ঋদি হক: ঢাকা

এই অঞ্চলের সব চেয়ে বড়ো সরস্বতী পূজার আয়োজন হয়ে থাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক জগন্নাথ হল মাঠে। দূরদুরান্ত থেকে ছুটে আসেন প্রাক্তনীরা। ঢাকা ও পাশ্ববর্তী এলাকার মানুষ তো আছেনই।

আর আসবেই না বা কেন বলুন? এখানে যে সরস্বতী মায়ের বন্দনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৭০টি বিভাগের পূজো হয়। প্রতিটি মণ্ডপে থাকে আলাদা আলাদা থিমের সরস্বতী প্রতিমা। পাশাপাশি  জগন্নাথ হলের স্থায়ী মণ্ডপ তো আছেই। সেটি নিয়ে মোটহ ৭১টি মণ্ডপ সেজে ওঠে গোটা মাঠের চারিদিকে।

ভোর থেকেই নানা বয়সের ভক্তদের পদচারণায় মুখরিত হয়ে ওঠে জগন্নাথ হল মাঠ। মাঠের পশ্চিম-উত্তর কোনা জুড়ে নানা দোকানপাট। মনে হয় যেন প্রায় মেলাই বসে গেল। তা ছাড়া গত বছর রেকর্ড গড়ে জগন্নাথ হল পুকুরের মধ্যিখানে চারুকলা শিক্ষার্থীরা ৪৫ ফুট উচ্চতার প্রতিমা গড়েছিলেন।

জগন্নাথ হলের এই পূজার আকর্ষণে এখানে ছুটে আসেন হাজারো প্রাক্তনী-সহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। ভারতের যে সব শিক্ষার্থী ঢাকায় লেখাপড়া করছেন, তাঁরাও ছুটে আসেন জগন্নাথ হল মাঠে। গোটা মাঠ জুড়ে সরস্বতী মায়ের আরাধনায় দৃষ্টি নন্দন আয়োজন। এমন মহাআয়োজন কী করে মিস করা যায়? চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। কিন্তু দুর্ভাগ্য এ বছর প্রাণঘাতী অতিমারি সকল আয়োজন কেড়ে নিয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ। ঐতিহ্যকে আটকে দিয়েছে কোভিড-১৯।

রেলওয়ে সর্বজনীন সরস্বতীপূজো

গত বছর সরস্বতী পুজো হয়েছিল ৩০ জানুয়ারি। তার মাসখানেক পেরোতেই বিশ্বমহামারি করোনার থাবায় সব লণ্ডভণ্ড হয়ে যায়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কপাট বন্ধ বছর জুড়ে। বুক চাপড়িয়েও কোনো ফল পেল না নিঃসঙ্গ মানুষ। এ অবস্থায় আগমন সরস্বতী মায়ের।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় এ বারে বাংলাদেশে পাড়ায় পাড়ায় ধুমধামের সঙ্গেই উদযাপিত হল সরস্বতীপূজা। সকালে ঢাকার শাহজাহানপুর রেলওয়ে সর্বজনীন পূজা মন্দিরে পৌঁছে মনে হয়েছিল, ভিড় তেমন একটা হবে না। মায়ের চরণ লাগোয়া স্থানে সাজানো বইয়ের স্তূপ। সরস্বতী মায়ের সামনে ডালায় ডালায় ভোগ সাজানো হচ্ছে। রেলের মহাপরিচালক-সহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা আসবেন। তাই মন্দির কমিটির কর্মকর্তাদের বাইরে গেটে অপেক্ষা করতে দেখা গেল। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মন্দিরের বিশাল চত্বর কানায় কানায় পূর্ণ।

দেখে অবাক হতেই হয় – করোনাকালে সচেতনতার সঙ্গে সব বয়সি মানুষের এমন ছন্দময় পদচারণা দেখে চোখের পলক না পড়ারই কথা। ছোট্ট মণিদের উৎসাহটা খুব। মুখে মাস্ক পরে মায়ের হাত ধরে মন্দিরে প্রবেশ করছে তারা। আজ যে তাদের হাতেখড়ির দিন। শঙ্খধ্বনির সঙ্গে ধূপকাঠির পবিত্রতার সুবাতাস বয়ে যায় মন্দির প্রাঙ্গণে। সব কিছু মিলিয়ে পঞ্চমী তিথিতে বিদ্যা ও জ্ঞানের দেবী সরস্বতীর পূজা সম্পন্ন করল বাংলাদেশের লাখো ভক্ত। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় পাড়ায় পাড়ায় মন্দিরগুলোয় পূজা ছিল জমজমাট।

আড়ম্বরপূর্ণ পূজামন্দির

রেলওয়ে সর্বজনীন মন্দির কমিটির পরিচালনায় মুনশিয়ানা রয়েছে বলতে হয়। এই পূজামন্দির সব বছরই থাকে আড়ম্বরপূর্ণ। আশপাশের পাড়া-মহল্লার হাজারো ভক্ত ছুটে আসেন এখানে। খোলামেলা জায়গা। ভক্তরা মায়ের মন্দিরে এসে প্রাণ খুলে  দু’দণ্ড শান্তিতে কাটান। অঞ্জলির কিছুটা আগেই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়ে মন্দিরপ্রাঙ্গণে এসে পৌঁছোন বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক (ডিজি) ধীরেন্দ্র নাথ মজুমদার (ডি এন মজুমদার)। মন্দির কমিটির তরফে সংবর্ধনা জানানো হয় তাঁদের।


রেলওয়ের মহাপরিচালক ডি এন মজুমদার

মহাপরিচালক ডি এন মজুমদারের অল্প কথায় বিশাল গভীরতা। বললেন, কে কোন ধর্মের সেটা বড়ো কথা নয়। একজন ভালো মানুষ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা এবং সমাজের মঙ্গল হয় এমন কাজ করতে হবে। তা হলেই একজন পরিপূর্ণ মানুষ হতে পারব আমরা।

মন্দির কমিটির সাধারণ সম্পাদক কালীকান্ত ঘোষের পরিচালনা ও সূচনা বক্তব্যের আগে উত্তরীয় এবং ক্রেস্ট দিয়ে সম্মান জানানো হয় বাংলাদেশ রেলওয়ের নবনিযুক্ত মহাপরিচালক ডি এন মজুমদার ও অপর অতিথিদের।

মন্দির কমিটির সভাপতি সাগরকৃষ্ণ চক্রবর্তী, ঢাকা বিভাগীয় রিজিওনাল ব্যবস্থাপক সাদেকুর রহমান, রেলওয়ের জেনারেল ম্যানেজার (পূর্ব) মো. জাহাঙ্গির হোসেন, গর্ভমেন্ট ইন্সপেক্টর অব বাংলাদেশ রেলওয়ে অসীম কুমার তালুকদার প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

সরস্বতী পূজা উপলক্ষ্যে দেশের হিন্দু ধর্মাবলম্বী সবাইকে আন্তরিক শুভেচ্ছা জানিয়ে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক বাণী দিয়েছেন। এ দিন সকালে ঢাকার শের-এ-বাংলা নগরে রাজধানী স্কুলপূজা মণ্ডপ পরিদর্শন করেন ভারতের হাইকমিশনার বিক্রম দোরাইস্বামী।

আরও পড়ুন: ‘মুক্তমনা’ অভিজিৎ রায় হত্যায় ৫ আসামির মৃত্যুদণ্ড, ১ জনের যাবজ্জীবন

খবরের সব আপডেট পড়ুন খবর অনলাইনে। লাইক করুন আমাদের ফেসবুক পেজ। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল

বিজ্ঞাপন