ravi shankar
রবিশংকর। ছবি সৌজন্যে ইউ ডিসকভার মিউজিক।

(১২ ডিসেম্বর ছিল কিংবদন্তি সুরসম্রাট রবিশংকরের ষষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকী। তাঁর প্রতি রইল খবর অনলাইনের শ্রদ্ধার্ঘ্য।)

শর্মিষ্ঠা রায়

তাঁকে প্রথম দেখেছিলাম অনেক ছোটোবেলায়, ভবানীপুর সংগীত সম্মেলনে। সঙ্গে ছিলেন আরও দুই দিকপাল শিল্পী – দেবব্রত বিশ্বাস ও তারাপদ চক্রবর্তী। অনুষ্ঠান শুরু হয়েছিল রবীন্দ্রসংগীত দিয়ে। দেবব্রত বিশ্বাসের ভারী গলার সুরেলা আমেজ শেষ হওয়ার ঠিক পরেই রাগ মারোয়া দিয়ে শুরু করলেন তারাপদ চক্রবর্তী। সে দিনটা বোধহয় মারোয়া রাগেরই ছিল। অনুষ্ঠানের শেষ শিল্পী পণ্ডিত রবিশংকর। মারোয়া রাগের সুরমূর্ছনায় কিছুক্ষণের জন্য শ্রোতাদের সুরলোকে পৌঁছে দিয়েছিলেন। যথারীতি শুরওয়াতেই বাজিমাত, তিনি যে রবিশংকর। খাতায়কলমে ৩১টি রাগের স্রষ্টা তিনি, কিন্তু যে অসংখ্য স্বকীয় সুরধ্বনি ছড়িয়ে গিয়েছেন অনুরাগীদের স্বপ্নপূরণের সন্ধ্যায়, তার কোনো রেকর্ড নেই। যিনি শুনেছেন শুধু তিনিই পেয়েছেন সেই ক্ষণিকের বিদ্যুৎ শিহরণ। যা আর কখনও নতুন করে বাজেনি, মিলিয়ে গিয়েছে অনন্ত নক্ষত্রের আলোকছটায়।

আরও পড়ুন রবিবারের পড়া : ‘ফ্রাঙ্কেনস্টাইন’–এর ২০০ বছর

সেই প্রতিভাধর মানুষটি আপামর ভারতবাসীর চোখের আড়ালে মার্কিন মুলুকের ক্যালিফোর্নিয়ায় লা-জোলার সমুদ্রোপকূলে পৃথিবীকে শেষ বারের মতো বিদায় জানান। শেষ বিদায়ের ক্ষণ ভারতীয় সময় সকাল ৬টা, দিন ১২ ডিসেম্বর, ২০১২। সান দিয়েগোর লা-জোলার স্ক্রিপস মেমোরিয়াল হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন মাত্র তিন দিন। এটা অবশ্য শেষ বার। তার আগে ৯২ বছরের প্রবীণ রবিশংকরের হার্টের ভালভ্‌ পরিবর্তনের অপারেশন হয়েছিল। নভেম্বরের গোড়াতেই মেয়ে অনুষ্কাকে নিয়ে ক্যালিফোর্নিয়ায় অনুষ্ঠান করেছিলেন। এটাই ছিল এই বর্ণময় সংগীতপুরুষের জীবনের শেষ পরিবেশন। মৃত্যুর পর শেষকৃত্য হল সেই সাত সমুদ্র তেরো নদীর পারে। ভারতের রত্নকে শেষ নমস্কারের সুযোগ পেল না ভারতবাসী।

ভারতীয় সংস্কৃতিতে নব জাগরণের অন্যতম পুরোধাপুরুষ উদয়শংকর। মাত্র আট বছর বয়স থেকে সেই প্রবাদপ্রতিম দাদার হাত ধরেই শাস্ত্রীয় নৃত্যে রবির উদয়। অবশ্য নাচে শংকর ব্রাদার্স মঞ্চ মাতিয়ে সারা বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি করলেও রবি যে সেতার হাতে নিয়েই জন্মেছেন তা প্রমাণ হল চেতনার সন্ধিক্ষণে। বয়ঃসন্ধি পেরিয়ে তখন তিনি আঠারোয়। সেই আঠারোয় নেমে এল অপূর্ব এক সন্ধ্যা। অমিয় ভট্টাচার্যের সেতার শুনতে গিয়ে ‘রবু’ তাঁর বড়ো দাদাকে বললেন, “আমি ওঁর কাছে সেতার শিখব।” অমিয়বাবুর গুরু ছিলেন সেতার ঘরানার সব চেয়ে বড়ো সূত্রধর। নাম এনায়েত খাঁ। যে দিন এনায়েতের কাছে নাড়া বাঁধবেন তার আগের রাতেই ধূম জ্বর ও টাইফয়েডে শয্যাশায়ী রবি। তাঁকে ভর্তি করতে হল হাসপাতালে। বিধির বিধান ছিল অন্য রকম। গুরু-শিষ্যের মিলন নাকি হিসাব করে হয় না। তাই এনায়েত খাঁ নন, সেতারি সরোদিয়া আলাউদ্দিনের মাইহারেই গুরুগৃহ হল রবিশংকরের।

আরও পড়ুন রবিবারের পড়া: কোথায় হারিয়ে গেল পুজোর গান / ১

সরোদিয়া হলে কী হবে, সপ্তরথের সারথি ছিলেন আলাউদ্দিন খাঁ। আগামী দিনের বিশ্বমঞ্চে যিনি হবেন ভারতের প্রাচীন সংস্কৃতির দূত, সেই রবিশংকর আলাউদ্দিনের পদপ্রান্তে বসে তিলে তিলে ব্রতী হলেন নিজেকে আবিষ্কারের সাধনায়। কালে কালে কত কল্পকাহিনি ছড়িয়েছে। আলাউদ্দিন গুরু হিসাবে নাকি প্রচণ্ড রাগী ছিলেন। রাগে ভুল হলে সেই রাগ গিয়ে পড়ত শিষ্যদের ঘাড়ে। এক দিন রবিরও এমন হাল হয়েছিল। রাগরাগিণীর সাধনা ছেড়ে রাগ করে তিনি মাইহার ত্যাগের সংকল্প করেছিলেন। কিন্তু গুরু তো তাঁর প্রিয় শিষ্যকে ছাড়তে অপারগ। তাই ফিরিয়ে এনেছিলেন রবিকে। তার পর আর কখনও সে দিনের পুনরাবৃত্তি হয়নি। রবির ওপর রাগ হলে অন্যরা তার বলি হতেন। কিন্তু এমন বহুমুখী প্রতিভার গুরুমন্ত্র কাকে বলে, তার পরিচয় দিয়ে গিয়েছেন রবিশংকর সারা জীবন।

আরও পড়ুন রবিবারের পড়া: কোথায় হারিয়ে গেল পুজোর গান/শেষ পর্ব

সেতার যে তাঁর হাতে কথা বলে সে তো সারা বিশ্ব জানে। আর নাচের কথা না হয় ছেড়েই দিলাম, কিন্তু রবিশংকরের গান ক’জন শুনেছেন। কী অসাধারণ সুরেলা কণ্ঠের অধিকারী এবং সুর ছড়ানোয় কী অপরূপ বৈচিত্র্যময় শৈলী, তা যে শুনেছে সে-ই জানে। আশির দশকের গোড়ায় এমন একটি সুরম্য দিনে সুযোগ হয়েছিল রবিশংকরের গান শোনার। রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগে বিশেষ ক্লাস নিতে এসেছিলেন রবিশংকর। সে দিন জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে অন্য রবিকণ্ঠে গীত হল ছায়ানট। কী ভাবে যে রবিশংকর বিস্তার থেকে বন্দিশে গেলেন তা কখনও শুনিনি আগে বা পরে। মনে হচ্ছিল হাতের তারের বদলে যদি গলার সুর শোনাতেন তা হলেও তিনি রবিশংকরই হতেন। এ জন্যই তিনি ভারতের নব যুগের তানসেন।

writer with ravi shankar
বালিগঞ্জ পার্ক রোডে লালা শ্রীধরের বাড়িতে সেই সকালে। রবিশংকরের সঙ্গে লেখিকা।

মনে পড়ছে ’৮৩-’৮৪-এর কথা। জলসাঘরের উদ্যোগে কলকাতার মার্বেল প্যালেসে অবিস্মরণীয় এক সুরসন্ধ্যায় উপস্থিত ছিলেন রবিশংকর। অষ্টাদশ শতকের কলকাতার বাবু কালচারের রিপ্লেটাই ছিল জলসাঘরের থিম। সেই আসরে সুপুরুষ রবিবাবু চুনোট করা ধাক্কা পাড়ের ধুতি আর মসলিনের পাঞ্জাবি পরে উত্তরীয় কাঁধে এসেছিলেন জুড়িগাড়ি চড়ে। উচ্চাঙ্গ সংগীতের চাঁদের হাট বসেছিল সে দিন মার্বেল প্যালেসে। খাবারপাতেও ছিল বাবু-বৃত্তান্তের নানা পদ। সেই অনুষ্ঠানে নয়নাদেবী পণ্ডিতজিকে বললেন, আপনি গৎভাও দেখান, তবে আমি গাইব। আট থেকে আঠারো ভঙ্গিমা আর মুদ্রায় যে ভাবে দর্শক মাতাতেন সে ভাবেই কৃষ্ণ হলেন পাশে নয়নাকে রাধিকা করে। সে দিনের অনুষ্ঠানে বাবুগিরিটাই মুখ্য ছিল। আর ছিল অন্য শিল্পীদের কারও পুরাতনী, কারও বা দাদরায় মাতানোর ধূম। রামকুমার বাবুর গলায় রূপচাঁদ পক্ষী আর নিধুবাবুর গানে ছিল মেদুরতা। নয়নাদেবী মাতিয়েছিলেন ঠুমরিতে।

আর এর পরই রিমিঝিম শীতের এক সকালে বালিগঞ্জ পার্ক রোডে লালা শ্রীধরের বাড়িতে হল দেবদর্শন। সাংবাদিক হিসাবে সেই প্রথম অত লম্বা সময় ধরে অত অন্তরঙ্গ থাকার সুযোগ হল ওঁর সঙ্গে। ওঁর সচিব যে সময় বেঁধে দিয়েছিলেন তার দ্বিগুণ পেরোনোর পর উনি আমাদের বিদায় দিলেন। ‘কাননদের (মালবিকা ও এটি) শিষ্যা’ বলে নিজের সার্গিদের মতো স্নেহধন্য করলেন। গুরু পরম্পরা থেকে শুরু করে সে কালের সংগীতের ছায়াপথ মেলে দিলেন সর্বকালের সেরা পারফরমার রবিশংকর। যাঁর সৃষ্টির ঝুলিতে আছে ১৯৪৫-এর ‘সারে জহাঁ সে অচ্ছা’, গান্ধীহত্যার পর ‘মোহনকোষ’, সত্যজিতের সঙ্গে কুমারী মাটির ঘুম ভাঙানো অপু ট্রিলজির সুর, আকাশবাণী ও দূরদর্শনের প্রারম্ভিক সুর, জীবদ্দশায় তিনটি গ্র্যামি এবং মরণোত্তর লিজিয়ঁ দ্য অনার এবং ভারতরত্ন। পাশে আছেন বব ডিলান, মেনুহিন, পদপ্রান্তে বিশ্বজয়ী বিটল্‌সের হ্যারিসন।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here