঁচিশ জন গুজরাটি ছেলে আছে – আমাকে খাওয়াবে বলে তাদের হঠাৎ ইচ্ছা হয়েছিল। তাই আজ সকালে আমার লেখা সেরে স্নানের ঘরের দিকে যখন চলেছি, এমন সময় দেখি, একটি গুজরাটি ছেলে থালা হাতে করে আমার দ্বারে এসে হাজির। যা হোক নীচের ঘরে টেবিলে বসে বসে রুটির টুকরো ভাঙছি আর খাচ্ছি, আর তার সঙ্গে একটু একটু চাটনিও মুখে দিচ্ছি, এমন সময় – রোসো, আগে বলে নিই খাবার কী রকম হয়েছিল। রুটিটা বেশ শক্ত-গোছের ছিল; যদি আমাকে সম্পূর্ণ চিবিয়ে সবটা খেতে হত তা হলে আমার একলার শক্তিতে কুলিয়ে উঠত না, মজুর ডাকতে হত। কিন্তু ছিঁড়তে যত শক্ত মুখের মধ্য ততটা নয়। আবার রুটিটা মিষ্টি ছিল; ডাল তরকারি দিয়ে মিষ্টি রুটি খাওয়া আমাদের আইনে লেখে না, কিন্তু খেয়ে দেখা গেল যে, খেলে যে বিশেষ অপরাধ হয় তা নয়। সেই রুটি খাচ্ছি, এমন সময় – রোসো, ওর মধ্যে একটা কথা বলতে ভুলে গেছি, দুটো পাঁপড়-ভাজাও ছিল। সে দুটো আমি যাকে বলে থাকি সুশ্রাব্য – অর্থাৎ খেতে বেশ ভালো লাগে। শুনে তুমি হয়তো আশ্চর্য হবে এবং আমাকে হয়তো মনে মনে পেটুক ঠাউরে রেখে দেবে – এবং যখন আমি কাশীতে যাব তখন হয়তো সকালে বিকালে আমাকে চাটনি দিয়ে কেবলই পাঁপড়-ভাজা খাওয়াবে। তবু সত্য গোপন করব না, দুখানা পাঁপড়-ভাজা সম্পূর্ণই খেয়েছিলুম। যা হোক সেই পাঁপড় মচ মচ শব্দে খাচ্ছি, এমন সময় – রোসো মনে করে দেখি সে সময়ে কে উপস্থিত ছিল। তুমি ভাবছ, তোমার বউমা তোমার ভানুদাদার পাঁপড়-ভাজা খাওয়া দেখে অবাক হয়ে হতবুদ্ধি হয়ে টেবিলের এক কোণে বসে মনে মনে ঠাকুর-দেবতার নাম করছিলেন, তা নয় – তিনি তখন কোথায় আমি জানি নে। আর কমল? সেও-যে তখন কোথায় বসে রোদ পোয়াচ্ছিল তা আমি জানি নে। তা হলে দেখছি টেবিলে আমি একলা ছাড়া কেউই ছিল না। যাই হোক দুখানা পাঁপড়-ভাজা পরে প্রায় সিকিটুকরো রুটির পৌনে চার-আনা যখন শেষ করেছি, এমন সময় – হাঁ হাঁ, একটি কথা বলতে ভুলে গেছি – আমি লিখেছি খাবার সময়ে কেউ ছিল না, কথাটা সত্য নয়। ভোঁদা কুকুরটা একদৃষ্টে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে লালায়িত জিহ্বায় চিন্তা করছিল যে, আমি যদি মানুষ হতুম তা হলে সকাল থেকে রাত্তির পর্যন্ত  ঐ রকম মুচ মুচ মুচ মুচ মুচ মুচ করে কেবলই পাঁপড়-ভাজা খেতুম; ইতিহাসও পড়তুম না, ভূগোলও পড়তুম না – শিশু-মহাভারত, চারুপাঠের কোনো ধার ধারতুম না। যা হোক যখন দুখানা পাঁপড়-ভাজা এবং কিছু রুটি ও চাটনি খেয়েছি, এমন সময় – কিন্তু ডালটা খাই নি, সেটা নারকোল দিয়ে এবং অনেকখানি কুয়োর জল দিয়ে তৈরি করেছিল তাতে ডালের চেয়ে কুয়োর জলের স্বাদটাই বেশি ছিল, আর তরকারিটাও খাই নি – কেননা, মোটের উপর তরকারি প্রভৃতি বড়ো বেশি খাই নে। যাই হোক, যখন রুটি এবং পাঁপড়-ভাজা খাওয়া প্রায় শেষ হয়েছে, এমন সময়ে ডাক-হরকরা আমার হাতে কাশীর ছাপমারা একখানা চিঠি দিয়ে গেল।” (শেষ)

ঋণাঞ্জলি

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর, প্রমথনাথ বিশী, সৈয়দ মুজতবা আলি, বনফুল, ইন্দিরা দেবী, প্রতিমা দেবী, রানী চন্দ, হেমলতা ঠাকুর, অমিতা দেবী, মৈত্রেয়ী দেবী, সুমিতেন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং শান্তা শ্রীমানী।

 

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here