বিমলা শিশুগৃহে কেন্দ্রীয় প্রতিনিধিরা

নিজস্ব সংবাদদাতা, জলপাইগুড়ি : সিআইডির পাশাপাশি জলপাইগুড়ি শিশুপাচার কাণ্ডের তদন্তে এ বার কেন্দ্রীয় প্রতিনিধিদল। মঙ্গলবার দুপুরে দিল্লি থেকে উড়ে আসেন ‘ন্যাশনাল কমিশন ফর প্রোটেকশন অফ চাইল্ড রাইটস’-এর দুই সদস্য প্রিয়াংক কানুনগো ও যশবন্ত জৈন। দিনভর তাঁরা ‘বিমলা শিশুগৃহ’-সহ বিভিন্ন অনুসন্ধান চালান। কিন্তু তাঁদের অভিযোগ, তদন্তের কাজে জেলা প্রশাসন অসহযোগিতা করছেন।

দুই কেন্দ্রীয় প্রতিনিধি প্রথমেই যান চন্দনা চক্রবর্তীর ‘বিমলা শিশুগৃহে’। সেখান থেকে বহু নথিপত্র বাজেয়াপ্ত করেন তাঁরা। আশ্চর্যের বিষয়, ওই হোম থেকে বিভিন্ন ধরনের প্রচুর ওষুধ মিলেছে। কমিশনের সদস্য যশবন্ত জৈন’-এর বক্তব্য, শিশু ও নবজাতকদের হোমে এই ধরনের ওষুধ থাকার কথা নয়। ওই ওষুধগুলি শিশুদের ওপর অপব্যাবহার কর হত কিনা তা খতিয়ে দেখা হবে বলে জানিয়েছেন তিনি। এ ছাড়াও শিশুদত্তক দেওয়া সম্পর্কিত বহু দস্তাবেজ পেয়েছেন তাঁরা। জেলা প্রশাসনের কাছেও হোম সম্পর্কিত নথি চেয়ে পাঠিয়েছেন কমিশনের সদস্যরা। সেইগুলি হাতে পেলে তাঁরা কাল বুধবার প্রশাসনিক আধিকারিকদের সঙ্গেও কথা বলবেন। তবে এই ঘটনা নিয়ে যে কেন্দ্রীয় সরকার উদ্বিগ্ন তা পরিষ্কার কমিশনের সদস্যদের কথায়। কমিশনের সদস্য প্রিয়াংক কানুনগো জানিয়েছেন, শুধু জলপাইগুড়ি নয়, পশ্চিমবঙ্গের অনেক জায়গাতেই শিশুপাচার চক্র সামনে আসছে, এর ভালো ভাবে তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। এমনিতেই গ্রেফতার হওয়ার পর সিবিআই তদন্তের দাবি তুলেছিলেন বিজেপি নেত্রী জুহি চৌধুরী। একই দাবি তুলেছেন বিজেপির রাজ্য নেতৃত্বও। কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন এই কমিশনকে দিয়ে তদন্ত করানো তার প্রথম পদক্ষেপ বলেই মনে করছেন অনেকে।

কিন্তু এখানে এসেই প্রথম দিনই জেলা প্রশাসনের বিরুদ্ধে অসহযোগিতার অভিযোগ তুললেন কেন্দ্রীয় প্রতিনিধিরা। মঙ্গলবার রাতে তাঁরা জেলাশাসকের দফতরে যান জেলা সমাজকল্যাণ আধিকারিকের সঙ্গে কথা বলতে। কিন্তু তাঁদের অভিযোগ, দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করার পরও তিনি দেখা করতে আসেননি। গত তিন মার্চ প্রতিনিধিদলের আসার কথা জানিয়ে কেন্দ্রীয় কমিশনের তরফে হোম সম্পর্কিত নথিপত্র প্রতিনিধিদের দিতে বলা হয়েছিল। কমিশনের সদস্য প্রিয়াংক কানুনগোর অভিযোগ, সেই নথি আজ বারবার চাওয়া হলেও তা দেয়নি জেলা প্রশাসন। আগামীকালের মধ্যে এই নথি হাতে না পেলে কমিশনে অভিযোগ জানানো হবে বলে জানিয়েছেন তিনি। এতবড়ো গুরত্বপূর্ণ ঘটনার তদন্তে এসে কী কারণে কেন্দ্রীয় প্রতিনিধিদলকে এই অসহযোগিতার সম্মুখীন হতে হল তা নিয়ে স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন উঠেছে। কাউকে আড়াল করার চেষ্টা কি না তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন কমিশনের সদস্যরা।

sasmita
আদালতের পথে সাস্মিতা।

এ দিকে মঙ্গলবার দুপুরে আদালতে তোলার সময় তাঁকে ভিত্তিহীন অভিযোগ ফাঁসানো হয়েছে বলে দাবি করেন ধৃত সাস্মিতা ঘোষ। সোমবার সিআইডির হাতে গ্রেফতারের পরই তাঁকে জলপাইগুড়ি শিশুসুরক্ষা আধিকারিকের পদ থেকে বরখাস্ত করা হয়। আজ তিনি বলেন, “প্রশাসনের নির্দেশ মেনে কাজ করেছি, তাই কিছু ভুল থাকলে, যাঁরা নির্দেশ দিয়েছিলেন তাঁদের আগে ধরা উচিত।” আগের জেলাশাসকেরও এই ঘটনায় দায় রয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। তবে তিনি জেলাশাসকের নাম বলতে চাননি। ইতিমধ্যে তৎকালীন জেলাশাসক পৃথা সরকারকে সোমবারই অতিরিক্ত স্বাস্থ্য সচিবের পদ থেকে সরিয়ে তুলনামূলক ভাবে কম গুরুত্বপূর্ণ পদে বদলি করা হয়েছে। শিশুপাচার কাণ্ডের সঙ্গে এই বদলির কোনো যোগ রয়েছে কি না তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। 

মঙ্গলবার আদালতে তোলার পর জামিনের জন্য আবেদন করেন সাস্মিতার আইনজীবী। এ দিকে তদন্ত এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য তাঁর ১৪ দিনের হেফাজতের আবেদন জানায় সিআইডি। দু’পক্ষের বক্তব্য শোনার পর জামিনের আবেদন খারিজ করে বিচারক সাস্মিতার ৭ দিনের সিআইডি হেফাজতের নির্দেশ দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন আদালতের সরকারি আইনজীবী প্রদীপ চ্যাটার্জি। এর পরেই তাঁকে নিয়ে শিলিগুড়ি চলে যান তদন্তকারীরা। আগামীকাল থেকে পিনটেল ভিলেজে স্বামী মৃণাল ঘোষের মুখোমুখি বসিয়ে তাঁর জেরা শুরু হবে।

এ দিকে মঙ্গলবার আদালতে গোপন জবানবন্দি দেন দার্জিলিং জেলা শিশু সুরক্ষা সমিতির দুই সদস্য। সূত্রের খবর, শিশুপাচার কাণ্ডে এই দু জনকে সরকারি সাক্ষী করা হবে।

মঙ্গলবার সকালে শারীরিক অসুস্থতা বোধ করায় ধৃত মানস ভৌমিককে জলপাইগুড়ি কেন্দ্রীয় সংশোধনাগার থেকে জলপাইগুড়ি জেলা হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। চিকিৎসকের পরামর্শে পরে ফের তাঁকে সংশোধনাগারে নিয়ে যাওয়া হয়। আপাতত সংশোধনাগারের হাসপাতালেই তাঁর চিকিৎসা চলবে।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here