rabindranath tagore
শম্ভু সেন

রান্না নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষায় তাঁর সঙ্গী ছিলেন স্ত্রী মৃণালিনী দেবী। আর বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই রবীন্দ্রনাথের ভূমিকা ছিল নির্দেশকের, হাতে কলমে রাঁধিয়ের নয়। রানী চন্দকে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, “জানো সবরকম কলার মতো রন্ধনকলাতেও আমার নৈপুণ্য ছিল। একদা মোড়া নিয়ে রান্নাঘরে বসতাম এবং স্ত্রীকে নানাবিধ রান্না শেখাতাম।” এ ভাবেই তৈরি হয়েছিল মানকচুর জিলিপি। শান্তিনিকেতনে থাকার সময় তিনি স্ত্রীকে মানকচুর জিলিপি তৈরি করতে বললেন। মৃণালিনী প্রথমে হেসে আপত্তি করেছিলেন। কিন্তু খেয়ে দেখা গেল সেটা জিলিপির চেয়ে ভালো হয়েছে। কবি বললেন, “দেখলে তোমাদের কাজ তোমাদেরই কেমন শিখিয়ে দিলুম।” কবিপত্নী হেসে বললেন। “তোমাদের সঙ্গে পারবে কে? জিতেই আছ সকল বিষয়ে।”

স্বাস্থ্যসচেতন কবি নিজের খাদ্যাভাস নিয়েও পরীক্ষানিরীক্ষা চালিয়েছিলেন। একবার এক বিদেশি বন্ধু এসে বললেন, ডিম হচ্ছে আসল খাদ্য। ওতে সব রকমের গুণ আছে। এরপর কী হল? রানী চন্দ লিখেছেন, “গুরুদেব কাঁচা ডিম ভেঙে পেয়ালায় ঢালেন, একটু নুন-গোলমরিচ দেন, দিয়ে চুমুক দিয়ে খেয়ে ফেলেন। রাতের খাবার, দিনের খাবার এই একভাবে চলে।” একবার এক আয়ুর্বেদজ্ঞ বললেন নিমপাতার রস সর্বরোগনাশক। ব্যস, শুরু হয়ে গেল নিমপাতার রস খাওয়া। রানী চন্দকে বললেন, “বেশি ডিম খাওয়া ভাল নয়। বেশি কেন, ডিম একেবারেই খাওয়া উচিত নয়। বরং নিমপাতার রস খাবি রোজ কিছুটা করে।”

আরও পড়ুন রবিবারের পড়া : খুশখানেওয়ালা রবীন্দ্রনাথ/প্রথম পর্ব

বন্ধুবান্ধবের নিয়ে গানবাজনা ও সাহিত্যের আসর বসাতে খুবই ভালোবাসতেন কবি। প্রথম দিকে তাঁদের গানের আসর বসত পার্ক স্ট্রিটে সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাড়িতে। তারপর সে আসর ভেঙে যেতে তাঁরা শুরু করলেন খামখেয়ালি সভা। সে সভার সদস্যবন্ধুদের যত্ন করে খাওয়ানোর দায়িত্ব নিতে হত কবিপত্নীকে। ঠাকুরবাড়িতে কেউ নতুন বউ হয়ে এলে প্রথমেই তাঁকে শেখানো হত পানসাজা, তারপর একে একে শিখতে হত বড়ি দেওয়া, কাসুন্দি-আচার তৈরি করা, আর শিখতে হত ঝুনি-রাইয়ের ঝালকাসুন্দি, আমসত্ত্ব, নারকেল-চিনি তৈরির পদ্ধতি। ক’দিনেই এ সবে বেশ দক্ষ হয়ে উঠেছিলেন কবিপত্নী। তাঁর রান্নার সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়ল অচিরেই। খামখেয়ালি সভার দিন কবি স্ত্রীকে ফরমাশ দিতেন সম্পূর্ণ নতুন পদের ব্যবস্থা করতে। প্রত্যেকটি পদের বৈশিষ্ট্য থাকা চাই। কবিপত্নী কখনও কবির পরামর্শমতো, কখনও বা নিজের মতো করে রেঁধে নিত্যনতুন পদ সৃষ্টি করতেন।

rabindranath and mrinalini devi
রবীন্দ্রনাথ ও মৃণালিনী দেবী।

মিষ্টি খুব প্রিয় ছিল কবির। তার প্রমাণ, সেন মহাশয়ের সন্দেশ ও জলযোগের পয়োধি খেয়ে দু’ ছত্র লেখা এবং সেটাই আজও যেন কোটি টাকার বিজ্ঞাপন। কবির জন্য প্রায়ই নানা ধরনের মিষ্টি তৈরি করতেন মৃণালিনী – চিঁড়ের পুলি, দইয়ের মালপো, পাকা আমের মিঠাই ইত্যাদি। কবিপুত্র রথীন্দ্রনাথ লিখেছেন, “বাবার ফরমাশ মতো নতুন ধরনের মিষ্টি মাকে প্রায়ই করতে হত। সাধারণ গজার একটা নতুন সংস্করণ একবার তৈরি হল। তার নাম দেওয়া হল ‘পরিবন্ধু’”। মিষ্টি না পেলে নিদেন পক্ষে একটু মধু খেতে হত কবিকে। আলিসাহেব লিখেছেন, “বস্তুত কী চা, কী মাছমাংস, কোনো জিনিসেই রবীন্দ্রনাথের আসক্তি ছিল না – যা সামান্য ছিল, সেটা মিষ্টি মিষ্টান্নের প্রতি। টোস্টের উপর প্রায় কোয়ার্টার ইঞ্চি মধুর পলস্তরা পেতে জীবনের প্রায় শেষ বৎসর অবধি তিনি পরম পরিতৃপ্তি সহকারে ঐ বস্তু খেয়েছেন। সিলেট ও খাসিয়া সীমান্তে একরকম অতুলনীয় মধু পাওয়া যায়। এ মধু মৌমাছিরা সুদ্ধমাত্র কমলালেবুর ফুল থেকে সংগ্রহ করে। ছুটিতে দেশে যাওয়ার সময় গুরুদেব আমাকে বললেন, ‘পারিস যদি আমার জন্য কমলা মধু নিয়ে আসিস।’ আমি খুশী হয়ে বললুম, ‘নিশ্চয়ই আনব। কিন্তু কাশ্মীরের পদ্মমধু কি এর চেয়ে ভালো নয়?’ গুরুদেব স্মিত হাস্য করলেন। ভাবখানা, কিসে আর কিসে।”

আরও পড়ুন রবিবারের পড়া : খুশখানেওয়ালা রবীন্দ্রনাথ/দ্বিতীয় পর্ব

খাওয়া নিয়ে খুঁতখুঁতুনিও রবীন্দ্রনাথের কম ছিল না। একবার কবির জন্মদিনে অমিতা দেবী সবরকম মোরব্বা দিয়ে তাতে কেকের একটু গন্ধ মিশিয়ে একরকম মিষ্টান্ন করে রবীন্দ্রনাথকে পাঠান। বিদেশি কেকের গন্ধ দেশী খাবারে কেন? কবি সেই খাবার মুখে তোলেননি। আবার একবার দুধ, চালবাটা, নতুন ফল-পাকুড় দিয়ে তিনিই রবীন্দ্রনাথকে ‘নবান্ন’ করে দিয়ে এসেছিলেন। সেটা মুখে ঠেকিয়েছিলেন মাত্র। তার পর দেখা হলে অমিতা দেবীকে বলেছিলেন, ওটা কি নবান্ন হয়েছিল? আবার অসুস্থ অবস্থায় যখন কবির মুখে অরুচি, তখন এই অমিতার হাতের গন্ধরাজ লেবুর গন্ধ দেওয়া সাদা কলাই ডাল, ধনেপাতা দিয়ে পাবদা মাছের পাতলা ঝোল, হিং ও জিরেভাজা দিয়ে ঝাল ছাড়া কচি পাঁঠার মাংসের ঝোল অত্যন্ত তৃপ্তি সহকারে খেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ।

খাদ্য পরিবেশনে রুচির অভাব থাকলেও তিনি সইতে পারতেন না। ‘য়ুরোপ প্রবাসীর পত্র’-এ তিনি লিখেছেন, “ইংরেজদের খাবারের টেবিলে যেরকম আকারে মাংস এনে দেওয়া হয়, সেটা আমার কাছে দুঃখজনক। কেটে-কুটে মশলা দিয়ে মাংস তৈরি করে আনলে এরকম ভুলে যাওয়া যায় যে একটা সত্যিকারের জন্তু খেতে বসেছি, কিন্তু মুখ-পা বিশিষ্ট আস্ত প্রাণীকে অবিকৃত আকারে টেবিলে এনে দিলে একটা মৃতদেহ খেতে বসেছি বলে গা কেমন করতে থাকে।” (চলবে)

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here