৪০ দিন ধরে কুয়ো খুঁড়ে জল আনলেন মহারাষ্ট্রের ‘ভগীরথ’

0

খবর অনলাইন:  দশরথ মাঝির মতো তিনি হয়তো একটা পাহাড় গুঁড়িয়ে দিতে পারেননি, তবে তাঁর কাজটাও কম বিস্ময়জনক নয়। একার চেষ্টায় একটা কুয়ো খুঁড়ে ফেলেছেন তিনি। আজ আর জলের জন্য গ্রামের দলিতদের উচ্চবর্ণের মানুষদের লাথিঝ্যাঁটা খেতে হয় না।

মালিকের কুয়ো থেকে জল তোলার অনুমতি পাননি বাপুরাও তাজ্ঞে। শুধু তা-ই নয়, এর জন্য তাঁর স্ত্রীকে বার বার অপমানিত হতে হয়েছে। আর সহ্য করতে পারেননি বাপুরাও। যে কাজ ৪-৫ জনের চেষ্টায় হয়, সে কাজ তিনি একাই সাঙ্গ করেছেন। কেউ তাঁকে সাহায্য করেনি। এমনকি তাঁর পরিবারেরও কেউ নয়। কিন্তু তাঁর জেদ তাঁর কাজে সাফল্য এনে দিয়েছে।

বাপুরাওয়ের বাস মহারাষ্ট্রের বাশিম জেলার কলমবেশ্বর গ্রামে। কী ভাবে ঘটল এই অঘটন?

বাপুরাও বলছিলেন, “মার্চের একটা দিন। মালিকের কুয়ো থেকে জল তুলতে গিয়েছিলাম। আমাদের জল তুলতে দেওয়া হল না। উলটে অপমান করা হল, বিশেষ করে আমার স্ত্রীকে। দুঃখ-ভরা মন নিয়ে ফিরে এলাম। কান্না চলে আসছিল চোখ ঠেলে। বুঝতে পারছিলাম আমরা গরিব আর দলিত বলেই আমাদের সঙ্গে এই ব্যবহার। প্রতিজ্ঞা করলাম আর কখনও কারও কাছে জল চাইব না। কাছেই মালেগাঁও শহর। চলে গেলাম সেখানে, যন্ত্রপাতি কিনে আনলাম। এক ঘণ্টার মধ্যে কাজ শুরু করে দিলাম।”

মালিকের নাম জানাতে চাননি বাপুরাও। কারণ এক গ্রামে বাস করে তিনি কারওর  সঙ্গে শত্রুতা করতে চান না।

বাপুরাও দৈনিক মজুরির ভিত্তিতে শ্রমিকের কাজ করেন। সংসারটা তো চালাতে হবে। তাই রোজ কাজে যাওয়ার আগে ৪ ঘণ্টা ও কাজ থেকে ফিরে ২ ঘণ্টা, দৈনিক মোট ৬ ঘণ্টা কুয়ো খোঁড়ার কাজে ব্যস্ত থেকেছেন।

কিন্তু মাটি খুঁড়লে কোথায় জল মিলতে পারে তা তো জানা ছিল না তাঁর। কী করে সম্ভব হল জল পাওয়া ?

বাপুরাও সেই কাহিনিও শোনালেন – “আমি আমার সহজাত বুদ্ধি দিয়ে একটা জায়গা বেছে নিলাম। প্রতি দিন কাজ শুরু করার আগে ভগবানের কাছে প্রার্থনা করতাম। ৪০ দিন ধরে টানা ১৪ ঘণ্টা কাজ করে গিয়েছি। আমার সংসার নির্বাহের জন্য ৮ ঘণ্টা আর কুয়ো খোঁড়ার জন্য ৬ ঘণ্টা। কেউ আমাকে সাহায্য করেনি। উলটে আমাকে নিরুৎসাহ করেছে। ঠাট্টা করেছে। বলেছে, এই সাংঘাতিক গরমে গ্রামের তিনটে কুয়ো আর একটা বোরওয়েল যেখানে শুকিয়ে গিয়েছে সেখানে এই পাথুরে জায়গায় কোথায় জল পাবে। কিন্তু পরিশ্রমের ফল মিলেছে। অবশেষে জল মিলেছে।”

বাপুরাওয়ের স্ত্রী সঙ্গীতার আজ খুব কষ্ট হয় স্বামীকে এই কাজে এতটুকু সাহায্য না-করার জন্য – “সাহায্য তো করিইনি। উলটে ঠাট্টা করেছি। জল মিলেছে। এখন কুয়োটা আরও গভীর আর আরও চওড়া করার জন্য আমরা পরিবারের সবাই হাত লাগিয়েছি।”

১৫ ফুট গভীর আর ৬ ফুট চওড়া কুয়োটাকে বাপুরাও আরও ৫ ফুট গভীর ও আরও ২ ফুট চওড়া করতে চান। তাঁর আশা, এই কাজে তাঁর প্রতিবেশীরাও এগিয়ে আসবেন।

বাপুরাওয়ের প্রশংসায় পঞ্চমুখ তাঁর প্রতিবেশী জয়শ্রী – “আমরা এখন দিনের যে কোনও সময়ে জল পাই। এর কৃতিত্ব সম্পূর্ণ বাপুরাওয়ের। আগে রোজ ১ কিলোমিটার যেতে হত গ্রামের এক প্রান্ত থেকে জল আনতে। সেখানে জল মিলুক আর নাই মিলুক, অপমান বাঁধা ছিল।”

গোটা গ্রামের মানুষদের জন্য জলের ব্যবস্থা করে দিয়ে একটু একটু করে প্রচারের আলোয় আসছেন বাপুরাও তাজ্ঞে। গ্রামের সরপঞ্চ তাঁর ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। মালেগাঁওয়ের তহশিলদার তাঁর কাছে পুষ্পস্তবক পাঠিয়েছেন। বাশিমের এক সমাজকর্মী তাঁকে পাঁচ হাজার টাকা দিয়েছেন।

বাপুরাও কিন্তু কারও কোনও সাহায্যের পথ চেয়ে বসে থাকার বান্দা নন। তহশিলদার যখন জানতে চেয়েছিলেন, তাঁর কী সাহায্য চাই, বাপুরাওয়ের জবাব ছিল, “আপনি যা ভালো বোঝেন।”

সৌজন্যে: দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়া

খবরের সব আপডেট পড়ুন খবর অনলাইনে। লাইক করুন আমাদের ফেসবুক পেজ। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল

বিজ্ঞাপন