grandma's kantha
papiya mitra
পাপিয়া মিত্র

কীসের যেন এক অভাব অনুভূত হয়। কার যেন স্নেহের হাত পেয়েও পাচ্ছি না। ‘কাজ করো ত্বরা’-র বোধ নেই। অথচ সে আসছে, আসার কথাই ছিল। সেইমতো প্রস্তুতি এক্কেবারে পাকা। কিন্তু কোথায়? এমনও দিনে তারে বলা যায়… কিন্তু কী বলা যায়? গলার শির ফুলিয়ে কেউ কি পড়ছে ‘আমলকি বন কাঁপে যেন তার বুক করে দুরুদুরু/পেয়েছে খবর পাতা খসানোর সময় হয়েছে শুরু’।

ধান-বিচালি বিছোনো মাটির উঠোনে মিঠে রোদে আদর মাখানো মাদুরে ন্যাংটা খোকার বাটি উলটিয়ে মুড়ি। দূরে ধানসেদ্ধর গন্ধে মনটা ঝিমিয়ে যায়। এমন দিনে বিছানা কামড়ে পড়ে থাকতে বড়ো ইচ্ছে করে। আর তার সঙ্গে যদি থাকে একখানি কাঁথা। এই শীতের পরশ আর কাঁথার আদরের কাছে সত্যি বড় বেমানান শৌখিন যত কম্বল-বালাপোষ আর খেস।

১৫ ডিগ্রিতে নেমে কেমন আটকে গেল কলকাতার শীত। সাধ করে শীতকালকে রবিকবি কৃপণ বলেছেন। এমন সময় কোথায় মাফলার, হনুমান টুপি, শাল-সোয়েটারে ঘরের চেহারা বদলিয়ে যায়, সে জায়গায় চেয়ার-বিছানা এখনও ফাঁকা ফাঁকা দেখে মনটা কেমন হু হু করে ওঠে। যাক সে কথা, ফিরে আসি কাঁথার আদরকথায়। উত্তরাধিকার সূত্রে একখানি কাঁথা পেয়েছিলাম। উত্তরাধিকার সূত্রে বলাটা ঠিক হবে কিনা জানি না। মূল্যবান যা কিছু ভাগবাটরা হয়ে যাওয়ার পরে চৌপায়াটাতে কাঁথাখানি পাতা ছিল ঠিকঠাক, ঠাগ্‌মা যেমনটি করে পেতে রেখেছিলেন তেমনটি ভাবে টানটান। এ বার বাড়িটা প্রোমোটারের হাতে, তাই সব কিছু ভাগ হল, আরও কত কিছু হল, সে সব না বলাই থাক।

ন’টা সোয়া ন’টা নাগাদ তেরছা কমলা রঙের রোদ উঁকি দেয়। সেখানেই একটা বেতের চেয়ারে পরম যত্নে ঠাগ্‌মা কাঁথাখানিকে বগলদাবা করে এনে রাখতেন।…সাড়ে তিনটে নাগাদ নিজের অমূল্যরতনটিকে তুলতে একটুও দেরি করতেন না। ভাঁজ করে চৌপায়ার একধারে রেখে তার ওপরে বালিশ, মশারি চাপিয়ে সেটির ওম বাঁচানোর চেষ্টা করতেন।

পেয়ারা আর টগরগাছের গা ঘেঁষে চটা ওঠা উঠোন। ন’টা সোয়া ন’টা নাগাদ তেরছা কমলা রঙের রোদ উঁকি দেয়। সেখানেই একটা বেতের চেয়ারে পরম যত্নে ঠাগ্‌মা কাঁথাখানিকে বগলদাবা করে এনে রাখতেন। দুপুরে বিছানাতে পিঠ পাততে কোনো দিন দেখিনি। নানা ধরনের আচার, বড়ি, পড়শিদের কাঁথা তৈরিতে সময় কাটাতেন। এত কাজের মাঝে সাড়ে তিনটে নাগাদ নিজের অমূল্যরতনটিকে তুলতে একটুও দেরি করতেন না। ভাঁজ করে চৌপায়ার একধারে রেখে তার ওপরে বালিশ, মশারি চাপিয়ে সেটির ওম বাঁচানোর চেষ্টা করতেন।

তা সেই কাঁথাটিকে যখন কেউ নেওয়ার গা করল না, তখন পরগোত্র আমি স্মৃতিভারে ক্লান্ত হয়ে সেটিকে নিজের বাড়ি নিয়ে আসি। প্রায় দশ মাস আধুনিক খাটের গর্ভগৃহে থাকার পরে প্রতি শীত মরশুমে আবির্ভূত হয় সেটি। তাকে রোদে দেওয়া, নাড়াচাড়া। পরতে পরতে নানা শাড়ির এক অপরূপ দর্শন। সেই অমূল্যরতনটিকে একদিন রোদে দিতে গিয়ে দেখলাম কত স্মৃতি। সেই সব স্মৃতি একে একে ছবি হয়ে উঠল। কোথাও লাল, কোথাও হলুদ, আবার কোথাও বা কালো ক্রচেট সুতো দিয়ে বড়ো বড়ো সেলাই। যখন যেমন হাতের জোর। কখনও বা দেখেছি লাটাইয়ের সুতোও।

এক শীতদুপুরে সেই কাঁথার একটি কোণের সেলাই খুললাম। দেখলাম, এক এক করে গুণলাম ক’টা শাড়ি থাকতে পারে? ৫৪টা শাড়ি! এক একটা শাড়ি তো এক একটা স্মৃতি। নানা রঙের নানা ছবি, কটাই বা আমার চেনা। সেই তো কবে পরগোত্র হয়ে গিয়েছি। ঠাগ্‌মা তো আমার কাছ থেকে আর শাড়ি চায়নি! সবটাই মা-কাকিমা আর আমার আইবুড়ো পিসির শাড়ি। একটা একটা করে শাড়ি তুলতে তুলতে দেখলাম একটা লালপাড় শাড়ি। বুঝলাম, ওটা দাদু মারা যাওয়ার সময় ঘাটকাপড়। একটা ফেলে দেওয়ার পর একটা কাঁথায় পেতে ছিল। সে-ও এক শীতের রাত। শ্মশান থেকে ফিরতে রাত দেড়টা। হাড় কাঁপিয়ে শীত পড়েছিল সে বার। ঠাগ্‌মার কোল ঘেঁষে সে রাতে শুয়েছিলাম, বেশ মনে আছে। কোনো বউমার শাড়ি নেয়নি। নিয়েছিল আমারটাই। হয়তো স্মৃতি ধরে রাখতে। হয়তো সেই রাতে সুখদুঃখের সঙ্গীর কথা ভেবে। আমার চুলে বিলি কাটতে কাটতে কত গল্প শুরু করেছিলেন ঠাগ্‌মা। সেটা কি ঠাকুরদার কথা ভুলতে? কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম জানি না। ঘুম ভেঙে গেল ঠাগ্‌মার ফুঁপিয়ে কান্নার শব্দে। একটা পাতলা কাঁথা গায়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদেই চলেছে।

(চলবে)

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here