খবর অনলাইন : শুভবুদ্ধির উদয় হচ্ছে। ধীরে ধীরে সত্য প্রকাশের পথে যাচ্ছে অস্ট্রেলিয়া। তাই এ বার তা সংশোধনের চেষ্টাও শুরু হয়েছে। তার প্রাথমিক পদক্ষেপ হল নিউ সাউথ ওয়েলস বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্দেশিকা। তাদের ‘ইন্ডিজিনাস টারমনোলজি গাইড’ শিক্ষক ও ছাত্রছাত্রীদের ‘সেটেল্‌ড্‌’ বা ‘ডিসকভার্ড’-এর বদলে ‘ইনভেডেড’ শব্দটা ব্যবহার করতে বলেছে। অর্থাৎ স্বীকার করা হচ্ছে ব্রিটিশরা অস্ট্রেলিয়া ‘আবিষ্কার’ করেনি, বা সেখানে গিয়ে ‘বসতি স্থাপনও করেনি’, স্রেফ অস্ট্রেলিয়া ‘আক্রমণ করেছিল’। এখানেই শেষ নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্দেশিকায় আদি বাসিন্দাদের ‘অ্যাবোরিজিনস’ বা ‘আদিম অধিবাসী’ না বলে ‘ইন্ডিজিনাস অস্ট্রেলিয়ান পিপল্‌’ বা ‘দেশজ অস্ট্রেলীয় মানুষ’ বলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

নির্দেশিকায় ব্যাখ্যা করে বলা হয়েছে, ক্যাপ্টেন জেমস কুক অস্ট্রেলিয়া ‘আবিষ্কার’ করেছিলেন, এ কথা বলা ‘আপত্তিকর’। ‘বসতি’ বললে দেশজ মানুষদের জমি যে ‘চুরি’ করা হয়েছিল সেই ব্যাপারটি অগ্রাহ্য করা হয়। নির্দেশিকায় পরিষ্কার বলা হয়েছে, “অস্ট্রেলিয়ায় শান্তিপূর্ণ ভাবে বসতি স্থাপন করা হয়নি, সে দেশ আক্রমণ করা হয়েছিল, দখল করা হয়েছিল এবং উপনিবেশ স্থাপন করা হয়েছিল। ইউরোপীয়দের আগমনকে যদি ‘বসতি স্থাপন’ হিসাবে বর্ণনা করা হয়, তবে তা হল অস্ট্রেলিয়ার ইতিহাসকে ইংল্যান্ডের তট থেকে দেখার চেষ্টা, অস্ট্রেলিয়ার তট থেকে নয়।” নির্দেশিকা বলেছে, অস্ট্রেলিয়ার ইতিহাসকে এখন দু’ ভাগে ভাগ করা উচিত –- ‘প্রি-ইনভেশন’ ও ‘পোস্ট-ইনভেশন’। অর্থাৎ অস্ট্রেলিয়া আক্রমণের আগের পর্বের ইতিহাস ও পরের পর্বের ইতিহাস। ‘নোম্যাডিক’ বা ‘যাযাবর’ শব্দটি ব্যবহার করা নিয়ে নির্দেশিকায় নিরুৎসাহ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, এই শব্দটি ব্যবহার করলে মনে হয়, দেশজ অস্ট্রেলিয়ানরা স্থায়ী ভাবে বসবাস করত না। আসলে ইংরেজ ঔপনিবেশিকরা অস্ট্রেলিয়াতে তাদের দখলদারির ন্যায্যতা প্রমাণ করতে এই শব্দ ব্যবহার করত।

নিউ সাউথ ওয়েলস বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্দেশিকায় দেশ জুড়ে তুমুল বিতর্কের ঝড় উঠেছে।

ইতিহাসবিদ কিথ উইন্ডস্কাটল্‌ ‘আক্রমণ’ শব্দটা মেনে নিতে পারছেন না। তিনি অবশ্য এ প্রসঙ্গে আন্তর্জাতিক আইনের উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, “এখানে এবং সারা বিশ্ব জুড়েই আন্তর্জাতিক আইনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ রায়ে অস্ট্রেলিয়াকে সব সময়েই ‘বসতি স্থাপিত’ দেশ হিসাবে গণ্য করা হয়েছে।”

ও দিকে কুইন্সল্যান্ড রাজ্যের প্রধানমন্ত্রী আনাস্তাসিয়া পালাসৎজুক মনে করেন, এত দিনে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলি ‘সত্যি’ শেখাতে শুরু করেছে। তিনি বলেন, “অস্ট্রেলিয়ায় কী ভাবে বসতি স্থাপন করা হয়েছিল সে সম্পর্কে সত্যিটা দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো এত বছর বলেনি। অসংখ্য দেশজ মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন, তাঁদের খুন করা হয়েছিল। সত্যিটা তো এক দিন বলতেই হবে”।

তার মানে কি অস্ট্রেলিয়া আক্রমণ করা হয়েছিল ? সাংবাদিকদের এই প্রশ্নের উত্তরে কুইন্সল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ইতিবাচক উত্তর দেন।

অস্ট্রেলিয়ার ট্যাবলয়েড কাগজ ‘ডেলি টেলিগ্রাফ’-এর অভিযোগ, নিউ সাউথ ওয়েলস বিশ্ববিদ্যালয় পাঠক্রম ‘চুনকাম’ করে ফেলছে। বিশ্ববিদ্যালয় অবশ্য এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

ইতিমধ্যে কুইন্সল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের তরফে বলা হয়েছে, ক্যাপ্টেন কুক অস্ট্রেলিয়া ‘আক্রমণ করেছিলেন’ বা অস্ট্রেলিয়ায় ‘বসতি স্থাপন করেছিলেন’, এ কথা এখানে শেখানো হয় না। এক বিবৃতিতে অধ্যাপক জন উইলিস বলেন, “ক্যাপ্টেন কুক ছিলেন নাবিক ও অভিযাত্রী। তিনি অস্ট্রেলিয়া ‘আবিষ্কার করেছিলেন’ বলে ইংরেজ জনমানসে যে ধারণা আছে, তা যে ভুল সেটাই আমরা শেখাই। এর বহু আগেই অন্য ইউরোপীয় অভিযাত্রীরা এখানে এসেছিলেন। তাঁদের তুলনায় ক্যাপ্টেন কুক বিলম্বে এসেছেন। অতীতের এবং এখনকার বহু দেশজ মানুষ শ্বেতাঙ্গদের বসতি স্থাপনকে ‘আক্রমণ’ বলে মনে করেন।”

যদিও অধ্যাপক উইলিস বলেছেন, নিউ সাউথ ওয়েলস বিশ্ববিদ্যালয়ের টারমনোলজি গাইড নিয়ে তাঁদের বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকারি ভাবে কোনও বক্তব্য নেই, তবু তাঁর বক্তব্যেই প্রমাণ যে নিউ সাউথ ওয়েলস বিশ্ববিদ্যালয়ের বক্তব্যের সঙ্গে কুইন্সল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বক্তব্যে খুব একটা ফারাক নেই। ফারাক এইটুকুই যে তাদের কোনও লিখিত নির্দেশিকা নেই।

ন্যাশনাল কংগ্রেস অব অস্ট্রেলিয়া’স ফার্স্ট পিপলস্‌-এর দুই প্রধান রড লিটল্‌ ও জ্যাকি হাগিন্স বলেন, “এই ইস্যুটা নিয়ে নিউ সাউথ ওয়েলস বিশ্ববিদ্যালয় যে অগ্রণী হয়েছে, সেই ব্যাপারটা আমাদের গভীর ভাবে নাড়া দিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে ওই সব প্রাচীন ভাষার ব্যবহারে আমাদের দমবন্ধ হয়ে আসছিল। আমাদের তরুণ প্রজন্মকে কাজে নিয়োজিত করতে হলে এবং আমাদের দেশকে আরও বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ, সংগতিপূর্ণ হতে হলে আধুনিকীকরণই একমাত্র চাবিকাঠি। আমরা যদি আমাদের ইতিহাসের লজ্জাজনক দিকটার কথা না বলি বা তা নিয়ে যদি আলোচনা না করি, তা হলে অতীতের ঘটনার যে আর পুনরাবৃত্তি হবে না, সেই ব্যাপারটা আমরা কী ভাবে সুনিশ্চিত করব ?”

উল্লেখ্য, ১৭৭০ সালে অস্ট্রেলিয়ার দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলে পৌঁছে ব্রিটিশ রাজার তরফে সেই অঞ্চলের দখল নেন ক্যাপ্টেন জেমস কুক। অবশ্য এর ১৬৪ বছর আগেই সেখানে পৌঁছে গেছিল ওলন্দাজরা। কুক আসার পরেই অস্ট্রেলিয়ায় উপনিবেশ স্থাপনের কাজ শুরু হয়। দেশজ মানুষদের জমি কেড়ে নেওয়া হয়, তাদের অনেকেরই প্রাণ যায়। ক্রমে ক্রমে তারা জমি, নাগরিকত্ব, সমান মর্যাদার অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়। শেষ পর্যন্ত এই সব অধিকারের কিছু কিছু তারা সাম্প্রতিক দশকগুলিতে ফিরে পেতে শুরু করেছে।

অস্ট্রেলিয়ার এই উদ্যোগের ফলে ভারতের শিক্ষামহলেও প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে, আমরাও কেন শুধু সাহেবদের শেখানো ইতিহাস আওড়ে যাব। এর পরেও আমাদের ছেলেপুলেরা ইতিহাস বইয়ে কেন পড়বে, ক্যাপ্টেন জেমস কুক অস্ট্রেলিয়া আবিষ্কার করেছিলেন, কলম্বাস আমেরিকা আবিষ্কার করেছিলেন ইত্যাদি। সময় এসেছে তাদেরও প্রকৃত ইতিহাস জানানোর। এই দেশ ‘আবিষ্কার’ আদতে ‘আবিষ্কার’ নয়, ‘আক্রমণ’।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here