রমাপদ চৌধুরী।
দীপক রায়।

জীবনের ইনিংসে সেঞ্চুরির দোরগোড়া থেকে ফিরে যেতে হল। ২৯ জুলাই সন্ধ্যায় ছিয়ানব্বইতেই বিদায় নিলেন। তাঁর সাহিত্যকর্ম, সম্পাদনা, জীবনশৈলী চিরদিন চর্চার বিষয় হয়ে থাকবে। চার দশক ধরে এমন একজন মানুষকে কাছ থেকে দেখেছি, মিশেছি, তাঁর কাছে কাজ করেছি। আনন্দবাজারের গেটপাস তিনিই আমাকে দিয়েছিলেন। শেষ কুড়ি বছর আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়েছিলাম। বহু ঘটনার সাক্ষী। এ জন্য গর্ব হয়। আপাতকঠোর, নির্বিকার, রাশভারী মানুষটির আড়ালের সত্তার সঙ্গে আমি পরিচিত।

সহমর্মী কিছু মানুষ ছাড়া কারও কাছেই সহজ হতে পারতেন না। যাঁদের কাছে সহজ হতেন, একমাত্র তাঁদের সঙ্গেই আড্ডা, হাসি-ঠাট্টায় খোলামন হতে পারতেন। মানুষটিকে দেখে তখনই বোঝা যেত তিনি কতটা আড্ডাবাজ, কতটা সহজ-সরল। তাঁর পছন্দ-অপছন্দ, ভালো লাগা, মন্দ লাগা, বিশ্বাস-অবিশ্বাসের পিছনে তাঁর অকাট্য যুক্তির কাছে সকলকে মাথা নোয়াতে হত। বহু বিষয়ে আমাদের ভ্রান্ত ধারণা তিনি শুধরে দিয়েছেন। তাঁর প্রতিভার স্বরূপ আমাদের চিনিয়ে দিয়েছেন।

আরও পড়ুন প্রয়াত ‘বনপলাশীর পদাবলী’, ‘খারিজ’-এর কথাকার রমাপদ চৌধুরী

লেখক হওয়ার স্বপ্ন তাঁর কখনও ছিল না। ঘটনাচক্রে হয়ে গিয়েছিলেন। আসলে তিনি ছিলেন সর্বভূক পাঠক। তার পরে সমালোচক। অন্যের (বন্ধুদের) লেখার সমালোচনা করতে করতে একদিন বাজি ধরে অল্প সময়ের মধ্যে একটি গল্প লিখে ফেলেন। সেই শুরু। আর ফিরতে পারেননি। জীবনের প্রথম গল্পের বইটি নিজের টাকায় ছেপেছিলেন। ‘দরবারী’র পর পর চোদ্দোটি এডিশন হয়। চারিদিকে নাম ছড়িয়ে পড়ে। এর পর এক প্রকাশক খোঁজ করে তাঁকে পাঁচশো টাকা অ্যাডভান্স দিয়ে উপন্যাস লেখার আর্জি জানান। সেই তাঁর প্রথম উপন্যাস – ‘প্রথম প্রহর’।

সেরা লেখক-সম্পাদক হিসাবে বিনা দ্বিধায় রমাপদবাবুর নাম করা যায়। তাঁর লেখার বিচার করবেন পাঠক-লেখক-সমালোচকরা। আমি বরং তাঁর সম্পাদনার বিষয়ে কিছু বলি। দু’-চার লাইন লেখা পড়েই তিনি বলে দিতেন কোন লেখাটা ছাপা যায়, কোনটা ছাপা যায় না। অফিস-জীবনের শেষ দিকে বেশ কয়েক বছর ‘দেশ’ পত্রিকার গল্প বাছার দায়িত্ব তাঁর কাঁধে ছিল। তিন জন বিচারক শয়ে শয়ে গল্প পড়ে তার থেকে ছাপা যায় এমন গল্পগুলিকে ফাইলবন্দি করে তাঁদের মতামত-সহ রমাপদবাবুর কাছে পাঠাতেন। গল্পগুলির কোনোটা তিন জন বিচারকেরই পছন্দ, কোনোটা বা দু’জনের, আবার কোনোটা এক জনের। রমাপদবাবু কেবলমাত্র ভেটো প্রয়োগ করতেন। আমার সামনেই এই কাজ আমি তাঁকে করতে দেখেছি। কখনও কখনও এক জন বিচারকের পছন্দের লেখাটাই রমাপদবাবু বেছে নিতেন।

আরও পড়ুন রবিবারের পড়া : ইন্দ্রমিত্রকে যেমন দেখেছি / প্রথম পর্ব

সম্পাদকের চেয়ারে বসার পর থেকেই কলকাতার কোনো দৈনিক বা কোনো পত্র-পত্রিকায় কে ভালো লিখছে সে খবর তিনি রাখতেন। কোথায় কোন শিল্পী ভালো ছবি আঁকছেন, তা-ও তাঁর চোখ এড়াত না। তিনি বেছে বেছে সেই সব লেখক ও শিল্পীকে ধরে এনেছিলেন আনন্দবাজারে। নিখিল সরকার (শ্রীপান্থ), সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়, শিল্পী সুধীর মৈত্র ও সমীর সরকারের নাম তো বলাই যায়। পরবর্তী কালে বহু লেখক তাঁর দেওয়া সুযোগের মর্যাদা রক্ষা করেছেন।

নতুন নতুন বিষয়-ভাবনা এনে এবং তা রূপায়ণ করে আনন্দবাজারকে জনপ্রিয় করার দায়িত্ব তিনি কাঁধে নিয়েছিলেন। ছোটোদের জন্য একটি পত্রিকা প্রকাশের পরিকল্পনা করল আনন্দবাজার। সেই ‘আনন্দমেলা’র সম্পাদনার দায়িত্বও তাঁকে দেওয়া হয়েছিল। প্রথম চারটি সংখ্যা প্রকাশ হওয়ার পরে তিনি সরে এসেছিলেন, সব দিক সামলানো সম্ভব ছিল না বলেই।

মাঝে মাঝে শুনতে পেতাম, অমুক ব্যক্তি আনন্দবাজার পত্রিকাকে সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছে দিয়েছেন। শুনে রমাপদবাবুকে তাঁদের নাম বলতাম। “যা শুনেছেন তার কিছুটা সত্যি, পুরোটা নয়।” বলেই যাঁদের নাম উচ্চারণ হয়নি, তাঁদের নাম বলতেন। নিজের কোনো কৃতিত্বের কথা কখনও বলতেন না।

আরও পড়ুন রবিবারের পড়া : ইন্দ্রমিত্রকে যেমন দেখেছি / শেষ পর্ব

এক বার কৌতূহলবশত জিজ্ঞাসা করে বসি – একটা লেখা পুরোটা পড়ার আমরা বুঝি ভালো কি খারাপ? আপনি দু’-চার লাইন পড়ে চট করে বুঝে যান কেমন করে? এটা কি দীর্ঘকাল সম্পাদনার অভিজ্ঞতার কারণে? উত্তরে যা বলেছিলেন – “না, না, একেবারে তা নয়। পড়ার খিদেটাই আমার মধ্যে একটা বোধের জন্ম দিয়েছে। আর সেই বোধ থেকেই আপনা-আপনি বিচারবোধটা এসে গিয়েছে। মনে রাখবেন, এক জন লেখক যখন সম্পাদক হবেন, তখন তাঁকে মুক্ত মনের মানুষ হতে হবে। নিজের ভালো লাগা, মন্দ লাগা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। কোনো লেখক-সম্পাদক চান না, সকলেই তাঁর মতো লিখুন।”

সভা-সমিতি, অনুষ্ঠান থেকে রমাপদবাবু আজীবন দূরে থেকেছেন। কখনও কেউ তাঁকে কোথাও নিয়ে যেতে পারেননি। শত অনুরোধেও মুখের ওপর ‘না’ বলে দিতেন। “আমি কোথাও কখনোই যাই না। আপনারা অন্য কাউকে নিয়ে ভাবুন।”

আনন্দবাজারের অনেক ওপরওয়ালাকেও দেখেছি, তাঁর সামনে কাজের কথা বলতে এসে কেমন গুটিয়ে যেতে। তাঁদের কোনো সিদ্ধান্ত একবার জানিয়ে দেওয়ার পর, কখনও কোনো দিন নিজের মত পালটাতে দেখিনি। এমনই দৃঢ় মনের মানুষ তিনি। সকলের থেকে এতটাই দূরত্ব বজায় রাখতেন যে, তাঁর কাছে পৌঁছোনো অনেকেরই সাহসে কুলোত না। সব বিষয়ে নির্বিকার, উদাসীন একটা ভাবমূর্তিই তার কারণ।

আরও পড়ুন রবিবারের পড়া: আমার বাবা ইন্দ্রমিত্র

প্রেসিডেন্সির ছাত্র। ইংরেজি সাহিত্যে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ করেন ১৯৪৫-এ। প্রয়োজনে ইংরেজি লিখতেন। বলতেন না। অনেকে জানতেন না, তিনি ইংরেজি সাহিত্যে কৃতী ছাত্র। কেউ কেউ বুঝতে পেরেছিলেন – রমাপদ চৌধুরী লেখকদেরও লেখক এবং সম্পাদকদের সম্পাদক। তাঁরা চুপ থাকতেন তাঁর সম্পর্কে মন্তব্য করা থেকে। কেউ কেউ তা-ও নয়। তাঁকে এড়িয়ে চলতেন, পাছে যদি তাঁদের কৃতিত্বটা খাটো হয়ে যায় এই মনে করে।

নিন্দুকেরা বলে, রমাপদ চৌধুরী কখনও কারও উপকার করেননি। আমি মনে করি, ঠিকই। উনি কাউকে অর্থসাহায্য করে, চাকরি দিয়ে উপকার করেননি। কিন্তু যাঁদের সুযোগ দিয়ে লেখক গড়ে তুলতে পেরেছেন, পরোক্ষে প্রতিষ্ঠা দিতে পেরেছেন, তাঁদের ক’জনের খবর নিন্দুকেরা রাখেন? আমার চার দশকের অভিজ্ঞতায় দু’ জনের নাম বলতে পারি, যাঁরা সর্বত্রই ‘রমাপদ চৌধুরী ছাড়া লেখক হতেই পারতাম না’, এই আপ্তবাক্যটি আউড়ে গিয়েছেন। প্রথম জন প্রয়াত, কবিরাজ শিবকালী ভট্টাচার্য এবং দ্বিতীয় ব্যক্তিটি নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী। সভা-সমিতি, সাহিত্যবাসর, টিভি-সাক্ষাৎকার এবং নিজের অকাদেমি পুরস্কার গ্রহণ অনুষ্ঠানেও নৃসিংহদাকে গর্বের সঙ্গে বলতে শুনেছি, ‘রমাপদ চৌধুরী আমার সাহিত্যগুরু’। এই দুঃসাহস তো অন্য কেউ দেখাতে পারেননি।

সব কিছু দেখে, শুনে, বুঝে আমার গভীর উপলব্ধি – উনি যোগ্য লোকদের এগিয়ে দিতেন প্রতিভা প্রমাণের জন্য। যখন বুঝে যেতেন, ‘এঁকে সুযোগ দিয়ে কোনো লাভ নেই, তখন তাঁর মাথা থেকে ছাতা সরিয়ে নিতেন’। যাঁরা সেটা বুঝতে পারতেন, তাঁরা চুপ হয়ে যেতেন। যাঁরা পারতেন না তাঁরা নানা রকম কুৎসা রটিয়েছেন। এই মানুষটিকে মাপার মাপকাঠি সবার থাকতে পারে না। অতএব তিনি অ-মাপাই রয়ে গেলেন অনেকের কাছে।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য দিন !
আপনার নাম লিখুন