করোনায় স্থবির শেওলা-সূতারকান্দি স্থলবন্দরের অর্থনীতির চাকা

0

ঋদি হক (শেওলা স্থলবন্দর থেকে ফিরে)

বাংলাদেশের (Bangladesh) সিলেটের (Sylhet) বিয়ানীবাজারের (Beanibazar) শেষ প্রান্তে শেওলা স্থলবন্দর (Sheola land port)। বেশ চওড়া পিচঢালা পথ। চারিদিকে দিগন্ত প্রসারিত সবুজ ফসলের মাঠ। মাথার ওপরে উদার আকাশ। জকিগঞ্জ সীমান্ত থেকে দু’ দফা অটো পালটে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার পথ  পেরিয়ে শেওলা। বিয়ানীবাজার থেকে আরও কম। শেওলার অপর প্রান্তে উত্তরপূর্ব ভারতের অসম রাজ্যের করিমগঞ্জ জেলার সুতারকান্দি স্থলবন্দর (Sutarkandi land port)। কিন্তু ব্যস্ততম এই স্থলবন্দর এখন প্রায় স্থবির। করোনাভাইরাস অতিমারি (coronavirus pandemic) কেড়ে নিয়েছে শেওলা-সুতারকান্দির কর্মচাঞ্চল্য। থামিয়ে দিয়েছে অর্থনীতির চাকা। 

উত্তরপূর্ব ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের ব্যবসাবাণিজ্যের গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে। বিশেষ করে সাত রাজ্যকে ঘিরে যে বাণিজ্যিক সম্ভাবনা রয়েছে, তার প্রসার ঘটাতে উভয় দেশ উদ্যোগী হয়েছে। জলপথের পাশাপাশি স্থলপথেও পণ্যপরিবহন অত্যাবশ্যক হয়ে উঠেছে। সময় বাঁচিয়ে নিরাপদ ও অর্থসাশ্রয়ী পণ্যপরিবহনে প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো নির্মাণের কাজে হাত লাগানো হয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ বিষয়ে সব চেয়ে এগিয়ে। এশিয়ায় অর্থনৈতিক ভাবে যে মজবুত অবস্থানে বাংলাদেশ রয়েছে, তার কৃতিত্বের দাবিদার তিনিই।

জকিগঞ্জ-করিমগঞ্জ জলপথ, শেওলা-সুতারকান্দি স্থলবন্দর এবং কালীবাড়ি-মহিষাশন রেলপথ নিয়ে সরেজমিন প্রতিবেদন তুলে আনতে মাঠে নামা।

জকিগঞ্জ থেকে অটোয় দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে সিলেটের বিয়ানীবাজার সীমান্তে বাংলাদেশের স্থলবন্দর শেওলায় প্রবেশের আগেই দেখা গেল মাঝবয়সি তামাটে বর্ণের এক ব্যক্তিকে। তিনি এক তরুণকে সঙ্গে নিয়ে মাপজোখে ব্যস্ত। মাথার ওপরে জ্বলন্ত সূর্য। পাশেই উড়ছে বাঁশের কষ্ণিতে বাধা লাল নিশান। তার দিকে ইঙ্গিত করে তিনি জানালেন, এলাকাটি স্থলবন্দরের জন্য বরাদ্দ। মাটি ভরাটে কী পরিমাণ পাইপ লাগবে তারই কাজ চলছে। পাশেই দেখা গেল কিছু অংশে মাটি ফেলা হয়েছে।

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান তরিকুল ইসলাম আগেই ‘খবর অনলাইনকে’ জানিয়েছেন, শেওলায় একটি আধুনিক স্থলবন্দর গড়ে তুলবেন তাঁরা। পরিকাঠামো নির্মাণে জায়গা পেয়েছেন। শিগগিরই এখানে সেই কাজ শুরু করার প্রক্রিয়া চলছে। খুব দ্রুতই তাঁরা পরিকাঠামো নির্মাণে হাত লাগাবেন। সরেজমিন ঘুরে তাই দেখা গেল।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, বাংলাদেশের স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের আওতায় মোট ২৪টি স্থলবন্দর রয়েছে। এর মধ্যে ১৪টিতে কার্যক্রম চালু রয়েছে। এর মধ্যে ১৩টিই ভারতের সঙ্গে এবং একটি মায়ানমারের সঙ্গে।

শেওলা বিজিবি (Border Guards Bangladesh, BGB) চৌকির দায়িত্বরত এক জওয়ান জানালেন, করোনার কারণে ব্যস্ততম স্থলবন্দরটি প্রায় অচল। দিনে দু’-এক গাড়ি পণ্য আসে। তার মধ্যে থাকে আদা ও পাথর। তবে এই সীমান্তে বাংলাদেশি পণ্যের রফতানির তালিকাটা বেশ লম্বা। তিনি জানালেন, প্লাস্টিকের জলের ট্যাংক, প্লাস্টিকের নানা সামগ্রী, খাদ্যসামগ্রী বেশ যায় এ পথে। বিশেষ করে প্যাকেটজাত খাদ্যের চাহিদাই বেশি।

স্থলবন্দরের জন্য নির্ধারিত জায়গা।

স্থলবন্দরের জন্য জেলাপ্রশাসনের বুঝিয়ে দেওয়া জায়গাটার কথা বলতেই উঠে দাঁড়ালেন এই বিজিবি জওয়ান। বললেন, এই চৌকির পেছন থেকে প্রায় এক কিলোমিটার জায়গা স্থলবন্দরের জন্য বরাদ্দ। বিজিবির চৌকির পেছনে দাঁড়াতেই দেখা গেল লালনিশান গেড়ে স্থলবন্দরের জায়গা চিহ্নিত করা হয়েছে। সামনের দিকে পা বাড়াতেই বিনীত আবেদন, “ও দিকে যাবেন না। ওটা ভারত।” দৃষ্টির সীমানায় ‘স্বাগত ভারত’ লেখাটি চোখে পড়ে।

শেওলা-সুতারকান্দি সীমান্ত দিয়েই বাংলাদেশের বহু মানুষ অসমের করিমগঞ্জ ও শিলচরে যাতায়াত করেন। নানা অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়া ছাড়াও তাঁদের অনেকেই ছুটে যান স্বজনদের কাছে। উভয় পাশের মানুষের মধ্যে আত্মীয়তার বন্ধন যে বহু পুরোনো। চারিদিকে দিগন্ত প্রসারিত সবুজ ফসলভরতি মাঠের বুক চিরে চওড়া রাস্তা পৌঁছে গিয়েছে সূতারকান্দি।

সকাল থেকে সূর্যডোবা পর্যন্ত উভয় পাশের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা প্রচণ্ড ব্যস্ত সময় পার করতেন। কোনো কোনো সময় খাবারের সময় পর্যন্ত মিলত না। কিন্তু সর্বনাশা করোনা উভয় দিকের দায়িত্বরত মানুষদের ব্যস্ততা কেড়ে নিয়েছে। তাঁরা এখন পার করছেন অলস সময়। অথচ কতই না ব্যস্ত স্থলবন্দর ছিল শেওলা। উভয় দিকে থাকা পণ্যবাহী যানের দীর্ঘ সারি এখন অতীত।

ভাঙা হৃদয় নিয়ে ফিরে আসার পথে দেখা গেল কাস্টমস ও ইমিগ্রেশন অফিস। কয়লা আমদানিকারী ব্যবসায়ী ও পরিবহন শ্রমিকদের সংগঠনের সাইনবোর্ড। কয়েক কদম এগিয়ে আসতেই ডান পাশে বেশ কয়েকটি ট্রাক। হোটেল বন্ধ। চা-দোকানির মুখ ভার। গল্পগুজবে সময় পার করছেন সবাই। এই অঞ্চলে রাতে শীতের প্রকোপ বাড়লেও দিনের সূর্য বেশ চড়া। এ অবস্থায় শেওলা ও সুতারকান্দিকে গুডবাই জানিয়ে অটোয় চেপে বসলাম।

এ বারের যাত্রা বাংলাদেশের কালিকাবাড়ি ও অসমের মহিষাশন সীমান্ত। যেখান দিয়ে চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর থেকে পণ্যবাহী ট্রেন সরাসরি চলে যাবে অসম-সহ সাত রাজ্যে।

খবরঅনলাইনে আরও পড়ুন

দুই যুগে প্রথম নারী সভাপতি, বাংলাদেশে ইআরএফ-এর ঝান্ডা শারমীন রিনভীর হাতে

খবরের সব আপডেট পড়ুন খবর অনলাইনে। লাইক করুন আমাদের ফেসবুক পেজ। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল

বিজ্ঞাপন