samir amin
সামির আমিন। ছবি সৌজন্যে উইকিপিডিয়া।
tapan-mallick-chowdhury
তপন মল্লিক চৌধুরী

গত ১২ আগস্ট প্রয়াত হন সামির আমিন। একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন অর্থনীতিবিদ তথা গণতন্ত্রপ্রেমী এবং প্রতিবাদী মানুষের মত্যুর খবর এ দেশের গণমাধ্যমে মোটেও গুরুত্ব পেল না দেখে অবাক হলাম। তাঁকে নিয়ে এক কলাম খবর ছাপানোর গুরুত্ব কেউ অনুভব করল না কেন? যদিও সামির আমিন কোনো দিনই গণমাধ্যমে কলকে পাননি কারণ তিনি পুঁজিতন্ত্রের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন। পুঁজিতন্ত্র কীভাবে মানুষকে শোষণ করে, নিঃস্ব করে তা তথ্য-উপাত্তসহ বর্ণনা করেছেন। এমনকি পুঁজিতন্ত্রের অভিশাপ থেকে মুক্তির দিশাও বাতলেছেন। তাই গণমাধ্যমে সামির আমিন সব সময় ব্রাত্যই রয়ে গেছেন। অথচ তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়ন নীতি পর্যালোচনার একটি বিশেষ ঘরানা হিসেবে তাঁর লেখালিখি এবং আলোচনা ‘ডিপেন্ডেন্সি থিওরি’ বা নির্ভরশীলতার তত্ত্ব নামে পরিচিত। তিনি এই তত্ত্বটিকে কেবল যে বিশিষ্ট করে তুলেছেন তা-ই নয়, একই সঙ্গে তিনি মার্কসীয় অর্থনীতির একটি নবপাঠের সূচনা করেছিলেন।

নির্ভরশীলতা তত্ত্বে তিনি দেখিয়েছেন দুনিয়াটা আসলে দু’টি ভাগে বিভক্ত – একটি হল ‘কোর’ বা কেন্দ্র এবং অন্যটি ‘পেরিফেরি’ বা প্রান্ত। দু’টি আলাদা ভাগ হলেও এই ‘কোর’ এবং ‘পেরিফেরি’র মধ্যে যথেষ্ট সম্পর্ক রয়েছে যা নির্ভরশীলতার। ‘কোর’ দেশগুলি কাঁচামালের জন্য ‘পেরিফেরি’র উপর নির্ভরশীল এবং ‘পেরিফেরি’র দেশগুলির তৈরি মাল বা ফিনিশড গুডস-এর জন্য ‘কোর’ দেশগুলির উপর নির্ভরশীল। কেবল তা-ই নয়, এই নির্ভরশীলতা থেকেই যেমন অসম বাণিজ্য তৈরি হয়েছে তেমনি পুঁজিবাদী কাঠামোতে রয়েছে একটি চিরস্থায়ী বৈষম্য। নির্ভরশীলতার তত্ত্বের এই অন্যতম প্রবক্তার মতে, তৃতীয় বিশ্বের অনুন্নয়নের প্রধান কারণ দীর্ঘ ঔপনিবেশিক শোষণ, শিল্পায়নের বাস্তব শর্তগুলি না থাকা এবং আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে অসম বিনিময় ব্যবস্থা। অর্থাৎ উপনিবেশ ও অর্থনৈতিক সাম্রাজ্যবাদই আসলে প্রধান কারণ। এই অবস্থা থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার একমাত্র পথ হচ্ছে আন্তর্জাতিক পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থার সঙ্গে যে কোনও ধরনের সম্পর্ক এড়িয়ে চলা। তবে সামির আমিনের এই তত্ত্ব নিয়ে খোদ মার্কসবাদীদের মধ্যেই বিতর্ক ছিল। যদিও সামির আমিন প্রথাগত মার্কসবাদী ধারাতেই আস্থাশীল ছিলেন এবং তার মধ্যে থেকেই তিনি তাঁর তত্ত্ব নিয়ে উন্নয়ন নীতি, উন্নয়নের ইতিহাস, সমাজের অর্থনৈতিক গঠন ইত্যাদি প্রসঙ্গে বিস্তর  আলোচনায় মার্কসবাদীদের প্রভাবিত করেছেন, নানা ভাবে অনুপ্রাণিত করেছেন।

আরও পড়ুন রবিবারের পড়া ১ / জন্মের ১২৫তম বর্ষে আচার্য সত্যেন্দ্র নাথ বসুকে স্মরণ

কর্মসূত্রে অধিকাংশ সময় ইউরোপ ও আফ্রিকায় থাকলেও প্রায় পাঁচ যুগের পর্যবেক্ষণ ও গবেষণায় সামির আমিন সুনিপুণ ভাবে তুলে ধরেছেন জন্মভূমি ও মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক সংগ্রামের নানা বিষয়। মার্কসবাদী হয়েও প্রথাগত সমাজতান্ত্রিক ধ্যান-ধারণার বাইরে চিন্তা করেছেন। বিশ্বব্যবস্থার নানা অনুষঙ্গে সামির আমিন রাজনৈতিক ভাবে অত্যন্ত সক্রিয় ছিলেন। আমৃত্যু অর্থনৈতিক সাম্রাজ্যবাদের বিরোধিতা, রাজনৈতিক সংগ্রামের পাশাপাশি যুব-বিপ্লবীদের নিয়ে গড়েছিলেন ‘থার্ড ওয়ার্ল্ড সোশ্যাল ফোরাম’। ওই সংগঠনের মাধ্যমে তিনি সাম্রাজ্যবাদের নগ্ন চেহারা উন্মোচন করে একটি সমতা-ন্যায়ভিত্তিক উদার সমাজতান্ত্রিক বিশ্বসমাজ গড়তে চেয়েছিলেন। সঙ্গত কারণেই তিনি নাইট-স্যার উপাধি, বুকার বা নোবেল থেকে বঞ্চিত থেকেছেন।

তাঁর সাড়া জাগানো বই ‘ক্যাপিটালিজম ইন দ্য এজ অব গ্লোবালাইজেশান’। এখানে তিনি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের চেহারা তুলে ধরে দেখিয়েছেন, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ বিশ্বব্যাপী একচেটিয়া আধিপত্য বিস্তারের লক্ষ্যে প্রযুক্তিগত আধিপত্য, বিশ্বব্যাপী পুঁজি বাজারের নিয়ন্ত্রণ, পৃথিবীর সমস্ত প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর আধিপত্য, গণমাধ্যম ও যোগাযোগ ব্যবস্থার ওপর আধিপত্য এবং গণবিধ্বংসী অস্ত্রের ওপর আধিপত্য – এই পাঁচটি ক্ষেত্রকে তাদের মূল স্তম্ভ করেছে। যদিও এই আধিপত্য সব ক্ষেত্রে একই ধরনের নয়। বিভিন্ন অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে ওই আধিপত্যের তারতম্য ঘটে। সামির আমিন এটির নাম দিয়েছেন অর্থের বাজারের আর্থিক নিয়ন্ত্রণ। বিশ্বব্যাপী লগ্নি-পুঁজির আনাগোনা বা আমদানি-রফতানি একচেটিয়া পুঁজিবাদের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। আর সেটির ওপর প্রায় একচেটিয়া আধিপত্য করছে মার্কিন কর্পোরেশনগুলি। প্রসঙ্গত, অর্থের বাজারকে গতিশীল করার ক্ষেত্রে প্রযুক্তির ভূমিকা আগের তুলনায় বেড়েছে অনেক। প্রযুক্তির কারণেই ভারচুয়াল শেয়ার বাজারের অভূতপূর্ব বিস্তৃতি লক্ষ করা যাচ্ছে। আর প্রযুক্তির কারণেই ইলেকট্রনিক। ওই প্রযুক্তির সাহায্যেই বিশাল অঙ্কের টাকা বিশ্বের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে স্থানান্তরিত হয় মাত্র কয়েক সেকেন্ডে। এই পুঁজির দুনিয়া-সফরকে অবাধ করার জন্য সহায়কের ভূমিকায় রয়েছে আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান – ওয়ার্ল্ড ব্যাংক, আইএমএফ এবং ডাব্লিউটিও। পুঁজি-জারের নিয়ন্ত্রণের পরই প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর আধিপত্য। বিশেষ করে তৃতীয় বিশ্বের প্রাকৃতিক সম্পদ শোষণ ও লুণ্ঠন করার ক্ষেত্রেও সেই মার্কিন কর্পোরেশন সব চাইতে এগিয়ে মার্কিন সামরিক শক্তির সহযোগিতায়। এ ক্ষেত্রেও কোনো জাতি-রাষ্ট্রের সাহায্য ছাড়াই এবং ক্ষেত্রবিশেষে, এমনকি জাতি-রাষ্ট্রের বিভিন্ন দমনমূলক হাতিয়ার যেমন সেনাবাহিনী ব্যবহার করা ছাড়া পুঁজিবাদী কর্পোরেশনগুলো তৃতীয় বিশ্বের প্রাকৃতিক সম্পদকে নিজেদের আয়ত্তে আনতে পারে না। উদাহরণস্বরূপ নাইজেরিয়ার কথা পুরোনো হলেও বলা যায়, এই দেশটির তেলসম্পদের প্রায় অর্ধেকটা চলে যায় ইঙ্গ-ডাচ কোম্পানি শেল-এর কাছে আর বাকি অর্ধেকের বেশিটা নিয়ে নেয় মার্কিন কোম্পানি শেভরন। সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ যেমন মানুষকে নির্দ্বিধায় হত্যা করে, কর্পোরেট পুঁজি প্রাকৃতিক সম্পদ লুটপাট এবং পরিবেশকে ধ্বংস করার ভেতর দিয়েই মানুষকে হত্যা করে।

আরও পড়ুন রবিবারের পড়া ২ / চিত্রকর বব ডিলান

কর্পোরেট পুঁজির একচেটিয়া আধিপত্যের আরেকটি হচ্ছে গণমাধ্যম ও যোগাযোগ ব্যবস্থা। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের যুগে আজ সব থেকে বড়ো আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলির স্বত্বাধিকারী হচ্ছে গুটিকয়েক কর্পোরেশন। বর্তমান বিশ্বের মিডিয়া-সাম্রাজ্যবাদ রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক দিক থেকে একচেটিয়া কর্পোরেট পুঁজির সাম্প্রতিকতম স্তর মার্কিন সাম্রাজ্যবাদেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু মিডিয়া-সাম্রাজ্যবাদ কেবল রাজনৈতিক অর্থনীতির বিষয় নয়; তা সাংস্কৃতিকও বটে। বস্তুতপক্ষে মিডিয়া- সাম্রাজ্যবাদ আধিপত্যবাদী সংস্কৃতির উৎপাদন-বিনিময়-ভোগ-বন্টনের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। মার্কিন মিডিয়া-সংস্থাগুলি ব্যবসা করার পাশাপাশি ব্যবসার স্বার্থেই বাজারের মতাদর্শ ও পুঁজিবাদী মূল্যবোধ বিভিন্ন ভাবেই দুনিয়া জুড়ে ছড়িয়ে দিতে থাকে।

একচেটিয়া আধিপত্যের আরেকটি ক্ষেত্র হচ্ছে যুদ্ধাস্ত্র। অস্ত্র একই সঙ্গে সামরিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক তাৎপর্য বহন করে। যেখানেই যুদ্ধ, সেখানেই অস্ত্রের ব্যবসা জমে ওঠে। আর যুদ্ধ কেবল অস্ত্র ব্যবসাকেই ত্বরান্বিত করে না, একই সঙ্গে যুদ্ধকালীন পণ্যের উৎপাদন রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক প্রক্রিয়াকেও চালু রাখে। আর এ ভাবেই কর্পোরেশনগুলি মুনাফা লোটে। যুদ্ধের সঙ্গে পুঁজিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের সম্পর্ককে সামির আমিন ব্যাখ্যা  করেছেন রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে।

‘আরব বসন্ত’ নিয়ে যখন সারা বিশ্ব উচ্ছ্বাসিত সেই আন্দোলনের ভবিষ্যৎ নিয়েও সামির আমিন গভীর সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন। তিনি আরব ও মধ্যপ্রাচ্যের ঘটনাক্রম থেকে নিজের দৃষ্টিকে কখনোই অন্য দিকে সরিয়ে নেননি। তবে তৃতীয় বিশ্বের তথাকথিত অর্থনৈতিক উন্নয়নের নেপথ্যে পশ্চিমী কর্পোরেট মিডিয়ার মিথ্যে প্রচার এবং বিশ্বব্যাঙ্ক-আইএমএফের জিডিপি বৃদ্ধির সার্টিফিকেট ও ফাঁপা বুলির স্বরূপ বার বার তুলে ধরেছেন। পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক শোষণ, পশ্চিমী বিশ্বব্যবস্থা এবং মধ্যপ্রাচ্যের ঐতিহাসিক-রাজনৈতিক বিবর্তন ও পালাবদলের ইতিহাসকে তিনি নির্মোহ ভাবে পর্যবেক্ষণ ও পর্যালোচনা করার পাশাপাশি উত্তরণের ব্যাখ্যাও দিয়েছেন। সিরিয়ায় আগ্রাসন নিয়ে তাঁর বক্তব্য – রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসকে বিরোধিতা করে বিদেশি শক্তির সাহায্য নিয়ে সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রকৃত সন্ত্রাস সমস্যার সমাধান নয়। কথা হল আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে এই ব্যবস্থাকে বাস্তবে পরিবর্তন করা। আর এটিই হচ্ছে চ্যালেঞ্জ। এবং এই প্রশ্নটি উঠেছে। আমরা জানি না, আমি জানি না, আমার মনে হয় কেউ জানে না কী ভাবে বিষয়গুলো এগোবে: হয় সরকার, অথবা সরকারের ভিতরের লোকজন, তা বুঝবে এবং বাস্তব সংস্কারের দিকে অগ্রসর হবে, আলোচনার চেয়েও বেশি কিছু করে, জনগণের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সাহায্যে শাসনব্যবস্থাকে পুনর্বিন্যস্ত করে, অথবা বিস্ফোরণকে নিষ্ঠুর ভাবে মোকাবিলা করার পথ ধরে রাখবে। যদি এই পথে চলতে থাকে, তবে এক সময়ে পরাজয়ই হবে, কিন্তু সেই পরাজয় হবে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির উপকারের জন্য।

আরও পড়ুন রবিবারের পড়া: এ কালের ইংরেজি সাহিত্যের অন্যতম প্রাণপুরুষ নাইপল

বর্তমান বিশ্বের রাজনীতি, অর্থনীতি ও সাংস্কৃতিক সংকট বুঝতে তাঁর বইগুলি অত্যন্ত সহায়ক। সামির আমিন স্বপ্ন দেখেছিলেন, একটি সমাজতান্ত্রিক উদার গণতন্ত্র ও বহুত্ববাদী সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার। পুঁজিবাদ-নিয়ন্ত্রিত রাজনৈতিক অর্থনীতির প্রেক্ষাপটে এমন একটি সমাজ নির্মাণের প্রচেষ্টাকে অনেকে সোনার পাথরবাটি ভাবতেই পারেন। কিন্তু এই সময়ে আন্তর্জাতিক-সংকট থেকে মুক্তির যে যে পথ সামির আমিন দেখিয়েছেন, তার চেয়ে উন্নত কিম্বা অন্য কোনো পথও কি আমরা দেখতে পাচ্ছি?

 

উত্তর দিন

আপনার মন্তব্য দিন !
আপনার নাম লিখুন