papiya mitra
পাপিয়া মিত্র

অনেক চিঠিচাপাটির পরে শীতকাল এল। সঙ্গে নিয়ে এল সুগন্ধি নলেনগুড় আর নরম শিশির। পাটালি আর মোয়া নিয়ে বড়পিসি, মেজোপিসি আর ভাইবোনেরা হাজির। ঠাগমার আনন্দে মন ভরে যায়। একটা হুল্লোড়ে ঘুম ভেঙ্গে যায়। কিন্তু উঠি উঠি করে শীত আঁকড়ে ধরে। ঠাগমার কাঁথাখানি জড়িয়ে শুনতে থাকি কলরব।

কেমন করে সব মনে পড়ে যাচ্ছে হাজার কথা। শীতের রোদে ছাদে কাঁথার কাপড় গুনতে গুনতে, দেখতে দেখতে কত স্মৃতির স্রোতে মন উথালপাতাল। একটা দুধেআলতা শাড়ির পাড় দেখে মায়ের কত কথা মনে পড়ছে। নরম রোদে মায়ের সঙ্গে বারান্দায় বসে খেজুর গুড় আর আটার লালচে পরোটায় কামড় দিয়ে কত গল্প। হাতের কিছু কাজ গুছিয়ে বাড়ির ছোটো বড়ো সদস্যরাও যোগ দিত। ভোর থেকে উঠে নানা কাজ সেরে সেটা ছিল ছোট্ট ব্রেক। এই শীতে মা-ও ছেড়ে চলে গেলেন।

কতই বা বয়স ছিল মায়ের, বড়জোড় ষোলো। বিয়ে হয়ে তিন পিসি, সাত দেওর, শ্বশুরশাশুড়ি, জেঠশাশুড়ি, দিদিশাশুড়ির সংসারে মা বড়বৌ হয়ে এলেন। গ্রামের মেয়ে, এসে উঠল উত্তর কলকাতার বাড়িতে। সঙ্গীতপ্রিয় মানুষ বাবার জীবনসঙ্গী এল ঘরে। ঘরোয়া বাড়ির মধ্যে ছিল গানের আমেজ। ভোরের দিকে পিসিরা রেওয়াজে বসতেন। কাকারা কেউ সেতারে, কেউ শরীরী কসরতে ব্যস্ত। সে ছিল এক দিন, মা বলতেন নানা কথা আর খুশিতে ভরে উঠত মুখ। গ্রামের সহজসরল মেয়ের জীবনের ছবি আস্তে আস্তে রঙ বদলিয়েছে। একে একে ছেড়ে গিয়েছেন অনেক সদস্য। কেউবা চাকরি সূত্রে অন্যত্র।

আরও পড়ুন: রবিবারের পড়া : শীতের পরশ আর কাঁথার আদরকথা/১

লাল টুকটুকে বেনারসি ছাড়িয়ে জ্যেঠঠাগমা একখানা দুধেআলতা পাড়ের শান্তিপুরি শাড়ি পরতে দিলেন মাকে। সেই শাড়ি ছিল মায়ের শ্বশুরবাড়িতে আসার পর প্রথম পরা শাড়ি। সেই শাড়িটি মা পরম যত্নে তোরঙ্গে তুলে রেখেছিলেন। প্রতি বছর বিয়ের তারিখের পরের দিনের সকালে স্নান সেরে কপালে সিঁদুরের টিপ দিয়ে শাড়িখানা পরতেন। মেয়ে বড়ো হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেটা তারও পরা চাই। কেনই বা ওই শাড়িটা ওই দিন পরেন ইত্যাদি নানা প্রশ্ন। বাড়ির সরস্বতী পুজোর দিন মায়ের কাছে বায়নাতে মা পরিয়ে দিলেন সেই শাড়িখানি। পুজোর শেষে ভাইবোনেদের সঙ্গে হুটোপাটিতে বাগানের গাছে খোঁচা লেগে খানিক গেল ছিঁড়ে। ভয়ে ভয়ে মায়ের কাছে এসে মুখ নিচু করে মেয়ে দাঁড়িয়ে। ভেবেছিলাম খুব বকুনি খাব। কিন্তু মায়ের বকুনির বদলে পরম যত্নে শাড়িখানা খুলে নিয়ে দেখলাম ঠাগমার ঘরের দিকে চললেন মা।

এই শীতরোদে আমার আকাশের নীচে স্বামীর দেওয়া এক টুকরো ছাদে এই স্মৃতি হাতড়ানো। কিন্তু হাতড়ানো শব্দটা মনে হয় ঠিক হল না। এ তো স্মৃতির স্রোতে ভেসে যাচ্ছি। ঠাগমার গায়ের কাঁথাটা বেশ পাতলা ছিল। মা হয়তো স্মৃতি ধরে রাখতে কাপড়টিকে কাঁথায় পাতার জন্য দিয়েছিলেন। হাতে পেয়ে কাপড়খানিকে বুকে ধরে রাখলেন কিছুক্ষণ। তারপরে মাকে কাছে ডেকে বসালেন নিজের চৌপায়াতে। দিনের গতিতে বয়স এগিয়েছে। বার্ধক্য গিলেছে, শিরতোলা হাতে সুচসুতো ধরলেন। বগলদাবা করে সেই কাঁথাখানিকে উঠোনে টানটান করে পাতলেন। দুধেআলতা শাড়িখানির ছিঁড়ে যাওয়া অংশকে সেলাই করে তাতে ‘রান’ চালালেন। ছোটো ছোটো সেলাই, দ্রুত চলতে লাগল সুচ। সেই জন্যই কি ওই সেলাইকে রান সেলাই বলে, এখন বলে হয়তো, কিংবা কাঁথাস্টিচ।

খেজুর গুড় আর লালচে পরোটা খেতে খেতে মা বলে চলেছেন বিয়ের কনের কথা। স্নানের পরে সেই দুধেআলতা শাড়িতে ‘এক লক্ষ্মীপিতিমা দেখলাম’ গোছের কত কথা আত্মীয় প্রতিবেশী বলেছিলেন। মা বলছিলেন জানিস খুকু, আমি যে সুন্দরী ছিলাম সে কথা আগে জানতে পারিনি। বাপের বাড়ির কেউ কোনও দিন বলেনি। সকাল থেকে শুধু কাজ আর কাজ। আর শক্তপোক্ত বৌ আনার জন্য বড় সংসারে হয়তো আমার মতো মেয়ের প্রয়োজন ছিল। কিন্তু এই সংসারে এসে দেখলাম কাজ করার মতো সে রকম ‘কাজ’ কিছুই নেই। আসল কাজ সকলকে নিয়ে এক সঙ্গে সংসার করা।

ঠাগমা সেদিন শাড়িখানা নিজের কাঁথাটিতে বসিয়ে ফেললেন এক দুপুরেই। রাতে গায়ে দিয়ে শুলেন আমাকে সঙ্গে নিয়ে। আমার গায়ে বড়োপিসির দেওয়া নতুন কম্বল। কাঁথাকম্বলের ভিতর দিয়ে ঠাগমার হাত নিয়ে খেলতে খেলতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছি দেখি ভোর ডাকছে।

(চলবে)

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here