বঙ্গবন্ধুর সম্মানরক্ষার প্রশ্নে ৩০ বছর পর বিচারক, আমলা, পুলিশ, জনতা এক মঞ্চে

0

ঋদি হক: ঢাকা

স্বৈরাচার-বিরোধী গণআন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল দেশের সর্ব স্তরের মানুষ। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে ১৯৯০ সালের গণআন্দোলনই বাংলাদেশের (Bangladesh) ইতিহাসে দ্বিতীয় বৃহত্তম ঘটনা, যেখানে শামিল হয়েছিলেন বিচারক, আমলা ও আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। সে দিন তাঁরা আন্দোলনের সমর্থনে কর্মস্থল ত্যাগ করে রাজপথে নেমে এসে যোগ দিয়েছিলেন রাজধানীর ‘জনতার মঞ্চে’।

৩০ বছর পর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু (Bangabandhu) শেখ মুজিবুর রহমানের (Sheikh Mujibur Rahman) ভাস্কর্য ভাঙচুর করে মৌলবাদ যে আঘাত হেনেছে, তার প্রতিবাদে এবং বঙ্গবন্ধুর সম্মানরক্ষায় ফের এক মঞ্চে শামিল হলেন বিচারক, আমলা, সরকারি কর্মচারী, পুলিশ এবং সর্ব স্তরের মানুষ। তাঁরা সম্মিলিত ভাবে জাতির পিতার সম্মান রাখতে চান। কতিপয় ধর্মীয় সংগঠন ও ফতোয়াবাজদের কাছে মানুষের বিবেক পরাজিত হবে, তা হতে পারে না।

জাতি যখন মুজিববর্ষ এবং স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তির জমকালো আয়োজনে ব্যস্ত, ঠিক সেই সময়ে হঠাৎ মাঠে নেমে ধর্মীয় একটি গোষ্ঠী জাতির পিতার ভাস্কর্য ভাঙচুর ও উপড়ে ফেলার হুংকার দিচ্ছে! স্বাধীনতার এত বছর পরে মৌলবাদের ফের উত্থানের বিরুদ্ধে সর্ব স্তরের মানুষ যে সজাগ, তারই প্রতিফলন ঘটল বিচরক ও আমলা-সহ সাধারণের এককাট্টা প্রতিবাদে।

হেফাজতের ফতোয়া

হেফাজত-সহ কয়েকটি ধর্মীয় সংগঠন ফতোয়া দিচ্ছে ইসলামে মূর্তি হারাম। ঢাকার ধোলাইখাল এলাকায় বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য গড়া হলে তা উপড়ে বুড়িগঙ্গায় ফেলে দেওয়ার প্রকাশ্য হুমকি দিয়েছে। ঢাকার একাধিক স্থানে এমন হুমকির পর কুষ্টিয়ায় বঙ্গবন্ধুর নির্মীয়মাণ ভাস্কর্য ভাঙচুর করা হয়। এই ভাঙচুরের ঘটনায় যোগ দিয়েছিলেন মাদ্রাসার দুই শিক্ষক এবং তাঁদের দুই ছাত্র। পুলিশ তাঁদের গ্রেফতার করেছে। দুই শিক্ষক আদালতে দোষ কবুল করে জবাববন্দিও দিয়েছেন।

ক্ষমতাসীন আওয়ামি লিগের সাধারণ সম্পাদক তথা সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের অভিযোগ করেছেন, বিএনপির আশকারা পেয়েই ধর্মীয় উগ্রবাদীরা ভাস্কর্য ভাঙচুরে নেমেছে।

বিএনপির তরফে এই অভিযোগ খণ্ডন করে বলা হয়েছে, ভাস্কর্য ভাঙচুর ঘটনায় তাঁদের দলের কোনো উৎসাহ নেই। কারণ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানেরও ভাস্কর্য রয়েছে।

চট্টগ্রামে প্রতিবাদে বিচারকরাও

বঙ্গবন্ধুর মর্যাদা এবং ভাস্কর্যরক্ষার প্রশ্নে দেশব্যাপী এক হয়ে মাঠে নেমেছে দেশের বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার মানুষ।

ভাঙচুরের ঘটনার প্রতিবাদ জানাতে বিচারক, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা শনিবার দেশ জুড়ে মানববন্ধন ও সমাবেশের আয়োজন করেন। এ দিন চট্টগ্রাম-সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে শত শত বিচারক রাজপথে নেমে আসেন। সকল স্তরের মানুষ এবং সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীগণও এতে যোগ দেন। পুলিশও যোগ দেয় মানববন্ধন ও সমাবেশে।

চট্টগ্রামের দায়রা জজ ইসমাইল হোসেন বলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য ভাঙার প্রতিবাদে সারা দেশ বিক্ষুব্ধ। বিচারকরাও তার অংশ। বিচারকরা বিচারের পাশাপাশি প্রতিবাদও জানাবেন।

দায়রা জজ আরও বলেন, “বিচারকরা বলছেন, জাতির জনকের ভাস্কর্য ভাঙার ঘটনা তাঁদের নাড়া দিয়েছে। যে ঔদ্ধত্য ও ধৃষ্টতা এই মৌলবাদী গোষ্ঠী দেখিয়েছে, তাতে আমাদের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়েছে। কারণ বিচারক হলেও আমরা মানুষ। সে জন্য তাঁরা প্রতিবাদে শামিল হয়েছেন।”

সমাবেশে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটান পুলিশের কমিশনার, চট্টগ্রাম রেঞ্জ পুলিশের ডিআইজি-সহ পুলিশ ও প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং সাধারণ মানুষ যোগ দেন।

প্রতিবাদে শামিল মুখ্যসচিব, আইজিপি

ঢাকায় ওসমানী মিলনায়তনে ‘জাতির পিতার সম্মান রাখব মোরা’ স্লোগানকে সামনে রেখে প্রতিবাদ-সমাবেশের আয়োজন করা হয়। সরকারি কর্মকর্তা ফোরাম আয়োজিত সমাবেশে যোগ দিয়ে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্যসচিব ড. আহমদ কায়কাউস বলেন, তাঁরা ২৯টি ক্যাডার সার্ভিসের সবাই অঙ্গীকার করছেন জাতির পিতার অসম্মান হতে দেবেন না।

পুলিশের আইজিপি ড. বেনজীর আহমেদ বলেন, সংবিধান ও রাষ্ট্রের ওপর আঘাত কঠোর ভাবে প্রতিহত করা হবে। বঙ্গবন্ধু ও দেশের বিরুদ্ধে অপচেষ্টাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করারও আহ্বান জানান পুলিশপ্রধান।

পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আনোয়ার হোসেন বলেন, যারা বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যে আঘাত হেনেছে এবং হুমকি দিচ্ছে তারা সবাই একাত্তরের ঘৃণ্য পরাজিত শক্তি। পঁচাত্তরের পরে তাদের ভূমিকা কী ছিল তা আমরা জানি। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর প্রাক্কালে এবং বিজয়ের মাসে যারা জাতির পিতার ভাস্কর্যে আঘাত হেনেছে, তাদের পুলিশ-সহ প্রজাতন্ত্রের সকল কর্মচারী সম্মিলিত ভাবে প্রতিহত করবে।

ঢাকায় ব্যবসায়ীদের প্রতিবাদ।

প্রতিবাদ ব্যবসায়ীদেরও

প্রতিবাদ জানাতে ব্যবসায়ীমহলও পিছিয়ে নেই। তাদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই (FBCCI) ঢাকায় মানববন্ধন ও সমাবেশের আয়োজন করে। ঢাকার মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকায় শাপলা চত্বরে মানববন্ধনের আয়োজন করে এফবিসিসিআই। সেখানে অনলাইনে যুক্ত হন দেশের ৬৪ জেলার ব্যবসায়ী নেতারা।

এ ছাড়াও দেশব্যাপী নানা সংগঠন প্রতিবাদ সমাবেশ, মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছেন।

স্বাধীন বাংলার মাটিতে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর অবমূল্যায়ন কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না সাধারণ মানুষ। তাই প্রতিবাদমুখর হয়ে মৌলবাদের বিরুদ্ধে মাঠে নেমেছেন বিচারক, আমলা, ব্যবসায়ী, চিকিৎসক-সহ সর্বস্তরের মানুষ। তাঁরা রুখে দিতে চান অপশক্তিকে। যারা দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে ধারাবাহিক উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করতে চায়, সেই মৌলবাদের বীজ উপড়ে ফেলতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তাঁরা।

আরও পড়ুন: সোহরাওয়ার্দীতে উদ্যানে স্বাধীনতা-স্তম্ভের কাজ চলছে জোরকদমে, গড়া হবে মুজিব-ইন্দিরা মঞ্চ, আত্মসমর্পণ-চিত্র

খবরের সব আপডেট পড়ুন খবর অনলাইনে। লাইক করুন আমাদের ফেসবুক পেজ। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল

বিজ্ঞাপন