শুধু মন্দির চত্বরেই নয়, গর্ভগৃহেও ঢুকতে পারবেন মহিলারা, বলল মুম্বই হাইকোর্ট

0

sanbhu sen

শম্ভু সেন

প্রচণ্ড বৃষ্টিতে ভেসে যাচ্ছে মহাবালেশ্বর-পঞ্চগনি। অক্টোবরের গোড়ার দিক। স্থানীর মানুষজন বলছেন, এ সময়ে এখানে এ রকম বৃষ্টি অভূতপূর্ব। আমাদের বেড়ানোটাই যে মাটি। তবু তারই মধ্যে বেরিয়ে পড়লাম। পৌঁছে গেলাম পঞ্চগনির টেবল্‌ ল্যান্ডে। অসাধারণ ভিউ পয়েন্ট। কিন্তু বাদ সাধল সেই বৃষ্টি। গাড়ি থেকে নামতেই পারলাম না। মুখ ঘুরিয়ে নেমে এলাম শহরের বাজার এলাকায়। তার পর আবার পাহাড়ি পথ ধরলাম। চললাম রাজপুরী গুহা দেখতে। প্রায় ৬ কিমি পথ ভেঙে যখন গুহার কাছে এসে পৌঁছলাম, তত ক্ষণে বৃষ্টি দূরে হটেছে। গাড়ি রেখে নামতে হয় বেশ কিছু সিঁড়ি, পাহাড় কেটে তৈরি করা। একটু পিছিয়ে পড়েছিলাম। শুনলাম উত্তপ্ত কথা কাটাকাটি। গুহা থেকেই আসছে না ? কাছে যেতেই আমি থ। দেখি পৈতেধারী এক ব্যক্তি চিৎকার করে কিছু বলছেন আর আমার স্ত্রী গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে। কী ব্যাপার ? জানলাম, কার্তিকের মন্দিরে প্রবেশ করে আমার স্ত্রী মন্দির ‘অপবিত্র’ করে দিয়েছেন। এখন মন্দির ‘শুদ্ধ’ করতে হবে। সে অনেক হ্যাপা। তাই মেজাজ গরম পৈতেধারীর। বুঝলাম, এখানে তর্ক করা বৃথা। আমরা ‘বহিরাগত’, নিয়মকানুন জানি না, বলে পার পেলাম। আকাশের মেঘ কেটে গেলেও মনের মধ্যে এক রাশ মেঘ জমা হয়ে গেল। আহা, তখন যদি মুম্বই হাইকোর্টের রায়টা হাতে থাকত। তর্ক করার তবু একটা হাতিয়ার পেতাম।

শুধু পঞ্চগনির মন্দির কেন, পশ্চিম ও দক্ষিণ ভারতের বহু মন্দিরে মেয়েদের প্রবেশে নানা বাধা। কোথাও একেবারেই নিষেধ, কোথাও ঋতুমতী মহিলাদের জন্য দ্বার বন্ধ, কোথাও আবার পোশাক নিয়ে নানা বায়নাক্কা। অনেকেরই আশা, মুম্বই হাইকোর্টের রায়ে এ বার নড়েচড়ে বসবে বিভিন্ন মন্দির কর্তৃপক্ষ। মুম্বই হাইকোর্ট পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছে, কোনও ভাবেই কোনও মন্দিরে মহিলাদের প্রবেশ আটকানো যায় না। এমনকী গর্ভগৃহে প্রবেশেও কোনও বাধা নেই। যেখানে পুরুষরা ঢুকতে পারেন, সেখানে মহিলারাও প্রবেশ করতে পারেন। কোনও আইন তাঁদের আটকাতে পারে না। বাধা দিলে ৬ মাসের জেল।

ঘটনার সূত্রপাত মহারাষ্ট্রের শনি শিঙ্গনাপুরের শনি মন্দিরে প্রবেশ নিয়ে। মুম্বই থেকে ৩০০ কিমি দূরে আহমেদনগর জেলার এই মন্দিরে গত ৪০০ বছর ধরেই মহিলাদের জন্য দরজা বন্ধ ছিল। ২০১১ সালে ব্যাপক ভাবে সচেতনতা প্রচারের পর মন্দিরের দরজা মহিলাদের জন্য খুললেও গর্ভগৃহে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয় না। যে ‘চৌতারা’য় শনির পাথরের বিগ্রহ অধিষ্ঠিত, সেখানে চড়ার অধিকার নেই মহিলাদের। গত নভেম্বরে এক মহিলা ভুল করে সেই ‘চৌতারা’য় উঠে পড়লে দুধ ও তেল দিয়ে ধুয়ে সেই জায়গা শুদ্ধ করা হয়। এই ঘটনা নিয়ে ব্যাপক আলোড়নের সৃষ্টি হয়। শনি মন্দিরের ‘চৌতারা’য় উঠে পুজো করতে দেওয়ার দাবিতে ২৬ জানুয়ারি শ’ চারেক মহিলা শনি শিঙ্গনাপুরের উদ্দেশে রওনা হন। কিন্তু তাঁদের মন্দির থেকে ৭০ কিমি দূরে সুপা গ্রামে আটক করা হয়। পরে ছেড়ে দেওয়া হয়।

এর পরেই মুম্বই হাইকোর্টে এক গুচ্ছ জনস্বার্থ মামলা দায়ের করা হয়। এ রকমই একটি মামলা দায়ের করেছিলেন প্রবীণ আইনজীবী নীলিমা বর্তা ও সমাজকর্মী বিদ্যা বল। বুধবার এই মামলার শুনানির সময়ে প্রধান বিচারপতি ডি এইচ বাঘেলা ও বিচারপতি এম এস সোনাকের বেঞ্চ পরিষ্কার জানিয়ে দেন, মন্দিরে মহিলাদের প্রবেশের অধিকার রক্ষার দায়িত্ব রাজ্য সরকারের। ১৯৫৬ সালের ‘মহারাষ্ট্র হিন্দু প্লেস অব ওঅরশিপ (এন্ট্রি অথরাইজেশন) অ্যাক্ট’ অনুসারে কোনও মন্দির কর্তৃপক্ষ বা ব্যক্তি যদি কাউকে মন্দিরে প্রবেশে বাধা দেয়, তা হলে তার ৬ মাসের কারাদণ্ড হবে। রাজ্যের এই আইনটি ব্যাপক ভাবে প্রচারের জন্য হাইকোর্ট রাজ্য সরকারকে নির্দেশ দেয়। শনি শিঙ্গনাপুরের মন্দিরে মহিলাদের প্রবেশ করতে দেওয়া হবে কি না, তা নিয়ে রাজ্যের মতামত ১ এপ্রিল জানাতে নির্দেশ দিয়েছে হাইকোর্ট। তবে নিজের রাজ্যে এই প্রথা তিনি সমর্থন করেন না বলে আগেই জানিয়েছেন মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়ণবীস।

এখানে উল্লেখ্য, কেরলের শবরীমালা মন্দিরে মহিলাদের প্রবেশ নিয়ে একটি মামলা সুপ্রিম কোর্টে চলছে। সেখানে অবশ্য নিয়মটা একটু ভিন্ন। ঋতুমতী মহিলারা সেখানকার মন্দিরে ঢুকতে পারেন না। অপবিত্রতার নামে মহিলাদের উপর এই নিষেধাজ্ঞা চাপানো যায় কি না, তা নিয়ে চলছে জোর বিতর্ক। ওই নিষেধাজ্ঞায় সায় দেওয়ায় সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে রাজ্য সরকারকে।

খবরের সব আপডেট পড়ুন খবর অনলাইনে। লাইক করুন আমাদের ফেসবুক পেজ। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল

বিজ্ঞাপন

1 COMMENT

  1. samajer bhitare negative attitude dhuke geche.court durasthan swam bhagoban ele o kichu hobe na. eto bachar dhore continue hobei ba keno.