women football
ফুটবলে মেয়েরা।
jahir raihan
জাহির রায়হান

সাবিনা রুবিনা সহোদর দুই বোন, একজনের জার্সি নম্বর ‘ছয়’, আরেক জনের ‘নয়’। এরা দু’ জনেই আজ সমাজ সংস্কার পরিবার পরিজনের অচলায়তন ভেঙে, বাঁধাগতের বদ্ধ মানসিকতাকে আক্ষরিক অর্থেই নয়-ছয় করে দাপাচ্ছে ফুটবল মাঠ। মাঠে উপস্থিত প্রায় হাজার দেড়েক মানুষ, ছেলে বুড়ো যুবক, অবিবাহিতা তরুণী, গাঁয়ের বঁধু, বাচ্চাকাচ্চা। তাদের সামনেই শম্পা মাল তার নিকষ জমাট কালো শরীরটাকে নাগাড়ে ছুটিয়ে নিয়ে চলেছে গোলাকার ফুটবলের পিছে পিছে। দর্শকের উন্মাদনা, গ্রামের অগণিত পিছিয়ে পড়া, প্রান্তিক মানুষের চোখে অবিশ্বাস্যের চাউনি, বিস্ফারিত দৃষ্টিতে দেখছে চিত্তরঞ্জনের রুপালি বাউড়ি বিপক্ষের রক্ষণ ভেঙে বল জড়িয়ে দিয়েছে বাধার বেড়াজালে। আমিও সাক্ষী ছিলাম সেই বিদ্রোহী বীরাঙ্গনাদের অকূ্ত্রিম লড়াইয়ের। তাদের লড়াইকে শত শত কুর্নিশ।

বর্ধমানের শ্রীপুর আমার মামাশ্বশুরের বাড়ি। চলেছি ভরা হেমন্তে। মাঠভর্তি হলুদে সবুজে মাখামাখি আমন ধান। অগ্রহায়ণ মাসই যে সেই পরিশ্রমের ফসল ঘরে তোলার মরশুম। নতুন ফসলপ্রাপ্তিতে শ্রীপুরে ঘরে ঘরে খুশির বান ডাকে, মহা সমারোহে পালিত হয় নবান্ন, গ্রামবাসী যাকে ডাকে ‘নবান’ বলে। শ্রীপুরের এই ধুমের কথা শুনেছিলাম সহধর্মিনীর কাছেই, ছোটোবেলার নানান সুখস্মৃতি সে শুনিয়েছিল আমায় নানা আহ্লাদী অবসরে। সব জেনে শুনে আমার মনে হয়েছে ধর্ম ও সম্প্রদায়ভিত্তিক পরবের বাইরে নির্দ্বিধায় নিশ্চিত ভাবে রাখা যায় নবান্নকে। সব বর্ণ, ধর্ম ও সম্প্রদায়ের আপামর মানুষের একত্রে একযোগে আনন্দ উদযাপনের এত বড়ো উপলক্ষ্য আর বুঝি বা নেই। নতুন শস্য ওঠার অনাবিল আনন্দ উৎসব, এক কথায় মন-কেমন-করা সতেজ সুন্দর হৈমন্তী অনুভূতি। সেই অনুভূতির আঁচ পেতে আমিও পৌঁছোলাম শ্রীপুর এ বছর অঘ্রাণে।

expression of power through football
নারীশক্তির বহিঃপ্রকাশ।

মাঠ থেকে বয়ে আনা নতুন আমন ভেঙে করা আতপচাল গুঁড়ো করে তৈরি করা আটার সাথে চিনি, নারকেল-সহ আরও নানা কিছু মিশিয়ে মাখিয়ে তৈরি করা যে উপাদেয় লোভাতুর মিশ্রণ পরিবেশন করল শ্যালিকা তা ইহজন্মে কপালে কখনও জোটেনি ইতিপূর্বে। খাওয়াদাওয়ার আয়োজনও প্রচুর, মাইকে গান বাজছে সারা গ্রাম জুড়ে। কিন্তু এ সব ছাড়িয়ে যখন শুনলাম নবান্ন উপলক্ষে দিঘির পাড় মাঠে একটি মহিলা প্রীতি ফুটবল ম্যাচের আয়োজন করেছে স্থানীয় যুব সংঘ, পুরো ব্যাপারটাই উপস্থিত হল এক অন্যতর মাত্রায়। প্রথমত শ্রীপুর কোনোভাবেই শহর নয়, আদতে গ্রামবাংলার একটি সাধারণ জনপদই। উচ্চশিক্ষার হারও খুশিতে বিগলিত হওয়ার মতো নয়। অথচ সব জড়তা ও কলুষিত চিন্তাভাবনার দৈন্যতাকে দূরে সরিয়ে সেই গ্রামেই আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে কিশোরী তরুণীদের ফুটবল দলকে। সেটা একটা অসম্ভব ভালো লাগার বিষয়, একটা রুপোলি আলোর রেখা, একটা স্বতঃস্ফূর্ত সভ্য উদারতার সুনিপুণ উদাহরণ।

আরও পড়ুন রবিবারের পড়া: ছায়ানটের গান, প্রাণে জেগে অন্তরঙ্গ রবিশংকর

যথা সময়ে মাঠে প্রবেশ করতে টিকিট কাটতে হল যথামূল্যে। বাহ! বড়ো খুশির খবর। মেয়েদের খেলা দেখতে হবে পয়সা দিয়েই, বিনে পয়সার কোনো বন্দোবস্ত নেই। মেয়েরাও অর্জন করেছে সেই সম্মান, সেই অধরা স্বীকৃতি যার কারণে বিনা বিরক্তিতেই টিকিট কেটে গ্রামবাসী ভরিয়ে ফেলেছে আয়তাকার মাঠের চারি দিক। মাঠ-পার্শ্ববর্তী বাড়ির ছাদ ও চিলেকোঠাতেও থিকথিকে ভিড়, সকলের চোখে মুখেই উৎসাহ উদ্দীপনা, নানান রঙের ওঠাপড়া। মহিলামহলের চোখেমুখে আপাত কাঠিন্য। মাঠে যারা খেলবে তারাই অগোচরে এই গ্রাম্য প্রায়-বঞ্চিত মহিলাবর্গের জবাবই প্রতিনিধি, অনেক যন্ত্রণার বুঝি বা আজ নিরসন হবে, অনেক উপেক্ষা, অপমান, লাঞ্ছনা, গঞ্জনার হবে নিশ্চিত অবসান, জবাব মিলবে বহু অনুচ্চারিত প্রশ্নমালার, ফুটবলের গায়ে সপাটে পড়া কড়া লাথি বলের সাথে সাথে উড়িয়ে নিয়ে যাবে সেই সব প্রাচীন অযৌক্তিক অচল অথর্ব ধ্যানধারণাকে, যার কারণে বাড়ির মেয়েদের নানান নিষেধের সাথে ঘর করতে হয় প্রতিনিয়ত, প্রতিদিন ।

খেলার সূচনা বাঁশি বাজার সাথে সাথেই। মাঠ জুড়ে শুরু দুই দলের বল্গাহীন ১৪ জন ইস্পাত-কঠিন কন্যার দাপুটে দাপাদাপি। বল দখল করা ও কেড়ে নেওয়ার মরণপণ লড়াই। সে লড়াইয়ে কেউ কাউকে এক ইঞ্চি জমি ছাড়তে নারাজ বিনা যুদ্ধে। সমানে সমানে টক্কর চলছে। খেলোযাড়দের শরীরী ভাষায় ফুটে বের হচ্ছে হার-না-মানা জেদ, বহু কণ্টকাকীর্ণ পথ পেরিয়ে এসে আজ জনসমক্ষে শুরু হয়েছে কৈশোর তেজ স্থাপনের দুর্নিবার প্রচেষ্টা। এদের প্রত্যেককেই সবার অলক্ষ্যেই লড়ে যেতে হয় প্রাত্যহিক লড়াই, প্রতিটি অধিকার ছিনিয়ে নেওয়ার অব্যক্ত যন্ত্রণা জমে রয়েছে তাদের অন্তরের অলিন্দে। আজ যেন সব বাধা বঞ্চনার জবাব দেওয়ার জন্য লড়াকু বোনেরা বেছে নিয়েছে ফুটবলের এই চারকোণা ময়দানকে। তারাও যে মানুষ, এ পৃথিবীর রূপ-রস-গন্ধে তাদেরও যে সমান অধিকার রয়েছে, তা যেন বুঝিয়ে দিতে চায় এই দুরন্ত দুর্বার দামাল বালিকারা। সামাজিক, পারিবারিক শীতল রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে আজ তাদের বুঝে নেওয়ার লড়াই।

winner awarded
বিজয়ীকে সম্মান।

চোখের সামনে সে লড়াই দেখতে দেখতে আমি ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছি দূরে, বহু দূরে…আমার বড়ো বোনকে বাড়ি থেকে শাড়ির ব্যবসা করতে বারণ করা হয়েছিল পাছে বিয়ে দিতে সমস্যা হয় আগত ভবিষ্যতে, আমার মামাতো বোনের বিয়ে ভেঙে যাচ্ছিল বার বার তার গায়ের রঙ কালো বলে, এখনও মাছের বড়ো অংশটা খেতে বসে পেয়ে থাকে বাড়ির রোজগেরে ছোটো ছেলে, পাশে বড়ো দিদি থাকা সত্ত্বেও, এখনও শুধু পুত্রসন্তান পাওয়ার আশায় বহু বাড়িতে পর পর সন্তান নেওয়া হয়, কন্যাসন্তানের জন্মানোয় কুঁচকে ওঠে পরিবারের মুখমণ্ডল। কন্যাসন্তান জন্ম দেওয়ার অনৈচ্ছিক অলঙ্ঘ অপরাধে কুণ্ঠিত হয়ে ওঠে সদ্য-মা-হওয়া মায়ের মুখ। শিক্ষাদীক্ষায়, সুযোগসুবিধায় বঞ্চিত রাখা হয় পরিবারের কন্যাসন্তানটিকেই। নিপীড়ণ, নির্যাতন আর অবজ্ঞা-অবহেলার আরেক নাম যেন ললনা। জন্মের পর থেকেই নিজ অস্তিত্ব জানান দেওয়ার নিদারুণ লড়াই লড়তে হয় নারীদেরই। মেয়েদের বুঝি জন্মই হয় পুরুষের মনোরঞ্জনের জন্য। মেয়ে জন্মালেই পরিবারের মাথায় চড়ে বসে চাপের পাহাড়। মেয়ে যত বড়ো হয় সে পাহাড় ততই ঊর্ধ্বমুখে বাড়তে থাকে, কোনোক্রমে বড়ো করে বিয়ে দিতে পারলেই বুঝি যাবতীয় সমস্যার নিশ্চিত সমাধান, নারীর বুঝি আলাদা কোন সত্তা থাকতে নেই, পুরুষের অঙ্গুলিহেলনেই নিয়ন্ত্রিত হবে তার জীবনপ্রবাহ। সভ্য ডিজিটাল দেশে জন্মানোর পূর্বেই লিঙ্গ নির্ধারণ ও কন্যাভ্রূণ হত্যার মতো ঘটনা ঘটে চলে আকছার। সমাজ সব দেখে শুনেও চোখ কান বন্ধ করে রেখে দেয়, না-দেখা, না-শোনার ভান করে। বিদ্বজনদের মুখে কুলুপ, দেবতার ঘরে প্রবেশ করতে হলেও দেশের মেয়েদের সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হতে হয়।

আরও পড়ুন রবিবারের পড়া : প্রাচীন ভারতে গণিতচর্চা

গো-ও-ল আর কোলাহিত হাততালির কলরবে সংবিৎ ফিরে আসে, বুকের ভিতরে অজানা অব্যক্ত এক অনুভূতি ডানা ঝাপটায়। চোখ দেখে, আহত এক কিশোরী ফুটবলারের প্রাথমিক পরিচর্যায় মাঠে ছুটে চলে ডাক্তার, জলের বোতল হাতে পৌঁছে যায় ক্লাবের যুবক প্রতিনিধি। মাইকে ঘোষণা হয়, খেলা শেষে মাঠের মধ্যে কোনো দর্শকই যেন অনধিকার প্রবেশ না করে। আগত ফুটবলাররা শ্রীপুর গ্রামের অতিথি, তাদের সম্মানরক্ষার দায়ও তাই গ্রামবাসীর। হয়ও তাই, ম্যাচ শেষে যুবকবৃন্দের কর্ডনে মঞ্চের সামনে উপস্থিত হয় নাসিমা, জুলি, মিতালি, রুপালিরা। সমবেত দর্শকের আন্তরিক অভিবাদন ও করতালিতে মুখর হয়ে ওঠে লড়াইয়ের ময়দান। হারজিত সরিয়ে রেখে আজ যেন নতুন করে ঘোষিত হয় নারীবাহিনীর জয়, পত পত করে উড়তে থাকে নারীশক্তির বিজয় পতাকা সগর্বে, তাদের অদম্য লড়াই সমীহ জাগায় উপস্থিত জনসমষ্টির হৃদয়ের অলিগলিতে। অভিবাদনের আন্তরিকতায় এই দুর্মর দুর্দান্ত বালিকাদের চোখের কোণ চিক চিক করে জ্বলে ওঠে। আবেগ জয় করে তবু তারা সহযোদ্ধাদের সাথে বসে থাকে নির্লিপ্ত অভ্যাসে।

খেলায় দুই শূন্য গোলে হারিয়ে দেয় চিত্তরঞ্জন, ভাতার ফুটবল ক্লাবকে। যদিও আমার চোখে তখন দু’দলের খেলোয়াড়রা সমবেত ভাবে একশো গোলে হারিয়ে দিয়েছে পুরুষশাসিত সমাজের বদ্ধ জগদ্দল পাহাড়ের বিন্ধ্যাচলকে, সপাট সাহসে।

ছবি লেখক

 

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here