বইমেলার কড়চা-উনিশ : ‘ফেসবুক ছাড়াও সাহিত্য হয়’

0
kolkata bookfair
কলকাতা বইমেলা। নিজস্ব চিত্র।
jahir raihan
জাহির রায়হান

‘ফেসবুক ছাড়াও সাহিত্য হয়’ – কোনো একটি স্টলে অমোঘ এ লাইন নজরে নিয়েই শুরু হল আমার উনিশের বইমেলা পরিভ্রমণ।

বইমেলা আসা মানেই একলপ্তে বিশ্বদর্শন। দু’ হাজার আঠেরো সাল বহু গুণীজন, বিদগ্ধ সাহিত্যসাধকের প্রাণ নিয়েছে। ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে তাই প্রতি দিন সকালবেলায় দিন গুণতাম, খবরের কাগজে চোখ রাখতাম ভয়ে ভয়ে। শেষমেশ সাল বিদায় নিলেও মৃত্যুমিছিল শেষ হল না।

চলে গেলেন দিব্যেন্দু পালিত। তাঁর শেষ যাত্রার দিন কয়েক পরেই অলৌকিক যানের সওয়ারি হয়ে নীলকন্ঠের খোঁজ করতে হারিয়ে গেলেন অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই কৈশোরেই পড়ে ফেলেছিলাম ‘নীলকন্ঠ পাখির খোঁজে’ ও ‘অলৌকিক জলযান’।

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় ও অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঝরঝরে তরতরে বাংলা, আমি বড়োই ভালোবাসি। এঁদের মধ্যে অতীনবাবু আবার দীর্ঘদিন শিক্ষকতা করে গিয়েছেন আমারই এলাকায়, তাই তাঁর নামের সঙ্গে অনুভব করি সাবলীল আত্মীয়তার টান। সেই স্কুলটির পাশ দিয়ে যাতায়াতের পথে নিজ হতেই নজর চলে যায় বিদ্যালয়ের অলিন্দে। আমার বন্ধু সেবাব্রতের মা, অতীনবাবুর ছাত্রী, সেটা অবশ্য দুঃসংবাদটি পাওয়ার পরই জানলাম। অতগুলো তারকাপাতের পর ভেবেছিলাম যাব না আর বইমেলায়। কিন্তু লোভ সংবরণ করা গেল না, যেতেই হল। আর গিয়েই চোখে পড়ল ‘ফেসবুক ছাড়াও সাহিত্য হয়’!

আরও পড়ুন কলকাতা বইমেলা, কলকাতা প্রাণমেলা

মুর্শিদাবাদ জেলা বইমেলায় এ বার বেচাকেনা ভালো হয়েছে। আমার শহরের বইমেলার বয়স এ বার দুই। তারাও দাবি করছে, বিক্রিবাটা ভালোই। জেলার অন্যান্য বইমেলার বিক্রয়চিত্র নাকি ঊর্ধ্বমুখী। তা হলে কি মানুষ বইমুখী হচ্ছে আবার?

এ কথা লিখতে গিয়েই মাথায় এল, যত দামের মোবাইল ফোন বা জামাকাপড় আমরা ব্যবহার করি সচরাচর, সমমূল্যের বই কি আমরা কিনি কখনও? আমার শিক্ষক অরুণাভবাবু শিখিয়েছিলেন, শোন জাহির, নিমন্ত্রণবাড়িতে কখনও থালা, বাটি, গেলাস নিয়ে খেতে যাবি না, ওতে নিমন্ত্রণকর্তাকে অপমান করা হয়, যেন তাদের বড়িতে ও সব নেই, তাই তুই নিয়ে যাচ্ছিস! হয় খালি হাতে খেতে যাবি, আর যদি খালি হাতে যেতে লজ্জা লাগে, তা হলে এক গোছা ফুল নিয়ে যাস নতুবা একখানি বই। সেই থেকে সত্যসত্যই বই নিয়ে যাই নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে, মাথায় রাখি কার বাড়ি যাচ্ছি, সেই অনুযায়ী বই নির্বাচন করে থাকি।

বই মানুষের পরম বন্ধু। বাস্তব চাহিদা অনুযায়ী বইয়ের সঙ্গে দইও পাওয়া যাচ্ছে বইমেলায় ঠিকই, কিন্তু এত মানুষ বইয়ের টানেই এসেছে বইমেলা, এটা দেখতেও ভালো লাগে। ‘জাগো বাংলা’র সজ্জা চোখ টানে, চোখ টানে বাংলাদেশের রোজ গার্ডেনের অনুরূপ মণ্ডপটিও। প্রবেশপথেই দেওয়া আছে রোজ গার্ডেনের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস।

ভিয়েতনামের স্টলের মধ্যে যে তরূণীদ্বয় মোবাইলে মগ্ন ছিল তারা ভিয়েতনামবাসী কিনা জানতে ইচ্ছে হল, কিন্তু জিজ্ঞেস করতে সাহস হল না। দেড়শো টাকায় এক ব্যাগ ছোটোদের বই পাওয়া যাচ্ছে, গতবার ফ্রি’তে বাইবেল দিয়েছিল, এ বার কোরআন শরীফও দিচ্ছে দেখলাম। আমি অবশ্য বিশ্বভারতীর সামনে বেশ কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করলাম, যদি ফ্রি তে ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ পাওয়া যায়, কিন্তু সে সবের কোনো সম্ভাবনা দেখা গেল না।

আরও পড়ুন আমার বই পড়া: আমার পড়া বড়োই অগোছালো

অধুনা একটা বিতর্ক দেখা দিয়েছে, ইংরাজি-বিলাসীরা বলছেন রবি ঠাকুর ‘গীতাঞ্জলী’র কারণে নোবেল পাননি, পেয়েছিলেন তার ইংরাজি অনুবাদ ‘Song Offerings’-এর জন্য, অতএব বাংলা ছাড়ো ইংরাজি আনো। আমি আবার বুঝতে পারি না ভাষার সঙ্গে নোবেলের সম্পর্ক কী? অথবা নোবেল পুরস্কারই কি বিচারের একমাত্র মানদণ্ড? যে হেতু ‘Song Offerings’ নোবেল পেয়েছে তা হলে সেটাই শুধু থাকবে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাকি সৃষ্টিগুলি যে হেতু বাংলা ভাষায় রচিত তাই তার আর কোনো দাম নেই, সব জলাঞ্জলি দিতে হবে? অথবা নোবেলপ্রাপ্ত রবি ঠাকুর ছাড়া বাংলা ভাষার আর কোনো কবি-সাহিত্যিকের কোনো সম্মান নেই কারণ তাঁরা নোবেল পাননি! হায় হায়, আসলে আমরা ভুলে যাই সমালোচনা করার জন্যও ন্যূনতম একটা যোগ্যতা লাগে।

ফুড কোর্ট, পকোড়া, আইসক্রিম এ বারও আছে, গয়নার দোকানও দেখলাম, আর আছে বাউল গান, নানান আলাপ-আলোচনা, জটলা ও আড্ডা, আগের মতোই।

উৎসবপ্রিয় বাঙালির পরিচয় নানা ভাবে প্রকাশ পায় বইমেলায়। রাশি রাশি বইয়ের রাজ্য থেকে বেছে বেছে মণিমুক্তো তুলে নেয় সচেতন পাঠক নিজস্ব রুচি অনুযায়ী। মফস্‌সলের বিদ্যালয় থেকে দিদিমণির হাত ধরে আগত ছাত্র-ছাত্রীদের চোখে বইয়ের প্রতি থাকে এক অবাক করা ভালোবাসা, বইয়ের সাথে তাদের আলাপ হয়, নতুন বইয়ের মলাটে আলতো হাত বোলাতে বোলাতে, গন্ধ শুঁকতে শুঁকতে জন্ম হয় নতুন নতুন পাঠক-পাঠিকার। আর এ ভাবেই বেঁচে থাকে বইমেলা, অন্তরে ও আবদারে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here