titas_paulতিতাস পাল, জলপাইগুড়ি :

অবশেষে পূর্ণতা পেল সাধনার জীবন।

সন্ধে নেমেছে অনেকক্ষণ। বাইরে তখন জমাট কুয়াশায় ঘেরা অন্ধকার। ঠিক তখনই অনুভব হোম চত্বরে অন্ধকারকে সরিয়ে আলোর রোশনাই। সেই আলোর ঝলকানি সাধনার দু-চোখেও। ছাঁদনাতলায় চলছে মন্ত্র উচ্চারণ ‘যদিদং হৃদয়ং মম, তদিদং হৃদয়ং তব’। পুরোহিতমশাই-এর সঙ্গে সঙ্গে মন্ত্র উচ্চারণ করছে ছাঁদনাতলায় বসা দুই মানব-মানবী। বলা ভালো, শুধু উচ্চারণ নয়, হাতে হাত রেখে মন্ত্র মনে গেঁথে নিচ্ছে সাধনা-মন্টু। এই মন্ত্র আর শুভানুধ্যায়ীদের আশীর্বাদ-ভালোবাসাই যে তাদের নতুন জীবনপথের পাথেয়।

সাধনা বর্মণ, বাড়ি আলিপুরদুয়ারের চকচকা নামে প্রত্যন্ত এক গ্রামে। বাবা, মা, বাড়ি সবই আছে। কিন্তু তা না থাকারই শামিল। দুঃস্থ পরিবারের মেয়েটিকে মাত্র ৮ বছর বয়সে বাড়ি ছাড়তে হয়েছিল। বা বলা ভালো ‘বাড়ি’ তাকে ছেড়েছিল।

শেষ পর্যন্ত সাধনার ঠাঁই হয় জলপাইগুড়ি শহরের অনুভব হোমে। হোমে আসার পর তাকে নিয়ে খুব মুশকিলে পড়ে গিয়েছিলেন হোম সুপার ডালিয়া মিত্র। কারও সঙ্গে কোনো কথাই বলত না সে। চুপ করে সারা দিন বসে থাকত, একলা। হয়তো ফেলে আসা দিনগুলির স্মৃতি তাকে তাড়িয়ে বেড়াত। সেই সময় তার মাথায় স্নেহের হাত রাখেন অনুভবের কোঅর্ডিনেটর দীপশ্রী রায়। তার এবং হোমের অন্য কর্মীদের ভালোবাসায় সহজ স্বাভাবিক হয়ে ওঠে সে। হোমের অন্যান্য মেয়ের সঙ্গে মিলেমিশে যায়। তখনই সাধনার সুপ্ত প্রতিভা আস্তে আস্তে বাইরে বেরিয়ে আসে। স্কুলে তাকে আগেই ভর্তি করা হয়েছিল। সাফল্যের সঙ্গে মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিকের গণ্ডী পার করে সে। সেই সঙ্গে সেলাই, অঙ্কনেও পারদর্শী হয়ে ওঠে। এখানেই থেমে না থেকে বিউটি পার্লারের কাজ, এমনকি ড্রাইভিং শিখে বেশ কিছু দিন শহরে টোটো চালিয়েছে সাধনা। ছোটোবেলার বঞ্চনা তাকে যেন বুঝিয়ে দিয়েছিল, সন্মান নিয়ে নিজের পায়ে দাঁড়াতে তাকে হবেই। সেই বঞ্চনাই যেন জীবনযুদ্ধে লড়াই করার প্রেরণা জুগিয়েছিল তাকে। জেদ আর অধ্যবসায় সঙ্গী করে আজ সাধনা একটি বেসরকারি পর্যটন সংস্থার দায়িত্ববান কর্মী।

কিন্তু লড়াই কি এত সহজে শেষ হয়? নিয়ম অনু্যায়ী ১৮ বছরের পর আর কাউকে হোমে রাখা যায় না। তাই এর পর প্রয়োজন ছিল নিজের ‘বাড়ি’র। এই নিয়ে চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলেন হোম কর্তৃপক্ষও। এরপর কোথায় ‘ঠিকানা’ হবে তার/ 

কিন্তু যে লড়াই করতে জানে, তার সহায় হন বোধহয় স্বয়ং ঈশ্বরও। হোমের মেয়েদের মাশরুম চাষের প্রশিক্ষণ দিতে আসতেন ধাপগঞ্জের বাসিন্দা মন্টু রায়। সিধেসাধা ছেলেটিকে মনে ধরে দীপশ্রী দেবীর। তিনিই মন্টুকে সাধনার সঙ্গে বিয়ের প্রস্তাব দেন। অতি-চেনা লড়াকু মেয়েটিকে জীবনসঙ্গিনী করতে এক কথায় রাজি হয়ে যান মন্টু। অমত ছিল না সাধনারও।

ব্যাস আর কি, হইহই করে শুরু হয়ে যায় বিয়ের প্রস্তুতি। 

কিন্তু ফের বাধা, খরচ জোগাবে কে? মেয়ের বিয়ে বলে কথা। অনেক খরচ। কিন্তু চলতে চাইলে পথের অভাব হয় না। সাহায্যের হাত এগিয়ে এল। ব্যবসায়ী সমিতি থেকে শুরু করে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, পরিচিত শহরবাসী — সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলেন অনেকেই। নিজের উপার্জন থেকেও কিছু জমিয়েছিল সাধনা, তা দিয়ে কেনা হয়েছে বিয়ের গয়নাও। নিজেদের হাতে নিমন্ত্রিতদের জন্য কার্ড তৈরি করল সাধনার ‘হোমের’ বোনেরা।

সব ভাল তার, শেষ ভালো যার। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় শুভলগ্নে চার হাত এক হয়ে গেল সাধনা-মন্টু’র। পূর্ণতা পেল একটা ‘বিচ্ছিন্ন’ জীবন। বিয়েতে এসেছিলেন বহু মানুষ। সরকারি আধিকারিক থেকে শুরু করে বিশিষ্টজনেরা। তাঁদের কাছ থেকে  আশীর্বাদ-শুভেচ্ছা পেয়ে ঝলমল করে উঠল বধূবেশী সাধনা।

তবু এত আনন্দের মাঝেও যেন বিষাদের সুর হোমে। বাড়ি ছেড়ে শ্বশুরবাড়ি চলে যাচ্ছে মেয়ে। মাতৃস্নেহে আগলে রাখা দীপশ্রী কাকিমা, ডালিয়া দিদির চোখে জল যে আসবেই। চোখ ভেজা এত দিনের খেলার সাথী ফরিদা, অনুশ্রীদেরও। সবাইকে ছেড়ে সাধনাও চোখে জল নিয়েই পাড়ি দিল তার নিজের সংসারে, তার আপন পরিবারে।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here