বাঙালির হৃদয়ে রক্তক্ষরণ, করোনাবিধি মেনে ভাষাশহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন

0

ঋদি হক: ঢাকা

রাত ১২টা বাজার মিনিট খানেক পরেই ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ভাষাশহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো শুরু হল। বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের পক্ষে তাঁর সামরিক সচিব মেজর জেনারেল সালাউদ্দিন ইসলাম ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষ থেকে তাঁর সামরিক সচিব মেজর জেনারেল নকিব আহমদ চৌধুরী কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। সেই সময় নেপথ্যে পরিবেশিত হচ্ছে সেই কালজয়ী গান, “আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি আমি কি ভুলিতে পারি?”

Loading videos...

কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর প্রতিনিধিরা কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থেকে ভাষাশহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এর পর অন্যান্য বিশিষ্টজন একে একে এসে শ্রদ্ধা নিবেদন করে যান।   

এ বারের ২১ ফেব্রুয়ারির ছবিটা একটু আলাদা। কারণ কোভিড ১৯। আমজনতার পা পড়বে না কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। হৃদয়ে রক্তক্ষরণ নিয়ে একটা বিশাল অংশের মানুষকে ঘরে বসেই সময় কাটাতে হবে।  

বরাবরের মতো এ বারে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ও একুশে ফেব্রুয়ারিতে ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে দল বেঁধে যাতায়ত বন্ধ। করোনা পরিস্থিতিতে মানুষের ভিড় এড়াতে সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এক সঙ্গে সর্বোচ্চ পাঁচ জন এবং ব্যক্তিবিশেষের ক্ষেত্রে এক সঙ্গে দু’ জন কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের বেদিতে ফুল দিতে পারছেন। এর বেশি প্রবেশে বাধা। পুলিশের তরফে নির্দেশনা মোতাবেক এ বছর অমর একুশের প্রথম প্রহর থেকে এ ভাবেই ফুল দেওয়া চলছে। আর বলাই বাহুল্য মাস্ক পরা ও শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা বাধ্যতামূলক। শনিবার শহীদ মিনার এলাকা ও আশপাশের সড়কে যানচলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়।

শহীদবেদি ফুলে ফুলে ছয়লাপ

এই করোনার কারণেই এ বার রাষ্ট্রপতি এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শহীদবেদিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করতে সশরীরে হাজির হননি। তাঁদের প্রতিনিধিরা শহীদবেদিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানোর পরেই সরকার, সেনাবাহিনী, রাজনৈতিক দল, বিভিন্ন দেশের দূত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান-সহ বিভিন্ন সংগঠনের তরফে ভাষাশহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন। এঁদের মধ্যে ছিলেন বাংলাদেশের তিন বাহিনীর প্রধানরা, জাতীয় সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীর প্রতিনিধি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান, বিদেশমন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেন, পুলিশের আইজিপি, সংসদে বিরোধী দলের উপনেতা জি এম কাদের, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মো. আখতারুজ্জামান, ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র, বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকরা, আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ প্রমুখ। শহীদ মিনারের বেদিতে ফুল উপচে পড়ে।  

বাঙালির মাতৃভাষা বাংলাকে বাদ দিয়ে উর্দুকে রাষ্ট্রীয় ভাষা করার হীন চক্রান্ত শুরু করে তৎকালীন শাসক। এর প্রতিবাদে গর্জে ওঠে পূর্ববঙ্গের মানুষ। সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের ব্যানারে ১৯৫২ সালে আন্দোলন তীব্র হয়। সেই আন্দোলনে সর্ব স্তরের মানুষের অংশগ্রহণ যেমন ছিল, তেমনি রক্ত ও প্রাণ দিতে হয়েছে অনেককে। প্রতি বারের মতো এ বারের একুশে ফেব্রুয়ারিতেও ভাষাশহীদদের শ্রদ্ধা জানাতে সব রকম প্রস্তুতিই সম্পন্ন হয়েছে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার। তবে বিশ্বব্যাপী করোনা সংক্রমণের কারণে স্বাস্থ্যবিধি মেনে সব কার্যক্রম পালন করা হচ্ছে।

শহীদ মিনারে বিস্তৃত ব্যবস্থা

শনিবার বিকেল নাগাদ শহীদ মিনার এলাকা ঘুরে দেখা গেল আলপনা আঁকার কাজ শেষ। শহীদ মিনারের তিন দিকে তিনটি ফায়ারসার্ভিসের গাড়ি। সব রকম নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। বরাবরের মতো শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য বেষ্টনী দেওয়া হয়েছে। র‌্যাব ও ডিএমপির তরফে বসানো হয়েছে ওয়াচটাওয়ার। যে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সতর্ক রয়েছে। গোটা এলাকা সিসিটিভির আওতায়। সাধারণকে সতর্ক করতে লাগানো হয়েছে ডিজিটাল সাইনবোর্ড। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের ডান পাশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজী মোতাহার হোসেন ভবন সংলগ্ন মাঠে র‌্যাব, ডিএমপি ও ফায়ার সার্ভিসের কন্ট্রোল রুম বসানো হয়েছে।

কয়েক দিন ধরেই রাজধানী ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের তিন দিকের রাস্তায় আলপনা ও দেওয়াল লিখনের কাজে ব্যস্ত সময় পার করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের শিক্ষার্থীরা। যে কোনো আন্দোলন, পয়লা বৈশাখের মঙ্গল শোভাযাত্রার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে চারুকলার নাম। যে কোনো শুভ কাজের সঙ্গী তাঁরা। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের দক্ষিণ পাশের জরুরি বিভাগের পাশের রাস্তায় বেরোতেই ঘাতক পাকিস্তানি সেনাদের রাইফেল গর্জে ওঠেছিল। সে সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে প্রাণ হারান সালাম, বরকত, রফিক, জাব্বাররা।

ভাষার জন্য রাজপথে প্রাণ দেওয়ার ইতিহাস পৃথিবীর আর কোনো দেশে রয়েছে বলে জানা নেই। বাংলাদেশে ভাষার আবেগ ও দরদ এতটুকু কমেনি বরং বেড়েছে। এখানে ফেব্রুয়ারি মাস জুড়ে চলা অমর ২১শে বইমেলা বিশ্বে উদাহরণ সৃষ্টি করেছে। একুশে ফেব্রুয়ারি এখন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। বিশ্বের নানা প্রান্তে ভাষাদিবস পালিত হয়ে আসছে। করোনার মধ্যেও মানুষের উৎসাহে তেমন একটা ভাটা পড়েছে বলে মনে হচ্ছে না। তবে ফি বারের মতো সেই কোলাহল নেই।

মূল বেদীর ঠিক বিপরীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের আবাসিক ভবনের দেওয়ালে লাল রং-এ লেখা হয়েছে ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি আমি কি ভুলিতে পারি’। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, কাজী নজরুল ইসলাম, সুকান্ত ভট্টাচার্য, শামসুর রহমান, আবুল ফজল, ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত, জসীম উদ্দীন, আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ, মুনীর চৌধুরী, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জীবনানন্দ দাস, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, আবুল মনসুর আহমদ, মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, অতুলপ্রসাদ সেন, মাইকেল মধুসূদন দত্ত-সহ বিখ্যাত মনীষীদের ভাষা নিয়ে বিভিন্ন উক্তি।

সাভার থেকে স্ত্রীকে এসেছেন মুমিনুল। একটি রফতানি কারখানায় কাজ করেন। জানালেন, এই প্রথম এসেছেন। রবিবার ভিড় বেশি থাকবে। তাই শনিবারই এসেছেন। ঢাকার জুড়াইন থেকে এসেছেন সন্ধ্যা। সঙ্গে মা-ও রয়েছেন। কলেজ পড়ুয়া সন্ধ্যা ভাষা দিবস নিয়ে বেশ গর্বিত।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.