কলকাতা : রাস্তার দু’পাশে সারি সারি বইয়ের মাঝখান দিয়ে হেঁটে গিয়ে দরজা। খুঁজে পাওয়া মুশকিল। দরজা দিয়ে ঢুকে বাঁ দিক দিয়ে উঠে গেছে সিঁড়ি, যার প্রতিটা ধাপ বলে দেয় কত গল্প। এক একটা যুগ, এক একটা সময়, দোতলা আর তিনতলা জুড়ে ছড়িয়ে এবং জড়িয়ে ইতিহাস। কলেজ স্ট্রিট কফিহাউস। সম্প্রতি কফিহাউসে বসানো হল ১৬টি সিসিটিভি ক্যামেরা। সিসিটিভি বসানোর সিদ্ধান্ত ‘ইন্ডিয়ান কফি ওয়ার্কার্স কো-অপারেটিভ লিমিটেডেরই।

নতুন এই ব্যবস্থায় বেশ ক্ষুব্ধ কফিহাউসপ্রেমীরা। কফিহাউস কর্তৃপক্ষ অবশ্য নিরাপত্তার বিষয়টিকেই সামনে এনেছেন বারবার। তবু নতুন ব্যবস্থা নিয়ে ধোঁয়াশা থেকেই যাচ্ছে আড্ডাপ্রিয় কলকাতাবাসীর।

সত্তরের দশকে বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকা বর্ষীয়ান সমাজকর্মী কৃষ্ণা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিয়মিত যাতায়াত ছিল কফিহাউসে। সময়টা ১৯৭৮-৭৯। দেখতে দেখতে কেটেছে অনেক বছর। সম্পর্ক আরও গাঢ় হয়েছে কফিহাউসের সঙ্গে, আড্ডাপ্রেমীদের সঙ্গে। হয়তো নামটাই জেনে ওঠা হয়নি, কিন্তু সময়ে অসময়ে পাশে পেয়েছেন অল্প চেনা মুখগুলোকেই। বাবরি মসজিদ ধ্বংসের প্রতিবাদে ডিসেম্বরের সেই বিকেলেও মিছিল বেরিয়েছিল কফিহাউস থেকে। বারবারই একটা প্রশ্ন খোঁচা দিয়ে যাচ্ছে কৃষ্ণা দেবীকে। ‘রাষ্ট্রের এমন কী দরকার পড়ল, যার জন্য ক্যামেরা বসাতে হল কফিহাউসে? তবে কি মানুষের স্বাধীন ভাবনায়, চলাফেরায় খুব অসুবিধে হচ্ছে শাসকদলের?’

অভিযোগ যদিও শুধুই বর্তমান শাসক দলের বিরুদ্ধে নয়। এর আগেও নব্বই-এর দশকে সরকার থেকে ঘোষণা করা হয়, নতুন চেহারায় সাজবে কফিহাউস। সেই সময় কফিহাউসের ‘কর্পোরেট-লুক’-এর প্রতিবাদে টানা ১৫ দিন প্রতিবাদ করেন কফিহাউসপ্রেমীরা। প্রতিবাদে শামিল ছিলেন কৃষ্ণাদেবী নিজেও।

সমালোচকরা মনে করছেন, শাসকদলের চাপেই এই সিদ্ধান্ত। কয়েক দিন আগে সরকারি নির্দেশে প্রেসিডেন্সি কলেজেও বসেছে ক্যামেরা। কো-অপারেটিভ লিমিটেডের সম্পাদক তেজকুমার বেরা যদিও সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন সরকারি চাপের  কথা। শহরের কফি পার্লারে অবশ্য সিসিটিভি কোনো নতুন ভাবনা নয়। সিসিডি-বারিস্তাতে বরং ক্যামেরা না থাকলেই বসতে অস্বস্তি পাবেন অনেকে। কিন্তু কফিহাউসের সংস্কৃতি তো বরাবরই অন্য রকম। গান, কবিতা, সাহিত্য, নাটক, রাজনীতি, সমাজচিন্তায় বাংলা যখন যা ভেবেছে, তারই একটা ছোটো সংস্করণ হয়ে উঠেছে কফিহাউস। সব মিলিয়ে কফি হাউস একটা প্রতিষ্ঠান।

তরুণ প্রজন্ম কী ভাবছে এই পরিবর্তন নিয়ে? প্রেসিডেন্সির প্রাক্তনী জ্যোতিপ্রসাদ রায়। কলেজ পাশ করেছেন বছর চারেক আগে। তিন বছর আগে অবধিও নিয়মিত কফিহাউসে বসত আড্ডা। জ্যোতি এবং তাঁর সহপাঠীরা অবশ্য খুব অবাক নন। জানালেন, খারাপ লাগছে, তবে অপ্রত্যাশিত নয়। ‘বাংলা জুড়েই যা চলছে, এটা হওয়ারই ছিল।’ নিরাপত্তার বিষয় নিয়ে যথেষ্ট সচেতন নতুন প্রজন্ম। তাঁদের মত, নিরাপত্তাই যদি একমাত্র কারণ হয়, তবে এই পরিবর্তনকে স্বাগত জানাতে তাঁরা তৈরি। তবে তাঁদের সিক্সথ সেন্স বলছে, বিষয়টা এতটা হালকা নয়। ভিন্ন রাজনৈতিক চিন্তাধারা যাতে গড়ে উঠতেই না পারে, তার জন্যই এত কড়া নজরদারি।

আবার প্রতিবাদ করবেন কলকাতাবাসী। শুক্রবার বিকেল ৪টেয় জড়ো হবেন শহরের নানা প্রান্তের, নানা পেশার মানুষ। ‘নিখিলেশ প্যারিসে, মঈদুল ঢাকাতে’, তাই বলে তো প্রতিবাদ থেমে থাকবে না!

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here