erfan salim

ঋদি হক: ঢাকা

তিনি শুধুমাত্র ক্ষমতাসীন দলের এক বিধায়কের ছেলেই নন, তাঁর শ্বশুরও একজন বিধায়ক। নিজেও ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (Dhaka South City Corporation) ৩০ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর। তিনি শিল্পপতি ও ঢাকা-৭ আসনের বিধায়ক হাজী সেলিমের পুত্র। ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থানের কারণে ধরাকে সরা জ্ঞান করতেন। তাঁর বাবা হাজী সেলিমের বিরুদ্ধেও এমনই এন্তার অভিযোগ রয়েছে বলে জানালেন এলাকার অনেকেই।

Loading videos...

জানা গিয়েছে, দুটি হিংস্র কুকুর এবং ডজনখানেক বডিগার্ড নিয়ে মদ্যপ অবস্থায় গাড়িতে ঢাকা চষে বেড়াতেন বিধায়ক-পুত্র ইরফান। রবিবার ধানমন্ডির কলাবাগান ক্রসিংয়ে নৌবাহিনীর লেফটেন্যান্ট মো. ওয়াসিফ আহমেদ খানের মোটরবাইককে পেছন থেকে ধাক্কা দেয় তাঁর গাড়ি। বাইকে নৌ-আধিকারিকের স্ত্রীও ছিলেন।

কোনো রকমে ধাক্কা সামলে বাইক রেখে ইরফানের গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করেন ওই নৌ-আধিকারিক। গাড়ি থেকে নেমে আসেন ইরফান ও তাঁর দেহরক্ষী জাহিদ এবং চালক মিজান। তাঁরা নৌ-নৌ-আধিকারিককে বেধড়ক মারধর করেন। এতে তাঁর দুটো দাঁত ভেঙে গিয়েছে বলে জানান ওই নৌ-আধিকারিক।

থানায় মামলা 

রবিবার রাতের ঘটনার পর সোমবার ধানমন্ডি থানায় অভিযোগ দায়ের করেন ওই নৌ-আধিকারিক। তাতে ইরফান সেলিম ছাড়াও হাজী সেলিমের প্রোটোকল অফিসার এবি সিদ্দিক দিপু, ইরফানের দেহরক্ষী জাহিদ ও গাড়িচালক মিজানুর রহমান-সহ ৫/৬ জনকে অভিযুক্ত করা হয়। বেআইনি ভাবে পথরোধ করে সরকারি কর্মকর্তাকে মারধর, জখম ও প্রাণনাশের হুমকির অভিযোগ আনেন নৌবাহিনীর লেফটেন্যান্ট মো. ওয়াসিফ আহমেদ খান।

ইরফানের টর্চার সেল থেকে উদ্ধার হওয়া সরঞ্জাম।

অভিযোগে নৌ-আধিকারিক বলেন, সংসদ সদস্যের স্টিকার লাগানো একটি কালো রঙের ল্যান্ডরোভার গাড়ি (ঢাকা মেট্রো-ঘ-১১-৫৭৩৬) পেছন থেকে তাঁর মোটরবাইককে ধাক্কা দেয়। তিনি ও তাঁর স্ত্রী ধাক্কা সামলে মোটরসাইকেল থেকে নামার সঙ্গে সঙ্গে ওই গাড়ি থেকে জাহিদ, দিপু এবং অজ্ঞাতপরিচয় আরও দুই-তিন জন অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ করতে করতে নেমে আসে এবং ‘মারধর’ শুরু করে। তারা লেফটেন্যান্ট ওয়াসিফ ও তাঁর স্ত্রীকে ‘উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া এবং হত্যার’ হুমকি দেয় বলেও মামলায় অভিযোগ আনা হয়েছে। তাঁর স্ত্রীর গায়েও হাত দেওয়া হয়েছে অভিযোগ করেছেন ওই নৌ-আধিকারিক। মামলা হওয়ার পর পরই গাড়ির চালক মিজানুর রহমানকে গ্রেফতার করে পুলিশ।

ইরফানের বাসা ঘিরে ফেলে র‌্যাব

সোমবার ধানমন্ডি থানায় মামলা দায়ের হওয়ার পর দুপুরেই ইরফানদের বাসা ঘিরে ফেলে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যটালিয়ান (র‌্যাব)। বাড়িতে অভিযান চালায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিপুল সংখ্যক সদস্য। এই ঘটনা যেন হিন্দই সিনেমাকেও হার মানায়। পুরাতন ঢাকার চকবাজার দেবীদাসঘাট এলাকার বহুতল ভবনটি ঘিরে অভিযান চালানোর সময় এলাকার হাজারো মানুষ তা প্রত্যক্ষ করেন।

র‌্যাব জানিয়েছে, ভবনটির ছাদের একটি কক্ষ থেকে হাতকড়া, হকিস্টিক, ইলেকট্রিক শক দেওয়ার যন্ত্র, ছোরা-সহ বেশ কিছু জিনিস উদ্ধার করা হয়েছে। র‌্যাব জানায় কক্ষটিকে ‘নির্যাতন কেন্দ্র’ হিসেবে ব্যবহার করতেন  ইরফান।

ন’ তলা ভবনের তৃতীয় ও চতুর্থ তলা মিলিয়ে থাকতেন ইরফান। এখান থেকে লাইসেন্সহীন দুটি বিদেশি পিস্তল, এক রাউন্ড গুলি, একটি এয়ারগান, ৩৭টি ওয়াকিটকি, একটি হাতকড়া এবং বিদেশি মদ ও বিয়ার বোতল উদ্ধারের কথা জানিয়েছেন র‌্যাব কর্মকর্তারা। দুপুর থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত এই অভিযান চলে। রাত সোয়া ৮টা নাগাদ ইরফান ও জাহিদকে নামিয়ে আনেন র‌্যাব সদস্যরা।

র‍্যাবের কর্মকর্তা সাংবাদিকদের ব্রিফ করছেন।

ইরফান ও বডিগার্ডের এক বছরের জেল

ইরফান ও তার দেহরক্ষী জাহিদকে গ্রেফতারের পর অবৈধ অস্ত্র রাখা, মদ্যপান ও ওয়াকিটকি ব্যবহারের অপরাধে এক বছর করে কারাদণ্ড দিয়েছে র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত। র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারওয়ার আলম জানিয়েছেন, ইরফান ও জাহিদকে র‌্যাব-৩-এর কার্যালয়ে নেওয়ার পর সেখান থেকে কেরানিগঞ্জ কারাগারে পাঠিয়ে দেওয়া হবে।

কে এই ইরফান সেলিম

আশির দশকে পুরাতন ঢাকার বুড়িগঙ্গার তীরে ওয়াইজঘাট নামক স্থানে সিমেন্টের ব্যবসা করতেন হাজী মো. সেলিম (Haji Mohammad Salim)। তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবসার আড়ালে নানা ফন্দিফিকির চালানোর অভিযোগটা পুরোনো। বলা যায় জিরো থেকে হিরো। সেই হাজী সেলিম ১৯৯১ সালে বিএনপি থেকে বিধায়কের টিকিট পেতে ব্যর্থ হয়ে আওয়ামি লিগ থেকে টিকিট বাগিয়ে নেন। নির্বাচনে জয়লাভও করেন।

তার পর হিন্দি সিনেমার গল্পের মতোই উত্থান হাজী সেলিমের। প্রভাব প্রতিপত্তি, বেপারোয়া চলাচল। মাঝে মাঝে নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়তেন। তখন কঠোর সাবধানবাণী পেতেন। তার পর কিছু দিনের জন্য ক্ষান্ত থাকতেন। তাঁরই ছেলে ইরফান সেলিম (Erfan Salim)। বাবার সুযোগ্য সন্তান। বাড়িতে অবৈধ ভাবে অস্ত্র, আধুনিক ওয়াকিটকির নেটওয়ার্ক, নির্যাতন কক্ষ থেকে শুরু করে কী নেই তাঁর। সব কিছুর পেছনেই ক্ষমতার দাপট।

ইরফানের কাউন্সিলার-পদ খারিজ

অবৈধ অস্ত্র ও ওয়াকিটকি ইত্যাদি-সহ গ্রেফতার এবং এক বছরের জেল হওয়ার পর ইরফান একজন অপরাধী। কোনো অপরাধী জনপ্রতিনিধি হিসেবে থাকতে পারেন না। ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের ৩০ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলার পদ থেকে মঙ্গলবার রাতে ইরফানকে সাময়িক বরখাস্তের আদেশ জারি করেছে স্থানীয় সরকার (সিটি কর্পোরেশন) প্রশাসন। দণ্ডিত হওয়ায় আইন অনুযায়ী এই পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানানো হয়েছে।

স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইনে বলা হয়েছে, কোনো জনপ্রতিনিধি সাজাপ্রাপ্ত হলে তিনি বরখাস্ত হবেন। স্থানীয় সরকারমন্ত্রী তাজুল ইসলাম আগেই সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, অভিযোগটি তাঁদের নথিভুক্ত হয়েছে। তা প্রসেস করা হচ্ছে। সম্ভবত আইন অনুযায়ী তাকে এ দিনই সাময়িক ভাবে বরখাস্ত করা হবে।

খবরঅনলাইনে আরও পড়ুন

দুর্গোৎসব বাংলাদেশে: সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.