indrani-putaiইন্দ্রাণী সেন, বাঁকুড়া

চার বছর আগে ফেসবুক মারফত আলাপ। সেই আলাপ আরও গভীর হয় জন্মদাত্রী মা মারা যাওয়ার পর। কঠিন সময় ‘ছেলে’র পাশে ছিলেন, বুঝতে দেননি মাতৃবিয়োগের বেদনা। ফেসবুকের চ্যাটেই ‘ছেলে’র মনোবল চাঙ্গা করছিলেন ‘মা’। এ বার সেই ‘ছেলে’র ডাকেই বান্ধবীকে সঙ্গে নিয়ে তাঁর বাড়িতে চলে এলেন ‘মা’।

ছেলের নাম মুকুল দিগর, বাড়ি বাঁকুড়া জেলার আকুইয়ে। মা আরাসেলি ইয়েনা পাদমা রেমোন্দেজ, বাড়ি আর্জেন্তিনার বিয়া কানিয়াস। চার বছর আগে পঞ্চাশোর্ধ আরসেলির সঙ্গে পরিচয় হয় স্কুলশিক্ষক বছর পঁচিশের মুকুলবাবুর। তখন থেকেই আরসেলির মাতৃসুলভ আচরণে আবদ্ধ হয়ে যান মুকুল। মুকুলবাবুও আরসেলিকে তাঁর বাড়িতে আসার জন্য আহ্বান জানান। ছেলের আহ্বান ফেলতে পারেননি ‘মা’। জানুয়ারির ৫ তারিখে বান্ধবী এলিনা স্কোত্‌সকে সঙ্গে নিয়ে ভারতের মাটিতে পা দেন আরসেলি। প্রথম দিন থেকেই তাঁদের সঙ্গে ছিলেন মুকুল।

argen-1
                মুকুলবাবুর সঙ্গে আরসেলি

কয়েক দিন কলকাতায় কাটিয়ে, জয়রামবাটি, কামারপুকুর, বিষ্ণুপুর, শান্তিনিকেতন দেখে ১৯ তারিখ সন্ধ্যায় আকুইয়ে আসেন আরসেলি আর এলিনা। ওঠেন দক্ষিণপাড়ায় মুকুলবাবুর বাড়িতেই। পরের দিন থেকে ‘ছেলে’কে সঙ্গে নিয়ে আকুই ঘোরা শুরু তাঁদের। শীতের মিঠে রোদ গায়ে মেখে, কখনও লালমাটির পথ দিয়ে হেঁটে গোটা গ্রামটাই প্রায় চষে বেড়িয়েছেন। দক্ষিণপাড়ার রাধাকান্ত মন্দির থেকে পশ্চিমপাড়ার শ্রীধরনারায়ণ মন্দির, সবেতেই তাঁদের পা পড়েছে। কখনও বা পথ ছেড়ে হেঁটেছেন সবুজ ধানক্ষেতের মাঝ বরাবর আল দিয়ে, কখনও বা খানিক বিশ্রাম নিয়েছেন অলস দিঘির পাড়ে। তাঁদের দেখতেও উৎসাহী মানুষের ভিড় চোখে পড়ার মতো।

এত দিন আর্জেন্তিনা মানে টিভিতে মেসি আর মারাদোনাকে দেখে অভ্যস্ত গ্রামবাসীরা প্রথমে নিজেদের চোখকে বিশ্বাসই করতে পারেননি। সম্বিৎ ফেরার পর দুই বান্ধবীকে আপন করে নেয় গোটা গ্রাম। উৎসাহী মানুষের ভিড়ে দমই ফেলতে পারেননি মুকুলবাবু। সবার একটাই আবদার আরসেলি আর এলিনাকে একবার চোখের দেখা দেখবে। দুই বান্ধবী অবশ্য এতে এতটুকু বিরক্ত হননি, বরং সবার সঙ্গে দেখা করেছেন। পরিষ্কার ইংরেজিতে কথা বলেছেন তাদের অনেকের সঙ্গেই, মিটিয়েছেন সেলফি তোলার আবদার।

বিক্তোরিয়া ওকাম্পোর সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সম্পর্ক আজও আর্জেন্তিনীয়দের মনে গেঁথে রয়েছে। বাংলার কথা বললেই প্রথমে তাঁদের মাথায় আসেন কবিগুরু। ব্যতিক্রমী নন আরসেলিও। আকুই থেকেই ঘুরে এসেছেন শান্তিনিকেতন। মুকুলবাবু এবং সমগ্র আকুইবাসীর আতিথেয়তায় মুগ্ধ আরসেলি বলেন, “ছেলের ডাকেই তো চলে এলাম। ভবিষ্যতে আবার আসব।” মাকে পেয়ে মুকুলবাবু বলেন, “আজকের ভোগসর্বস্ব সমাজব্যবস্থায় এই প্রাপ্তি  আমার কাছে অমূল্য। নিজের জন্মদাত্রী মায়ের অভাব অনেকটাই পূরণ করেছেন এই মা। এত দূর থেকে তিনি যে আমার সঙ্গে দেখা করতে আসবেন ভাবতেই পারিনি।”

মঙ্গলবার সকালে একটু যেন ভারাক্রান্ত বাঁকুড়া জেলার এই গ্রামটি। চারদিন ধরে তাঁদের সঙ্গে থাকা দুই বিদেশিনি ফিরে যাচ্ছেন। ‘মা’ চলে যাচ্ছে, মুকুলবাবুরও তাই চোখে জল। ছেলের থেকে বিদায় নিতে মন না চাইলেও বাড়ি যে ফিরতেই হবে। সেখানে তো অপেক্ষা করে রয়েছে তাঁর তিন সন্তান। আপাতত কলকাতা এসেছেন দুই বান্ধবী। সেখানেও এক ফেসবুকে পরিচিত বন্ধুর বিয়ের নিমন্ত্রণ রক্ষা করে পাড়ি দেবেন দেশে।   

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here