নাগপুর : ডিমনিটাইজেশন তথা বিমুদ্রাকরণকে ‘বছরের সব চেয়ে বড়ো দুর্নীতি’ বলে আখ্যা দিলেন প্রাক্তন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী পি চিদম্বরম। এ ব্যাপারে তিনি তদন্ত দাবি করেছেন। চিদম্বরম বলেছেন, এর ফলে সাধারণ মানুষের যে ক্ষতি হল, তা তাঁরা ভুলে যাবেন না, সরকারকে ক্ষমাও করবেন না।

মঙ্গলবার নাগপুরে এক অনুষ্ঠানে যোগ দিতে এসে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলছিলেন চিদম্বরম। ওই কংগ্রেস নেতা বলেন, ডিমনিটাইজেশন করে গরিব মানুষের মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়া হয়েছে। এ যেন সেই বিশাল এক পাহাড় খুঁড়ে ইঁদুর বেরোনোর মতো ব্যাপার। একটা জাতীয় প্রাকৃতিক বিপর্যয়ও মানুষের এত দুর্দশা ডেকে আনত না।

“এটা একটা উদ্ভট প্রয়াস। কোনো রকম ভাবনাচিন্তা না করেই এই পথে যাওয়া হয়েছে। বিশ্বের কেউ এই ডিমনিটাইজেশন নিয়ে একটা ভালো কথাও বলেননি। বড়ো বড়ো সংবাদপত্র এবং অর্থনীতিবিদরা এর নিন্দা করেছেন” – এই মন্তব্য করে চিদম্বরম বলেন, এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে অন্তত অর্থনীতিবিদদের সঙ্গে কথা বলা উচিত ছিল সরকারের। যশবন্ত সিনহা তো তাদের নিজেদের লোক। অন্তত তাঁর সঙ্গে কথা বলা যেতে পারত। মনমোহন সিং ছিলেন। তাঁর সঙ্গেও কথা বলা যেত। গোপনীয়তা রক্ষা করার কথা বলা হচ্ছে। কীসের গোপনীয়তা? সাংবাদিকদের কাছে চিদম্বরমের প্রশ্ন, “আপনাদের কি মনে হয়, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী যদি এ ব্যাপারে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ নিতেন, তা হলে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী গোপনীয়তা ভাঙতেন? ১০০ জন অফিসার কেন্দ্রীয় বাজেট তৈরি করার কাজে ব্যস্ত থাকেন। আজ পর্যন্ত এক দিনও কি বাজেট ফাঁস হয়েছে ?”

চিদম্বরম বলেন, ৫০০ আর ১০০০ টাকার নোট রাতারাতি নিষিদ্ধ করে প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, কালো টাকা নষ্ট করতে এবং জঙ্গিদের টাকার উৎস বন্ধ করতেই এই ব্যবস্থা। নোট নিষিদ্ধ করার দু’সপ্তাহ পর থেকে বলতে শুরু করেছেন, ভারতকে ডিজিটাল আর ক্যাশলেস করতে এই ব্যবস্থা। যত্তো সব অবাস্তব চিন্তা। রোজই গোলপোস্ট সরে যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর মুখে এখন আর কালো টাকার কথা নেই, এখন নগদহীন অর্থনীতির কথা। ভারতবর্ষ কয়েক মাসের মধ্যে ৩ শতাংশ নগদহীন অর্থনীতির দেশ থেকে ১০০ শতাংশ নগদহীন অর্থনীতির দেশে পরিণত হবে। এ সব উদ্ভট প্রত্যাশা।

প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী বলেন, ৮ নভেম্বরের পর থেকে ব্যাঙ্ক আর এটিএম-এর সামনে দীর্ঘ লাইন। লাইনে দাঁড়িয়ে কত হতভাগ্য মানুষ মারা গেলেন। ব্যাঙ্ক নগদ টাকা দিতে পারছে না গ্রাহকদের। এ প্রসঙ্গে তাঁর প্রশ্ন, নোট বাতিলের পর কত টাকা নগদের প্রয়োজন সরকার কি তার কোনো হিসাব করেছিল? সরকার কী হিসাব করে বলেছিল যে এক জন গ্রাহক তাঁর অ্যাকাউন্ট থেকে প্রতি সপ্তাহে ২৪ হাজার টাকা পর্যন্ত তুলতে পারবেন? এখন তো কোনো ব্যাঙ্কেরই সেই টাকা দেওয়ার ক্ষমতা নেই। এই ডিমনিটাইজেশনে ৪৫ কোটি মানুষের ক্ষতি হয়েছে। কে তাঁদের ক্ষতিপূরণ দেবে? চিদম্বরমের আরও প্রশ্ন, জেলা সমবায় ব্যাঙ্কগুলিকে এর আওতার বাইরে রাখা হল কেন, যার ফলে চরম ভুগতে হচ্ছে কৃষকদের?

বলা হয়েছে, কালো টাকা নির্মূল করতে, দুর্নীতি উচ্ছেদ করতে আর সন্ত্রাসবাদ বন্ধ করতে ডিমনিটাইজেশন করা হয়েছে। চিদম্বরম বলেন, এর একটা লক্ষ্যও পূরণ হবে না। কারণ এ সব বন্ধ করার রাস্তা ডিমনিটাইজেশন নয়। দুর্নীতি বন্ধ হয়ে গিয়েছে? কালো টাকার রমরমা কমে গিয়েছে? শুধু একটাই প্রভাব পড়বে এর ফলে। দেশের অর্থনৈতিক উন্নতি স্তব্ধ হবে। বেশির ভাগ অর্থনীতিবিদ মনে করেন, দেশের জিডিপি-তে (মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন) এই ডিমনিটাইজেশনের বিরূপ প্রভাব পড়বে। অন্তত ১ থেকে ২ শতাংশ কমে যাবে। মাঝখান থেকে শাস্তি পাচ্ছেন দেশের গরিবগুর্বো মানুষগুলো।

তা হলে সে ভাবে প্রতিবাদ হচ্ছে না কেন ? সাংবাদিকদের এই প্রশ্নের উত্তরে চিদম্বরম বলেন, “আমার বিশ্বাস সরকার তাঁদের সঙ্গে যা করছেন তা তাঁরা ভুলে যাবেণ না, সরকারকে ক্ষমাও করবেন না। আপনারা যে ভাবে চাইছেন সেই ভাবে প্রতিবাদ দেখতে পাচ্ছেন না বলে মনে করবেন না, তাঁরা সরকারের সব কিছু ক্ষমা করে দিচ্ছেন।”

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here