তপন মল্লিক চৌধুরী

সাংস্কৃতিক অনুষঙ্গ ব্যাপক, তবু তারই মধ্যে মণিপুরিরা তাদের জাতিগত অস্তিত্বকে বৃহৎ পরিসরেই জানান দেয়। বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি ও মেইতেই মণিপুরি – ভাষাগত ভাবে মণিপুরিরা দুই ভাগে অন্তর্বিভক্ত। ভাষার ভিন্নতা সত্ত্বেও তারা প্রায় একই সংস্কৃতির উত্তরাধিকারী; সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিসরেও একই জাতিসত্তার পরিচয়বাহী। পরবর্তীতে ইসলাম ধর্মানুসারী ‘পাঙাল’রাও অন্তর্ভুক্ত, যারা মুসলিম মণিপুরি নামে পরিচিত। মণিপুরিরা বাংলা চৈত্র মাসের শেষ দিন থেকে পাঁচ দিনব্যাপী উদযাপন করে বিষু উৎসব। ‘বিষু’ শব্দটি কোত্থেকে কী ভাবে এল, তার সুরাহা এখনও হয়নি। সংস্কৃতে বিষু শব্দের কাছাকাছি অর্থ সমতা বা সমান। জ্যোতির্বিজ্ঞান বলে, সূর্য নাকি সে দিন বিষুবরেখার মাঝখানে থাকে। দিন আর রাতের দৈর্ঘ্য তাই সমান। কিন্তু উৎসবটি একেবারে গ্রামীণ মানুষের লোকজীবনের ভেতর থেকে উঠে আসা, জ্যোতির্বিজ্ঞানের ভাষা সেখানে কি বেমানান নয়?

এই উৎসবের মতো অসংখ্য উৎসব রয়েছে। যেমন অসমে প্রচলিত রয়েছে বিহু। বিহু শব্দটা ডিমাসা জাতির ভেতর থেকেই এসেছে বলে ধারণা করা হয়। অসমীয়াদের মধ্যে বিহু নামের একটি লোকনৃত্য বেশ জনপ্রিয়। কিন্তু মনে করা হয় বিহু শব্দটি বিষু শব্দেরই অপভ্রংশ, যেখানে বি শব্দের অর্থ চাওয়া বা কামনা করা, আর ষু শব্দের অর্থ শান্তি-সমৃদ্ধি। সকলের শান্তি-সমৃদ্ধি কামনায় যে উৎসব হয়ে থাকে। আবার কলাগুরু বিষ্ণুপ্রসাদ সিংহের মতে বি মানে কিছু চাওয়া বা প্রার্থনা করা এবং ষু মানে কিছু দেওয়া। অর্থাৎ পরস্পরের আদানপ্রদানের উৎসব। মণিপুরিদের বিষু উৎসবের চরিত্রের সঙ্গে শব্দটির সেই উৎপত্তিগত অর্থের একটা সাযুজ্য আছে। বলা হয় এই উৎসব ইন্দো-আর্য, অস্ট্রো-এশীয়, সিনো-বর্মীদের মধ্যেও প্রচলিত। বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরিরা ইন্দো-আর্য পরিবারভুক্ত। মণিপুরিদের সঙ্গে অসমীয়া জনগণের একটা সংস্কৃতিগত আত্মীয়তা আছে। আবার কেরলেও বিষু নামের উৎসব হয়, হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের। মালায়ালাম ক্যালেন্ডার কলাবর্ষম অনুযায়ী ওই দিন নববর্ষ।

bihu dance of assam
অসমের বিহু নৃত্য।

বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরিদের বিষু বাংলা বর্ষপঞ্জির দিনক্ষণ অনুযায়ী হলেও, কৃত্য-আচারের পুরোটাই তাদের নিজস্ব লৌকিক উপাদানে ভরপুর। মণিপুরিদের বিশ্বাস তাদের প্রতিটি লামে (এলাকায়) এক একজন নির্দিষ্ট দৌ (দেবতা) থাকেন, যাঁর সেবা-অর্চনার মধ্য দিয়ে ঘটে ইহজগতের মঙ্গল। সেই দেবতাকে বলা হয় লামর দৌ। বিষুর দিন ওই লামর দৌ-এর তুষ্টির জন্য বিশেষ কৃত্য পালন করা হয়। লামর দৌ-এর প্রতি নিবেদিত গান-নৃত্য পরিবেশনের রীতি কিছুকাল আগে পর্যন্তও ছিল এখন তেমন দেখা যায় না।

এই লামর দৌ বা সোজা বাংলায় গ্রাম-দেবতা তিনিই, যিনি ওই গ্রামে প্রথম দেহত্যাগ করেছিলেন। মৃত্যুকে মণিপুরিরা দৌ অনাবলে অভিহিত করে, অর্থাৎ আত্মা মনুষ্যদেহ ছেড়ে দেহহীন দেবতায় পরিণত হয়।

এই উৎসবের আরেকটি প্রচলিত মত, লামর দৌ হবেন সেই এলাকায় মারা যাওয়া প্রথম পুরুষ ও নারী। যেমন ঘোড়ামারা গ্রামের লামর দৌ হচ্ছেন বলাই আর থানু নামের দুই পুরুষ ও নারী। বিষুর দিন নিবেদিত ভোগ-প্রসাদে সেই গ্রামে তাঁরাই পূজিত হন। সে ভাবে প্রতিটি গ্রামে আলাদা আলাদা লামর দৌ-এর পুজো চলে এ দিন। এই পুজো কোনো যজ্ঞ বা শ্লোকাচারে হয় না। হয় সাধারণ ভক্তি আর ভোগ নিবেদনে। বিষুর দিন মণিপুরিরা ভোর থেকে গোবরমাটি দিয়ে ঘরদোর লেপামোছা করে। বৎসরের আবর্জনা যেন ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে যায়। তার পরই বাড়ির মেয়েরা লেগে যায় রান্নাবান্নার কাজে। সহজিয়া বৈষ্ণব ধর্মানুসারী মণিপুরিদের পার্বণে কেবল নিরামিষ ভোজনের নিয়ম, তবে বহু পদ। ডাল, সাকলখই, ঙৌথং, ইরলপা, তিঁতা ভাজা এ সব তো আছেই, সঙ্গে থাকে বিরন বা বিন্নি চালের ভাত, যা খাওয়া হয় কলা-দুধ-চিনি মিশিয়ে।

food offered to god in bishu festival
বিষুর দিনে গ্রাম-দেবতাকে ভোগ নিবেদন।

পরিবারের কর্তা খুব সকালবেলা স্নান সেরে অন্যান্য কৃত্য শেষ করে কলার পাতায় সাজানো দৌর এইরুক বা দেবতার ভোগ নিবেদন করেন বাড়ির আরাঙে। মণিপুরিদের বাড়ির সামনে বাঁশ দিয়ে বানানো বিশেষ ধরনের স্থায়ী গেটকে আরাঙ বলা হয়। পূর্ব পুরুষের বিদেহী আত্মার মঙ্গল কামনা করে প্রসাদ নিবেদনের আর্তিতে জড়িয়ে থাকে নিজের পরিজনদের আগামী বছরটির শুভকামনাও।

দেবতার উদ্দেশে প্রসাদ নিবেদনের পর শুরু হয় রান্নার তরকারি বা নিরামিষ পদগুলোর আদানপ্রদানের পালা। আজ বিষু, আজ যেমন রাত আর দিনের দৈর্ঘ্য সমান, তেমনি আজ মানুষও যেন সবাই সমান সমান। আজ কেউ কারও পর নয়, কেউ কারও শত্রু নয়। গ্রামের এ-মাথা থেকে ও-মাথা পর্যন্ত চলবে খাবার আনা-নেওয়া। ছোটো ছোটো ছেলেমেয়েরা নিজেদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরে কুপাঙ (বড়ো থালা)-এ করে নানান পদের খাবার নিয়ে এ-বাড়ি ও-বাড়ি বিতরণ করে। এক একটা বাড়ির রান্নাঘরে জমা হয় অজস্র পদের তরকারি। ছেলেদের পরনে থাকে দ্বিরঙা পাছাতি, কখনও সাদা-কালো, কখনও সাদা-সবুজ, কখনও বা সাদা-লাল ডোরাকাটা। তবে সাদা রঙটি থাকবেই, তা যে সত্য ও শুভ্রতার প্রতীক। মেয়েদের পরনে নীচের ভাগে থাকে লাহিং নামের পরিধেয় বস্ত্র, হলুদ, লাল, নীল নানান রঙের। উপরের অংশে ব্লাউজ আর ছোটো-বড়ো ইনাফি বা ওড়না। মণিপুরিদের জাতিতাত্ত্বিক মোটিফ মোইরাঙখচিত ও নানান কারুকার্য-আঁকা।

সন্ধ্যায় পিঠা ভাজার ধুম। এই পিঠা বিষুর পিঠা নামে পরিচিত। বিশেষ ভাবে তৈরি করতে হয়। বিরন বা বিন্নি চালের সঙ্গে দুধ-কলা-গুড় মিশিয়ে তৈরি করতে হয় পিঠার মূল উপাদান। নানান আকারের পিঠা বানানো হয়। গোল, চ্যাপ্টা, চৌকো নানা রকম। পিঠা কড়াই থেকে তোলার জন্য থাকে সরু কাঠি, কাঠির এক ভাগ সুচের মতো ছুঁচলো।

বিষুর পিঠা খেতে অনেকটা চুইংগামের মতো। বেশি সময় ধরে চিবোতে হয়। কিন্তু খুব স্বাদ। পিঠা যখন বাসি হয়ে যায়, তখন এর স্বাদ বেড়ে যায় আরও! পিঠা তৈরির পর প্রথম পিঠাভোগ নিবেদন করা হয় বাড়ি সংলগ্ন তুলসীগাছের তলায়।

nikon game of manipur
নিকন খেলা।

এর পর ঘরে ঘরে পিঠা বিলোনোর পালা। পিঠার গন্ধে ভরে যায় পাড়াগুলো। বউ-কথা-কও পাখির চার মাত্রার ডাকের সঙ্গে ছন্দ মিলিয়ে মণিপুরিদের ছেলেভুলানো ছড়ার লাইন -‘বিষুর পিঠা বাঘগই খেইল’ (বিষুর পিঠা বাঘে খেল)। বিষুর রাতে থাকে নিকন খেলা (পাশাখেলা)। কাপড়ের বানানো বোর্ড। গুটিগুলোও বেশ কারুকাজ করা। নিকন খেলার বা পাশাখেলার প্রতিযোগিতা চলে রাতভর। খেলায় নারী-পুরুষ ছোটো-বড়ো সবাই যোগ দেয়। পাঁচ দিন ধরে চলে এই বিষুর পিঠা খাওয়া আর নিকন খেলার পর্ব।

আগে বিষুর সময় নানা রকমের গ্রামীণ খেলাধুলা হত। মণিপুরিদের মধ্যে সব চেয়ে জনপ্রিয় খেলা ছিল গিল্লা খেলা। গিল্লা নামের এক বিশেষ পাহাড়ি গাছের বিচি দিয়ে তৈরি গিল্লা খেলার চাকতিটি। কখনও দু’পায়ের পাতায়, কখনও দুই হাঁটুর চাপে, কখনও বা চোখের উপরে গিল্লাটিকে রেখে মাটিতে পেতে রাখা আরেকটি গিল্লায় গিয়ে সেটি ঠোকানোর মধ্য দিয়ে খেলাটি এগিয়ে যায়। এখন সেই পাহাড়-জঙ্গল থেকে গিল্লা সংগ্রহের সময়ও নেই, তাই খেলাটিও বিলুপ্তপ্রায়।

raaslila of manipur
রাসলীলা।

এ তো গেল বিষু উৎসবের ঐতিহ্যগত সামাজিক আচার-অনুষ্ঠানের কথা। কিন্তু গত প্রায় দেড় যুগ ধরে উৎসবটি, বিশেষ করে বাংলাদেশে ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে এর সমকালীন সাংস্কৃতিক তাড়নায় আয়োজিত একটি অন্য রকম অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে। একে কেন্দ্র করে বিশ্বাস-সংস্কারের সীমাবদ্ধতা ভেঙে খোলা মাঠে নানান ধরনের আয়োজনে প্রতি বছর মুখর হয়ে ওঠে মণিপুরি তারুণ্যের সাংস্কৃতিক প্লাটফর্ম মণিপুরি থিয়েটার। মণিপুরি থিয়েটারের তরুণরা ভেবেছিল কেবল ঐতিহ্য, কৃত্য আর লোকাচারে পড়ে থাকলে চলবে না, বিষু উৎসবকে বাঙালির নববর্ষের মতো মণিপুরিদের একটা সামাজিক-সাংস্কৃতিক সম্মিলনের ক্ষেত্র করে তুলতে হবে। ধীরে ধীরে এই আয়োজনে শুধু মণিপুরি নয়, আশেপাশের নানান সম্প্রদায়ের মানুষের ঢল নামতে শুরু করেছে। মণিপুরিদের ধর্মীয় মণ্ডপভিত্তিক পালা-লীলার পরিবেশনাগুলো বেরিয়ে আসে খোলা মঞ্চে। সেখানে পরিবেশিত হয় খানিকটা নিরীক্ষাধর্মী রাসলীলা, রাখালরাস, উদুখলরাস-সহ নানান আঙ্গিক। মানত ও মঙ্গলের ধারণা থেকে বেরিয়ে এসে জাতিগত সাংস্কৃতিক উপাদানগুলোকে মানুষের আরও কাছাকাছি নিয়ে আসতে এ উৎসবটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এখন মণিপুরিদের কাছে বিষু উৎসবের আকাঙ্ক্ষা যতটুকু পিঠা-ভোজন-নিকন খেলার জন্য, মণিপুরি থিয়েটারের আয়োজনটির জন্যও তার কম নয়। আর সকালে মণিপুরিদের নিজস্ব ঝলমলে পোশাকে নিজেদের ভাষায় গান করতে করতে ঢোল আর মৃদঙ্গ বাজাতে বাজাতে রাস্তায় চলতে থাকে মঙ্গল শোভাযাত্রা।

theater of manipur
মণিপুরি থিয়েটার।

মেইতেই মণিপুরিরা মণিপুরে উদযাপিত সহস্র বছরের পুরোনো বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী পালন করে সাজিবু চেইরাওবা নামের নববর্ষ উৎসব। মেইতেই মণিপুরিদের মধ্যে প্রচলিত চন্দ্রবর্ষপঞ্জিতে সাজিবু হচ্ছে প্রথম মাস। চেই মানে কাঠি, রাওবা মানে ঘোষণা। মণিপুরে আদিকালে নতুন বছর আসার সময় গ্রামীণ জনপদে রাজার আজ্ঞাবাহী একজন অশ্বারোহী কাঠি ঘোরাতে ঘোরাতে নববর্ষের ঘোষণা করত। তা থেকেই দিনটির নাম চেইরাওবাবা মতান্তরে সাজিবু চেইরাওবা হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। এ দিন মেইতেই মণিপুরিরা ধোয়া মোছা করে বাড়ি-ঘর পরিচ্ছন্ন করে তোলে। থাকে নানান খাবার-দাবারের আয়োজন। এ ছাড়া মণিপুরিদের আদিভূমি মণিপুরে এ দিন মেইতেইরা চেইরোচিং পর্বতে উঠে নৃত্যগীত করে থাকে; বিশ্বে তাদের অবস্থান যেন সেই পর্বতের মহত্তম উচ্চতায় ওঠে – এই প্রতীকী বিশ্বাসে। মণিপুরিদের প্রাচীন কাঙ খেলার প্রতিযোগিতাও হয়ে থাকে কয়েক দিন ব্যাপী। পাঙাল বা মুসলিম মণিপুরিদের সে ভাবে বিশেষ কোনো কৃত্য না থাকলেও নববর্ষের দিন বিভিন্ন ধরনের খাওয়াদাওয়ার আয়োজন হয়ে থাকে। তাদের মধ্যেও কাঙ খেলার প্রচলন রয়েছে।

kang game of manipur
কাঙ খেলা।

বছর শেষ ও শুরুর সন্ধি এ ভাবে মণিপুরি জনজীবনে নানান বৈচিত্র্যে সেজে ওঠে। কৃত্য আর সহজ লোকাচার সেখানে একাকার হয়ে যায়। আর জীবনের চলমান শক্তি নতুন করে প্রকৃতির সঙ্গে আত্মিক সম্পর্ক রচনা করে।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here