খবর অনলাইন : জাতীয় সড়ক ধরে ঝাঁসি থেকে পুব দিকে বান্দা যাওয়ার পথে বাংরা ব্লকের কাছে বাঁ দিকে ঘুরে কিলোমিটার ছয়েক গেলে একটা ধুলোয় ভরা রাস্তা পৌঁছে দেবে পাচওয়ারায়। এখানে একটা লেক আছে, আছে ড্যাম। লেকটা প্রাকৃতিক নয়, মানুষের তৈরি। আমরা আজকাল রেনওয়াটার হারভেস্টিং-এর নাম শুনি। এই বুন্দেলখণ্ডে অনেক কাল আগেই এই জল-ফলনের (ওয়াটার হারভেস্টিং) জন্য এই সব লেক-পুকুর কাটানো হয়েছিল, বিশেষ করে চান্দেলা-বুন্দেলা রাজাদের আমলে। এই সব জলাশয়ের জন্য ল্যান্ডস্কেপের সৌন্দর্যও অনেক বাড়ত আর বহু পরিবারের জীবনধারণেরও ব্যবস্থা হত। অনাবৃষ্টির সময়েও এই জলাশয়গুলোর জলে জমিতে সেচের ব্যবস্থা হত। কিন্তু তার আর উপায় নেই। সম্প্রতি এক আরটিআইয়ের জবাবে উত্তরপ্রদেশ সরকার জানিয়েছে, গত ১০ বছরে বুন্দেলখণ্ডে ৪২০০টি পুকুর উধাও হয়ে গিয়েছে। এর মধ্যে শুধুমাত্র ঝাঁসি জেলাতেই সংখ্যাটা আড়াই হাজার। আর সব পুকুরই গিয়েছে জমি-মাফিয়াদের দখলে।

জলসমস্যা সমাধানের জন্য ২০০৯ সালে বুন্দেলখণ্ড প্যাকেজ হাতে নেওয়া হয়েছিল। এই প্যাকেজে বেশি জোর দেওয়া হয়েছিল বিভিন্ন পুকুর-জলাশয়ের সংস্কারের কাজে। কথা ছিল হারিয়ে যাওয়া জলাশয়গুলো পুনরুদ্ধার করা হবে এবং নতুন নতুন পুকুর কাটা হবে। পাচওয়ারা ড্যাম সংস্কারের জন্য ২০ কোটি টাকার প্রকল্প ঘোষণা করা হয়। জলধারণ ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য লেকের গভীরতা আরও বাড়ানো হয়, যাতে শুখা মরশুমে এর জলে আশেপাশের গ্রামে সেচের কাজ করা যায়। কিন্তু সেই লেক প্রায় জলশুন্য। এমনকি লেকের জমিতে কোনও কোনও জায়গায় চাষও হচ্ছে। পাচওয়ারা গ্রামের মানুষজনই বলছেন, গত তিন বছরে তাঁরা ওই লেক থেকে সেচের জন্য সামান্য জলও পাননি।

উলটে হয়েছে বিপত্তি। লেক সংস্কারের কাজ করতে গিয়ে নতুন সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। লেকের গভীরতা বাড়াতে গিয়ে মাটি খুঁড়তে হয়েছে। আর সেই মাটি আর কাদা আশেপাশের জমিতে ছড়িয়ে পড়ে চাষের কাজ অসম্ভব করে তুলেছে। পাচওয়ারা গ্রামের দেবেন্দ্র শ্রীবাস্তবের ২০ বিঘা জমির মধ্যে ১৮ বিঘাই ডুবে আছে ড্যামের কাদায়। বাকি দু’ বিঘাতে চাষ করেছেন তিনি। তাঁর আক্ষেপ, “আমরা প্রথমে বিরোধিতা করেছিলাম। কিন্তু যারা সংস্কারের কাজ করছিল তারা অনেক বেশি শক্তিশালী। আমাদের সে রকম গ্যাঁটের জোর নেই যে জমি থেকে কাদা সরিয়ে সেখানে আবার চাষ করব।” পরিবারের ৬ জনের মুখে খাবার জোগানোর জন্য শ্রীবাস্তব আজ জমিদার থেকে কৃষিশ্রমিকে পরিণত হয়েছেন। কাঁদতেই কাঁদতেই বললেন, “অন্যের জমিতে মজুরের কাজ করতে করতে আমি আমাদের পড়ে থাকা জমিটা দেখতে পাই। খুব কষ্ট হয়। আমি এই জায়গা থেকে চলে যেতে চাই।”

আরও ৭০কিলোমিটার পুবে এগিয়ে গেলে চৌধুরি চরণ সিংহ রসিন ড্যাম, জেলা চিত্রকূট। ২০০৯-এর প্যাকেজ অনুসারে এখানে ড্যাম তৈরির কাজ শুরু হয়। এখানকার জলাশয়ের ধারণক্ষমতা ১৬২ লক্ষ ৫০ হাজার কিউবিক মিটার জল। জায়গাটিকে টুরিস্ট স্পট হিসাবে গড়ে তোলার জন্য ড্যামের দু’ দিকে তৈরি হওয়ার কথা ছিল ইকো পার্ক। ড্যামের উদ্দেশ্য ছিল নতুন করে কাটা ২২.৮ কিলোমিটার দীর্ঘ ক্যানালে জল পাঠানো যাতে রবি চাষের জন্য ১৪৯৪ হেক্টর জমিতে সেচের ব্যবস্থা করা যায়।

কিন্তু পরিকল্পনা ছিল এক, আর বাস্তবে ঘটেছে আর এক। যে বিশাল লেকের উপর ড্যাম গড়া হয়েছে, সেই লেকে এত জল নেই যে ক্যানালে জল সরবরাহ করা যায়। তাই মৎস্য দফতর ঠিক করেছে, ওখানে মাছের চাষ করা হবে। ৮০ কোটি টাকা খরচ করে তৈরি একটা সেচ প্রকল্প এখন মাছচাষের জলাশয়ে পরিণত। ইকো পার্কের অবস্থা শোচনীয়। পার্কে বসানো হয়েছিল বুদ্ধমূর্তি। বাচ্চারা সেই মূর্তির এক একটা করে অংশ নিয়ে চলে যাচ্ছে।

রসিন গ্রামের চাষি ব্রিজমোহন যাদবের ১৬ বিঘা জমির মধ্যে ১২ বিঘা জমিই সরকার ২০১১ সালে নিয়ে নেয় ড্যাম তৈরির জন্য। কথা ছিল ব্রিজমোহন ক্ষতিপূরণ পাবেন। কিন্তু দু’ বছরেও সেই ক্ষতিপূরণের টাকা এল না। পরিবারে তাঁর এক বছরের পুত্রসন্তান-সহ স্ত্রী, মা, বোন রয়েছেন। তাঁদের মুখে কী তুলে দেবেন ? এক দিন চলে গেলেন ড্যামের ধারে। জলে ঝাঁপিয়ে আত্মহত্যা করলেন। তাঁর বোনটি এখন হাই স্কুলে পড়ে। ব্রিজমোহনের মা বলছিলেন, “সরকারের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণের টাকাটা পেলে অন্তত মেয়েটার বিয়ে দিতে পারতাম।”

এ রকম দুর্দশার অসংখ্য কাহিনি ছড়িয়ে আছে বুন্দেলখণ্ডের এই অঞ্চলে। ২০১০ সালে সুখারি পূর্ব গ্রামে সেচের জল ধরে রাখার জন্য দু’টো চেক ড্যাম তৈরি করা হয়েছিল। ওই বছরেই এক রাতের বৃষ্টিতেই ধুয়েমুছে সাফ হয়ে গেল ড্যামদু’টো। গ্রামের মানুষ বিস্মিত। কী পদার্থ দিয়ে তৈরি হয়েছিল সেই ড্যাম! বন্যার জল প্রতিহত করতে নারায়ণী গ্রামে তৈরি হয়েছিল একটা দেওয়াল। একটা উদ্ভট পরিকল্পনা। যে গ্রামে কোনও দিন বন্যা হয় না, যে গ্রাম নিরন্তর খরায় ভোগে সেই গ্রামে বন্যা ঠেকাতে দেওয়াল! তা সে গ্রামেও এক রাতের বৃষ্টিতে ধসে পড়ল সেই দেওয়াল। প্যাকেজের টাকা কী ভাবে নয়ছয় হয়েছে, এই সব ঘটনাই তার প্রমাণ।

কিন্তু প্যাকেজের টাকা নয়ছয় হয়েছে, এ কথা মানতেই চান না বুন্দেলখণ্ড ডেভেলপমেন্ট অথরিটির চেয়ারম্যান রামকৃষ্ণ কুসমারিয়া। তিনি বেশ জোর দিয়েই বলেন, এই অঞ্চলের উন্নয়নের জন্য সরকারের সমস্ত বিভাগ এই প্যাকেজকে ভালো ভাবে কাজে লাগিয়েছে। প্যাকেজের টাকা সব দফতর পেয়েছে, তারা ভালো কাজও করেছে। কৃষি দফতরও ভালো কাজ করেছে। গম, ছোলার মতো শস্য নষ্ট হয়ে যেত। এখন সেই শস্য রক্ষা করার জন্য ভালো ব্যবস্থা হয়েছে। বন দফতরও ভালো টাকা পেয়েছে।

বুন্দেলখণ্ডে যখন দুর্ভিক্ষ পরিস্থিতি চলছে, বুন্দেলখণ্ডের মানুষদের যখন নুন আনতে পান্তা ফুরোচ্ছে, ক্ষুধা আর দারিদ্র থেকে বাঁচতে চলে যাচ্ছেন অন্যত্র, তখন উত্তরপ্রদেশ সরকার এই অঞ্চলের পরিস্থিতির জন্য প্রকৃতিকে দায়ী করছে। কুসমারিয়া বলেন, জল ধরে রাখার জন্য কুয়ো তৈরি করা হয়েছে। ভালো কুয়ো। কিন্তু জল নেই। “বৃষ্টি নেই। জল চলে গেছে ৯০০-১১০০ ফুট নীচে। বিশ্বায়নের নামে যা হচ্ছে, যে ভাবে প্রকৃতিকে নয়ছয় করা হচ্ছে তাতে এ সব পরিণাম তো ঘটবেই। সুনামি, শিলাবৃষ্টি, খরা এ সব তো হবেই।”

প্যাকেজ ব্যর্থ হয়েছে বলেই যে লোকেরা অঞ্চল ছেড়ে চলে যাচ্ছে সে কথা মানতে নারাজ কুসমারিয়া। জল নেই বলেই মানুষ চলে যাচ্ছে। প্রাণী, মানুষ, কারও জন্য জল নেই। এটা প্রাকৃতিক দুর্যোগ। এর সঙ্গে প্যাকেজের ব্যর্থতার কোনও সম্পর্ক নেই।

কথা ছিল ২০০৯–এর বুন্দেলখণ্ড প্যাকেজের সুফল দু’ বছরের মধ্যেই মিলবে। তা তো হয়ইনি, উলটে এর মেয়াদ ২০১৫ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত বাড়ানো হয়। সেই মেয়াদ শেষ হয়ে গিয়েছে, টাকাও শেষ। কিন্তু বুন্দেলখণ্ড সেই শুখাই আছে, একই রকম ক্ষুধার্ত। “এখন এপ্রিল মাস। বিয়ের মরশুম। শস্য বিক্রি করে কন্যার বিয়ের জন্য টাকা জোগাড় করেন চাষিরা। সরকার যদি কোনও সাহায্যের ব্যবস্থা না করে, তা হলে এই বিয়ের মরশুমে চাষি আত্মঘাতী হওয়ার ঘটনা বাড়তে পারে” –- আশঙ্কার স্পষ্ট ছাপ মৌরানিপুর গ্রামের চাষি শিবনারায়ণ পরিহারের চোখেমুখে।

Source : OPEN Magazine

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here