jalpaiguri
titas pal
তিতাস পাল

জলপাইগুড়ি: কাটাঁতারের বেড়ার এ পারে দাঁড়িয়ে চোখের জল বাঁধ মানছিল না ফুলবাড়ির ইন্দ্রজিৎ রায়ের। ও পারে দাঁড়ানো বন্দনা সরকারের চোখেও জল। একটা বছর পার করে দেখা জ্যাঠতুতো দুই ভাই-বোনের। গোটা বছরটাই দু’জনে অপেক্ষা করেছিলেন এই “মিলন মেলা”র জন্য। শুধু এই দু’জনই নয় এ পার বাংলা-ও পার বাংলার কয়েক হাজার মানুষ অপেক্ষা করে থাকেন এই মিলন মেলার জন্য।

জলপাইগুড়ির জেলার রাজগঞ্জ ব্লক। এই এলাকার বিস্তীর্ণ সীমানা জুড়ে রয়েছে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত।য খন দেশ ভাগ হয় তখনও এখানে ছিল না কাঁটাতারের বেড়া। এ পারে-ও পার যাতায়াত চলত। বসত বিশাল মেলাও। দু’পারের মানুষই সেখানে আসতেন। কিন্তু কাঁটাতারের বেড়া যেন আপনকে পর করে দিল। দুই দেশের অতন্দ্র প্রহরীদের পেরিয়ে যাতায়াত করতে গেলে লাগবে পাসপোর্ট, ভিসা। তার জন্য দরকার সময়, দরকার টাকারও। তাই ইচ্ছে থাকলেও উপায় নেই।

দেশভাগের পর একই পরিবারে মানুষরা দুই দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে গেলেন। যেমন ইন্দ্রজিৎ-বন্দনা। জলপাইগুড়ির ফুলবাড়িতে একান্নবর্তী পরিবারের ছোট থেকে মানুষ দু’জনে।কিন্তু বন্দনার বিয়ে হয়েছে ও পার বাংলায়,পঞ্চগড় জেলায়।তাই ইচ্ছে থাকলেও দেখা হওয়ার উপায় নেই।

এই সমস্যাটা ভাবিয়েছিল স্থানীয় কয়েকজন শুভবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষকে। তাঁদের মধ্যে একজন রাজগঞ্জের বিধায়ক খগেশ্বর রায়।তাঁরাই উদ্যোগ নিয়ে প্রশাসনের সাথে কথা বলেন। তারপর দুই দেশের প্রশাসন ও সেনাবাহিনীর মধ্যে আলোচনা চলে।

২০০৯ সাল থেকে শুরু এই মিলন মেলার। যা এখনও হয়ে আসছে। কোনো বছর চৈত্র সংক্রান্তিতে বছরের শেষদিন তো কোনো বছর নববর্ষের দিনটিকে মেলার জন্য বেছে নেওয়া হয়। এ বার বছরের প্রথম দিনটিকেই ঠিক করা হয়েছিল মিলন মেলার জন্য।

jalpaiguri2

রবিবার সকাল দশটা বাজতেই জলপাইগুড়ির ভোলাপাড়া, খালপাড়া, সুখানি, গাডারা থেকে দলে দলে লোক আসতে থাকে। কারণ সময় মাত্র দু’টো পর্যন্ত। এই চার ঘন্টার মধ্যেই সারাবছরের জমে থাকা কথা আদানপ্রদান করতে হবে।দু’পারের ছেড়ে আসা আপনজনেরা, কে কেমন আছে তা জানতে হবে। আর শুধু কথাই তো নয়, উপহারও যে দেওয়া নেওয়া করতে হবে।

এ পার থেকে নানারকম ফল, চকোলেট যার যেমন সামর্থ্য নিয়ে আসেন আপনজনদের জন্য। আর ও পার থেকে আসে পদ্মার সুস্বাদু ইলিশ। আত্মীয়স্বজনের জন্য আনা বাঙালির প্রিয় এই মাছ শোভা পায় ও পার থেকে আসা মানুষদের হাতে। যেমন হামিদুর রহমান দু’টো বিঘৎখানেক সাইজের ইলিশ নিয়ে এসেছেন ভাগ্নে ইমিতিয়াজের জন্য। উপহার পেয়ে খুশি ভাগ্নেবউ আলিমাবেগমও।কিন্তু ধীরে ধীরে সময় ফুরিয়ে আসে।

এ বার ফিরে যাওয়ার পালা। কিন্তু যেতে কি আর মন চায়! তাও যেতে হয়।দু’হাত ভর্তি উপহার নিয়ে যেতে যেতেই পিছু ফিরে তাকানো। যদি একবার দেখা যায় দূরে চলে যাওয়া প্রিয়জনকে। এইভাবেই শেষ হয় মিলন মেলা। শুধু থেকে যায় কাঁটাতারের এ পারে-ও পারে অসংখ পায়ের ছাপ আর দুই-দেশের প্রহরীদের সতর্ক দৃষ্টি।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য দিন !
আপনার নাম লিখুন