shubhankar das
শুভঙ্কর দাস

ইতিহাস কি শুধু অতীতের হাতছানি, নাকি সে ভবিষ্যতেরও অগ্রদূত? সে কি নিছক গল্প বলার অজুহাত নাকি আসা যাওয়ার অবকাশ, কিংবা প্রশ্নমুখর এক দোলাচল? সময়ের আভরণে মানুষ জমে থাকা ধুলো কেবল, কিন্তু দোলাচলের এই অভিমানে সেই ধুলোও যখন অলংকার হয়ে ওঠে আমরা তাকে ‘ডোকরা’ বলে ডাকি। ৬০০০ বছর পুরোনো প্রাক্-হরপ্পা যুগের মেহেরগড় সভ্যতায় বা ৪০০০ বছর পুরোনো রাঢ়বাংলার তাম্রাশ্মীয় সভ্যতায় প্রাপ্ত ‘লস্ট ওয়াক্স কাস্টিং’ বা ‘হারানো-মোম-ঢালাই’ পদ্ধতিতে বানানো পিতল ও কাঁসার সামগ্রীরা ডোকরার আত্মিক পূর্বজবিশেষ। আর তারই উত্তরসূরি হই আমরাও যখন অতীতকে শুধুমাত্র শিকড়সন্ধানের আঙ্গিকে না বেঁধে রেখে তার হাত ধরে খুঁজতে বেরোই শ্রম ও শিল্পের নবপল্লবের স্পর্শ। কলকাতার চালচিত্র অ্যাকাডেমি সম্প্রতি সেই শিকড় ও নবপল্লবের সন্ধিরই আহ্বান জানাল তাদের ‘ডোকরার ডাক’ ওয়ার্কশপের মধ্য দিয়ে।

শহিদনগরের নান্দীমুখ সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে ২৪ থেকে ২৯ নভেম্বরে আয়োজিত এই কর্মশালায় এক দিকে যেমন ছিলেন বর্ধমানের দরিয়াপুর গ্রামের প্রচলিত ডোকরাশিল্পী রাজেশ কর্মকার, গৌরাঙ্গ কর্মকার এবং রাষ্ট্রপতি পুরস্কারপ্রাপ্ত রামু কর্মকারের পুত্র শিল্পী শুভ কর্মকার, তেমনই অন্য দিকে ছিলেন ডোকরা ব্যতীত লোকশিল্পের অন্যান্য ঘরানার প্রবাদপ্রতিম কিছু মানুষ, যেমন নদীয়ার কৃষ্ণনগর থেকে আগত আলপনার শিল্পী বিধান বিশ্বাস, পূর্ব মেদিনীপুরের পশ্চিমসাই গ্রামের গালার পুতুলের কুশলী বৃন্দাবন চন্দ এবং দক্ষিণ ২৪ পরগণার মজিলপুরের বাবু-পুতুলের অভিজ্ঞ শিল্পী শম্ভুনাথ দাস। আবার তাঁদেরই লোকজ ছন্দে সুর মেলালেন আধুনিকোত্তর নগরকেন্দ্রিক চিত্র ও ভাস্কর্য শিল্পের প্রখ্যাত কিছু পণ্ডিত, যেমন যোগেন চৌধুরী, তাপস কোনার, পার্থ দাসগুপ্ত, সতীশচন্দ্র, তাপস বিশ্বাস, প্রসেনজিৎ সেনগুপ্ত ও চালচিত্র অ্যাকাডেমির পরিচালক, কর্ণধার ও সম্পাদক শিল্পী মৃণাল মণ্ডল। আর ছিলেন এই সমগ্র যজ্ঞশালার তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে শিল্পী, গবেষক ও অধ্যাপক সৌজিৎ দাস।

ভিন্নমুখী শিল্পপ্রথা ও বিবিধ শিল্পীসত্তার এই ত্রিবেণী সঙ্গমের উদ্দেশ্য ছিল মূলত একটাই – ডোকরার আদি শিকড়ের অন্বেষণ এবং একই সঙ্গে তার পুনরুজ্জীবনের এক অক্লান্ত প্রচেষ্টা। এক প্রান্তে ডোকরা যেমন কোয়া গোণ্ড, দামার ও ডেকার জাতি ও উপজাতির হাজার হাজার বছরের পথ চলার সাকিন হদিশ, অন্য দিকে ডোকরা তেমনই রাঢ়বাংলার কর্মকার শ্রেণির নব রূপায়ণের ঐতিহাসিক পাণ্ডুলিপি। মোম গলে গেলে পড়ে থাকে মাটির একাকিত্ব, সভ্যতার যান্ত্রিক আস্ফালন থমকে গেলে রয়ে যায় যা কিছু লোকায়ত, রয়ে যায় শিল্পের আঁতুড়ঘরে চিরন্তনী যা কিছু লোকজ, যা কিছু অন্ত্যজ। শিল্পীর সুনিপুণ হাতে মাটির শূন্যগর্ভে গলন্ত ধাতুর বুকে যখন ফুটে ওঠে অতিরৈখিক নকশা, তখন যন্ত্র সরে গিয়ে ফুটে ওঠে টোটেম, শিল্পীর বিদায়বেলায় জ্বলে ওঠে শিল্প।

২৫ নভেম্বর ‘ডোকরার ডাক’ ওয়ার্কশপের প্রধান অনুষ্ঠানের দিনটি সর্বাঙ্গীণ রূপে সাফল্যমণ্ডিত হয় শুধুমাত্র উপস্থিত শিল্পীবৃন্দের জন্য নয়, বরং সমাজের বিভিন্ন স্তর থেকে আগত শিল্পানুরাগী সাধারণ মানুষের উৎসাহী যোগদানের ফলে। তাদের স্বতঃস্ফূর্ত ছোঁয়ায় প্রাচীন শিল্পপ্রথা লাভ করে বাঁধভাঙা এক অপার আগ্রহী প্রাঞ্জলতা। ডোকরার ইতিহাস, নান্দনিকতা ও তার আর্থসামাজিক পটভূমিকার উপর পুঙ্খানুপুঙ্খ  বক্তব্য পেশ করেন যোগেন চৌধুরী, আলোচনা ও বিশ্লেষণে উঠে আসে অনেক কিছু, যেমন শিল্পদর্শনে দৈনন্দিন জীবনের ভূমিকা, শিল্পসাধনায় প্রথাগত পন্থাকে ভেঙে ফেলার গুরুত্ব ও লোকশিল্পের অর্থনৈতিক উন্নয়নে নাগরিকত্বের দায়িত্ব। আমন্ত্রিত সংগীতশিল্পী সৌম্যদীপ মুর্শিদাবাদীর কন্ঠে রাগাশ্রয়ী গানের সঙ্গে তাল মেলায় কড়াই উপচে পড়া কাঠের গনগনে আগুন, আর পাক খেয়ে ওঠা ধোঁয়ার কুণ্ডলী ঝিমিয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেদিনকার মতো কর্মসূচির সমাপ্তি ঘটে আমন্ত্রিত শিল্পীদের হাতে সংবর্ধনা এবং উপঢৌকনস্বরূপ গাছের চারা সঁপে দিয়ে। সারি সারি নবনির্মিত ডোকরা ভাস্কর্যের পাশাপাশি রয়ে যায় একগুচ্ছ উপলব্ধি আর এলোমেলো কিছু জিজ্ঞাসাচিহ্ন।

ডোকরা কি শুধুমাত্র এক শিল্পবিশেষ নাকি এক সর্বাঙ্গীণ জীবনদর্শন? ডোকরা কেবল মাত্র মাটি, মোম, ধুনো ও পিতলের কারসাজি নয়, ডোকরা শুধুমাত্র ধুনোমিশ্রিত পিচের সুতোর ঝাঝা, মোচড়া, চান্দ, নেনুয়া বা জালদার নামক বিবিধ প্রকারের সিকরী বা নকশার ভোজবাজি নয়, ডোকরা আসলে এক চিরন্তন প্রয়াস, এক শাশ্বত পর্যায় যেখানে বিভিন্ন ঘরানা ও বিভিন্ন জগতের শিল্প নদীর মতো নিজেদের স্বতন্ত্র ভাঙনের পথ ধরে বয়ে এসে এক অদ্ভুত যুগায়ত মোহনার যাপনে মিশে যায়, মিশে যায় তাদের নিজস্বতা, মিশে যায় তাদের নান্দনিকতা, মিশে যায় তাদের নিজের নিজের কথকতা, রূপ, রেখা ও মাত্রা, আর প্রথাগত রোজনামচা ভেঙেচুরে সাবলীল এই মিলনে জন্ম নেয় এক সময়াতীত নব দর্শন, এক সময়হীন নব অলংকরণ। স্মৃতি ও কৃষ্টির আলফাজে আলিঙ্গনে শিল্প ও শিল্পী একে অপরকে করে নতুন ভাবে আবিষ্কার। সামগ্রিক মানব সভ্যতার নিত্য যুগান্তরে ও সন্ধিক্ষণে এটাই চালচিত্র অ্যাকাডেমির একান্ত অঙ্গীকার।

ছবি: কুণাল গাঙ্গুলি

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here