ঋদি হক: ঢাকা

পদ্মাসেতু (Padma Bridge) কর্তৃপক্ষ ২৭ নভেম্বর ৩৮তম স্প্যানটি বসানোর পরই জানিয়েছিলেন, বিজয় দিবসের আগেই যাতে বাকি তিনটি স্প্যান বসানো সম্পূর্ণ হয়, তার জন্য জোরকদমে এগিয়ে চলেছে কাজ। কথা রেখেছে পদ্মাসেতু কর্তৃপক্ষ। বিজয় দিবসের (Bijoy Dibosh) ছ’ দিন আগেই ১০ ডিসেম্বর শেষ হল পদ্মাসেতুর স্প্যান বসানোর কাজ।

২০১৪ সালের বিজয়ের মাসে অর্থাৎ ডিসেম্বরে শুরু হওয়া স্বপ্নের সেতু বাস্তব রূপ পেল মাত্র ৬ বছরের মাথায়, বিজয়ের মাস ডিসেম্বরেই। খরস্রোতা পদ্মায় বাঙালির স্বপ্নপূরণ পৃথিবীতে নজির গড়েছে। কারণ, প্রমত্তা পদ্মার তলদেশে পিলার বসানোর কাজ ছিল অন্যতম বড়ো চ্যালেঞ্জ। পদ্মাসেতুর দুয়ার খুলে দেওয়া হবে ২০২২ সালে।

পদ্মাসেতু চালু হলে আন্তর্জাতিক যোগাযোগ সহজ হবে। কলকাতা (Kolkata) থেকে মাত্র ৬ ঘণ্টায় ঢাকায় (Dhaka) পৌঁছোনো সম্ভব হবে। বাংলাদেশের (Bangladesh) জিডিপি (GDP) বেড়ে যাবে ১.২৩ শতাংশ। সেই সঙ্গে কমবে বেকারত্ব। চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দরের ওপর চাপ কমবে। উত্তরপূর্ব ভারতে পণ্যপরিবহণ সহজ ও সাশ্রয়ী হবে।

পদ্মাসেতু নিয়ে গবেষণা  

এরই মধ্যে পদ্মার দুই তীরে জমির দাম বেড়ে গিয়েছে কয়েক গুণ। সম্ভাবনার পাখনা মেলেছে পর্যটন শিল্প। পদ্মার চর ঘিরে পর্যটনকেন্দ্র তৈরি করতে নেমে গেছেন অনেকেই। পদ্মাসেতু যে অর্থনীতিকে গতিশীল করবে তা নিয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বিশদ গবেষণা করেছে। বাংলাদেশ সেতু বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক প্রভৃতি সংস্থা পদ্মাসেতুর বহুমুখী কার্যক্রম নিয়ে গবেষণা করেছে।

পদ্মাবহুমুখী সেতুর সর্বশেষ সংশোধিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৩০ হাজার কোটি টাকার বেশি। পদ্মারেল সেতুর জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা। গবেষণায় বলা হয়েছে, পদ্মা সড়কসেতুতে যে অর্থ বিনিয়োগ করা হবে তার বিপরীতে মুনাফার হার বছরে দাঁড়াবে ১৯ শতাংশ। বাংলাদেশে সাধারণত বিনিয়োগের বিপরীতে মুনাফার হার ১৫ শতাংশ।

গবেষণায় বলা হয়েছে, পদ্মাসেতুতে এ হার বেশি হওয়ার কারণ হল, এর ফলে এমন একটি পরিকাঠামো তৈরি হবে যা বহুল ভাবে ব্যবহৃত হবে। যে কারণে এ থেকে রাজস্ব আয় ২০৫০ সাল পর্যন্ত বাড়তে থাকবে। সেতুকে কেন্দ্র করে দুই তীরেই বহুমুখী উন্নয়ন প্রকল্পের বাস্তবায়ন হচ্ছে। এতে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ছে।

চেহারা বদলাবে অর্থনীতির

বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, পদ্মা সেতু চালু হলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতির চেহারা বদলে যাব। বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও অথনৈতিক বৃদ্ধি ঘটবে, যা মানুষের জীবনমানকে আরও উন্নত করবে।

গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, সেতুকে কেন্দ্র করে দুই পাড়ে ২৯ শতাংশ বাড়বে নির্মাণকাজ, কৃষিকাজে বৃদ্ধি হবে সাড়ে ৯ শতাংশ, ৮ শতাংশ বাড়বে উৎপাদন ও পরিবহন ক্ষেত্রের কাজ। এর প্রভাবে ২০৩০ সালের মধ্যে ৫ কোটি লোকের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র তৈরি হবে। ফলে পদ্মানদীর ও পারে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে দারিদ্র্যের হার কমবে ১ শতাংশ। ওই অঞ্চলে দারিদ্র্য কমলে এর প্রভাব পড়বে সারা দেশে। তখন জাতীয় ভাবে দারিদ্র্যের হার কমবে ০.৮ শতাংশ।

নির্মীয়মাণ পদ্মাসেতু।

জিডিপি বাড়বে

অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে জিডিপি বৃদ্ধির হার হবে ১.২৩ শতাংশ। চলতি অর্থবছরে জিডিপির পরিমাণ ৩২ লাখ কোটি টাকা। এ হিসাবে সেতুর কারণে জিডিপিতে বাড়তি জোগান হবে ৫৫ হাজার কোটি টাকা। সারা দেশে বাড়বে ০.৫৬ শতাংশ। ফলে জাতীয় ভাবে বাড়বে ১৮ হাজার কোটি টাকা।

এ ভাবে জিডিপির পরিমাণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এ সেতুর অবদানও বাড়বে। পদ্মার ওপারে খুলনা ও বরিশাল বিভাগের ১৬ জেলা, ঢাকা বিভাগের ফরিদপুর, মাদারীপুর, শরীয়তপুর, রাজবাড়ি, পোপালগঞ্জ জেলা-সহ মোট ২১ জেলার ৩ কোটি মানুষ এ সেতুর ফলে সরাসরি উপকৃত হবে। বদলে যাব দক্ষিণাঞ্চলের ২১টি জেলার অর্থনৈতিক চিত্র। পোশাক, পাট, হিমায়িত খাদ্য, পর্যটন শিল্পে বিনিয়াগের দুয়ার খুলে যাবে।

পদ্মাসেতুর দক্ষিণপ্রান্ত তথা ভাঙা তে-মাথা থেকে তিন দিকে তিনটি রাস্তা চলে গেছে – বরিশাল, খুলনা এবং রাজবাড়ি, যশোর, বেনাপোলে। এ তিনটি সড়ক যুক্ত হবে মোংলা, পায়রা সমুদ্রবন্দর ও বেনাপোল স্থলবন্দরের সঙ্গে। ফলে তিন বন্দর দিয়েই আমদানি পণ্য দ্রুত ঢাকা-সহ শিল্পাঞ্চলগুলোয় প্রবেশ করতে পারবে। এতে রফতানি পণ্যের লিড টাইম (ব্যাক টু ব্যাক এলসির আওতায় কাঁচামাল আমদানি করে তা দিয়ে পণ্য তৈরির পর রফতানি করতে যে সময় লাগে) কমে যাবে। ফলে দ্রুত ব্যবসার রিটার্ন বা মুনাফা পাওয়া যাবে। এতে অর্থের চলাচল বাড়বে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হবে বহুমুখী ক্ষেত্র।

আরও পড়ুন: বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য উপড়ে ফেলার উসকানিদাতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থার নির্দেশ হাইকোর্টের

dailyhunt

খবরের সব আপডেট পড়ুন খবর অনলাইনে। লাইক করুন আমাদের ফেসবুক পেজ। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল

বিজ্ঞাপন