papiya mitra
পাপিয়া মিত্র

সেই ৫৪ খানা শাড়ির কাঁথায় দেখা গেল খান ২০ শাড়ি একবারে আঁশের মতো পাতলা হয়ে গিয়েছে। হবে নাই বা কেন? একটার ’পরে একটা কাপড় পেতে পেতে ক্রমে কাঁথার কলেবর মজবুত হতে শুরু করল। ভিতরের কাপড় চাপে পড়ল। আর তা সারা শীতকালে গায়ে দিয়ে ঠাগমা যা আরাম পেত তা শেষপাতে তেঁতুলটকের থেকেও উপাদেয়। কাঁথার দেহে নতুন নতুন মোড়কে অন্দরমহলের কাহিনি চাপা পড়ে যাচ্ছিল। একলা ছাদে এই সময়টা আমার একান্ত নিজের হওয়ায় সুখদুঃখের পাতা ওল্টাতে ভালোই লাগছিল।

উত্তুরে হাওয়ায় পাশের বাড়ির বাগানের বেশ কিছু শুকনো পাতা পড়ার শব্দ এল। সুপুরিপাতা হতে পারে। বাগানমাসি ঝাঁট দিচ্ছে। কাঁথাখানি নাড়াচাড়া করতে করতে হঠাত একটা কালো কোটা শাড়িতে কমলা ফুলের কাজ দেখে চিনতে ভুল হল না। ওটা আমার কলেজে যাওয়ার প্রথম শাড়ি। ছোটমাসি দিয়েছিল। উচ্চমাধ্যমিক পাশ করার পরে পাওয়া। নতুন শাড়ি পরে কলেজে যাওয়ার কথা মা বলেছিল তাই রেখে দিয়েছিলাম কলেজের জন্য।

রোদের আঁচ নিভে নিভে আসছে যেন। মেঘ করছে নাকি? আকাশের দিকে তাকাতেই ডানদিকের ফ্ল্যাটের ছাদে মুখুজ্জ্যে মাসিমার হাসিমুখ। তিনি দুটি কম্বল ঘাড়ে নিয়ে দেখছিলেন হয়তো আমার কাঁথার সেলাই খুলে কাপড় দেখার কাণ্ডকারখানা। একটু হাসি বিনিময় করে চলে গেলেন মাসিমা। পুবদিকের বৌদির এই সবে ভাত খাওয়া হল। ছাদে বসে বুঝতে পারি প্রতিবেশী সারমেয়র আহ্লাদী শব্দ শুনে।

সেদিন আমরা কয়েকজন ঠাকুরদার বাড়ি গিয়েছিলাম। আমাদের ঘরখানি ঘুরেফিরে দেখতে দেখতে অনেক কথা মনে পড়ে যাচ্ছিল। মায়ের আঁচলের ছোঁয়া যেন চারধারে। যে কোনো কাজের ফাঁকে মা নিজের পরনের শাড়ির আঁচলখানি নিয়ে আলমারি, ড্রেসিংটেবল, বাবার ছবি শোকেসের গায়ে বুলিয়ে দিত। পরম আন্তরিকতায়। এ শীতে মা চলে গেল। এ বাড়ি ও বাড়ি যাতায়াত করত মা। এত দিন ধরে ঠাকুরদার বাড়ি পড়ে থাকায় এবার প্রোমোটারের হাতে গেল। অনেক কিছু ভাগবাটরা হয়ে গিয়েছিল। কিছু জিনিস যে যার পছন্দমতো নিয়ে গিয়েছিল। আজ শেষবারের মতো ফিরে দেখা।

স্যাঁতস্যাঁতে ঘরে ঢিমে আলোয় চৌপায়াতে কী যেন পাতা রয়েছে। একটা ভ্যাপসা গন্ধে মাথাটা হঠাত ঝিম ধরে গেল। বসে পড়লাম ঠাগমার সারাজীবনের রাতের আশ্রয় চৌপায়াটিতে। একটা চাদর পাতা ঠান্ডা বিছানা। সেই হাড়হিম করা ঠাণ্ডা বিছানায় কেউ বসল না। আমি একটু থাকতে চাইলাম ঠাকুরদার ভিটেতে। চাদরটা একটু সরাতেই কাঁথাখানি চোখে পড়ল। কত সাধের ছিল ঠাগমার এই সম্পত্তিখানি। এর মধ্যে কত শাড়ি কত ঘটনার সাক্ষী। পরগোত্র না হওয়া পর্যন্ত আমি যে ঠাগমার একান্ত সঙ্গী ছিলাম। ঠাগমার ঘরখানি ছিল আমার ছোট্ট পৃথিবী। আমি কাঁথাটাকে এগরোলের মতো করে নিয়ে এসেছিলাম প্রথমে মায়ের কাছে। নানা কাজের তাড়নায় আর এ বাড়ি ও বাড়ি করার চাপে প্রায় ভুলতে বসেছিল মা কাঁথাটার কথা। আমার হাতে দেখতে পেয়ে সেটিকে রোদে পেতে দিল তাড়াতাড়ি।

সেটির প্রতি যত্নবান হতেই বাড়ির অন্য সদস্যদের মুখভার হতে লাগল। এটা আবার কোথায় থাকবে। জীবনের পড়ন্তবেলায় স্বামীর বাড়িখানিও যে আর নিজের থাকে না তা তো বিলক্ষণ বোঝা যায়। মা-ও বুঝেছিল। বিকেলের দিকে নিজের সংসারে ফেরার সময় মায়ের কাছ থেকে সেটিকে চেয়ে নিয়েছিলাম। রাতের দিকে বাড়ি ফিরে ছাদের সিঁড়িঘরে সেটিকে রেখেছিলাম। পরের দিন নিজের দু’খানা শাড়ি দিয়ে ঢাকা দিয়েছিলাম তাড়াতাড়ি। গুণসুচে লাটাইয়ের সুতোয় সেলাই করে মলিনতা ঢেকে কৌলিন্য বজায় রেখেছিলাম সেটির। পরে বছরভর সেটিকে সন্তানস্নেহে রোদ খাইয়ে আমার খাটের গর্ভগৃহে পাকাপাকি ঠিকানায় স্থিত করলাম।

নীলপাড়ের হলুদ শাড়িটা চোখে পড়ল। তখন আমি ক্লাস নাইন। মনে পড়ল রাসমেলায় ছোটোপিসিকে সুপ্রিয়দার সঙ্গে দেখায় মেজকা কী অপমানটাই না করেছিল মাঝমেলায়। বাড়ির কেউ পিসিকে কিচ্ছুটি খাওয়াতে পারেনি দুদিন। সেই হলুদশাড়িতে ছোটোপিসিকে সেদিন খুব সুন্দর লাগছিল। ছোটোপিসি আর বিয়েই করল না। ঠাগমা নিজের কাঁথায় কাপড় বসায় এর ওর থেকে চেয়ে, শুধু রান সেলাই করে। ছোটোপিসি পাড়ায় কোনও নতুন সদস্য জন্মালে সাদা কাপড়ে ছড়া লিখে তা লালনীলসবুজ সুতো দিয়ে সেলাই করে। ঠাগমার কোলে নাতিবাবু দোলে অথবা ফোকলাবুড়ি ফোকলাবুড়ি ফোকলা তোমার মুখ/ দাঁত নেইতো তবুও খুকি লাল টুকটুক মুখ।

হাড় কাঁপিয়ে বেশ শীত পড়েছে শহরে। গ্রামগঞ্জের কথা আরও এগিয়ে। আজ কম্বলে হবে না। ভারী কাঁথার আরাম দরকার। এসব সৌখিন কম্বল মানে হালকা। গায়ে ভারী কিছু দিতে মন চাইছে। কাঁথার অন্তরের কথা শুনতে শুনতে মনে মনে হারিয়ে যেতে ইচ্ছে করছে। তাই দুপুরের রোদ খাওয়ানো ঠাগমার আদর নিয়ে আজ শুতে যাওয়া।

(শেষ)

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here