madhumantiমধুমন্তী চট্টোপাধ্যায় 

কলকাতা: হেরে গেছিলেন আইনি লড়াইয়ে। তবু শাহবানুর নামেই রয়ে গেছে মামলার নাম। নইলে ১৩০ কোটির দেশে কে-ই বা মনে রাখত মধ্যপ্রদেশের ওই স্বামী পরিত্যক্তাকে? ঠিক যেমন কেউ মনে রাখবে না মালদা, মুর্শিদাবাদ, নদিয়া থেকে আসা মুখতারা, নুস্তরি, মর্জিনাদের নাম। তবু ঘণ্টা তিনেক, ওদের কথা বলার এবং শোনার সুযোগ করে দিল সাউথ কলকাতা সোসাইটি ফর এম্পাওয়ারমেন্ট অফ উইমেন (কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়) এবং রোকেয়া নারী উন্নয়ন সমিতির যৌথ উদ্যোগ। আলোচনার বিষয় ছিল ‘তালাক (বিবাহ-বিচ্ছেদ) হোক রাষ্ট্র প্রণীত আইনে’।

তালাক পাওয়া মেয়েদের মুখেই শনিবার শোনা গেল ওদের লড়াইয়ের কথা। জলঙ্গির সাহিনা সুলতানা। আল আমিন মিশন থেকে মাধ্যমিক দিয়েছিল সাহিনা। প্রাপ্ত নম্বর ছিল ৬৬৩। উচ্চ মাধ্যমিকের পর ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন দেখেও বাড়ির চাপে বিয়ে করতে হয় গ্রামের বেশ সচ্ছল পরিবারের ছেলেকে। পড়াশোনাও বন্ধ হয়ে যায় মাঝপথেই। তার পর শ্বশুরবাড়িতে মানসিক, শারীরিক অত্যাচার, তার পর তালাক। সাহিনার ফিরে আসা বাপের বাড়িতে। সেখানেও খুব কিছু আলাদা নয় ছবিটা। আত্মীয়-স্বজন, পড়শিদের কাছে শুনতে হচ্ছে নানা কথা। সে সব সহ্য করেও ঘুরে দাঁড়িয়েছে সাহিনা। ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেছে নতুন করে, ভর্তি হয়েছে কলেজে।  মালদার মীরা খাতুন। গ্র্যাজুয়েট মীরা শেষ করতে পারেনি নার্সিং ট্রেনিং। বিয়ের পর লুকিয়ে পড়াশোনা করতে গিয়ে ধরা পড়ে যায় শ্বশুরবাড়ির লোকজনের কাছে। বরের ইচ্ছেয় মেনে নিতে হয় ‘মুখে তালাক’।

সালভানু, উলিয়া, হীরা খাতুনদের জীবনের গল্পগুলোও একই রকম। কারও ক্ষেত্রে আরও ভয়ংকর। শ্বশুরবাড়িতে হয়েছে অকথ্য অত্যাচার। খাবারে বিষ মেশানো হয়েছে, হুমকি দেওয়া হয়েছে মেরে ফেলার। বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে যখন তখন। স্বামী নিকাহ করেছেন অন্য মহিলাকে, সহ্য করতে হয়েছে তা-ও। থানা-পুলিশ, ডিএম, এসপি কেউ বাড়িয়ে দেয়নি সাহায্যের হাত। তালাক পেয়ে ফিরে আসার পর আরও দুর্বিষহ হয়েছে বাপেরবাড়ির জীবন। শনিবারের মঞ্চে জ্বলে উঠল সেই সব মেয়েরা। ওরা চায় তিন তালাক বন্ধ হোক। বন্ধ হোক ধর্মের দোহাই দিয়ে মুসলিম পার্সোনাল ল বোর্ডের চোখ রাঙানি। ওরা চায় তালাক-পাওয়া মেয়েরা যেন নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে, মাথা উঁচু করে বাঁচতে পারে। চায়, তালাকের যন্ত্রণা যেন ওদের পাশাপাশি কুরে কুরে খায় ওদের স্বামীদেরও।

মেহেরুন্নিসা, জসমিনাদের ধারণা, হিন্দু ধর্মে মেয়েদের ওপর এই অত্যাচার হয় না, হিন্দু মেয়েরা ভালো আছে। ওরা বোধহয় মহারাষ্ট্রের সেই গ্রামটার কথা জানে না, যেখানে খোলা রাস্তায় মেয়েদের নিলাম করা হয়। করে ওদের বাবা-দাদারা। পুরুলিয়া, মালদা থেকে আসা মেয়েগুলো, ওদের মায়েরা এখনও রাজস্থানের সেই গ্রামগুলোর চেহারা দেখেনি, যেখানে এই একুশ শতকেও স্বামী মারা গেলে মেয়েদের সহমরণে যাওয়াটা বাধ্যতামুলক। মঞ্চে উপস্থিত অধ্যাপক কাঞ্চন দাশগুপ্ত ওদের সামনে তুলে ধরলেন হিন্দু ধর্মের লজ্জাগুলো। সমাজকর্মী শাশ্বতী ঘোষ বারবার বললেন, সমস্যাটা ইসলামের নয়, সমস্যাটা সমাজের দৃষ্টিভঙ্গির। “এমন অনেক মানুষকে পাশে পাবেন, যাঁরা নিজের মেয়েদের ভালো রাখেননি, তাদের পাশে দাঁড়াননি। প্রশ্নটা শুধু মুসলিম মেয়েদের ভালো থাকার নয়, সব মেয়েরা যেন ভালো থাকে”।

আলোচনার আয়োজক ওই দুই সংস্থা শনিবার রাতেই তাদের দাবি ফ্যাক্স করলেন দেশের শীর্ষ আদালতের প্রধান বিচারপতিকে। দাবিগুলো হল-

  • তালাকে সমানাধিকার থাকবে নারীপুরুষের, তালাক হবে আদালতের মাধ্যমে
  • বহুবিবাহ নিষিদ্ধ করতে হবে (মুসলিম পার্সোনাল ল বোর্ড পুরুষের বহুবিবাহকে ইসলামের ধর্মীয় বিধান সম্মত বলে দাবি করে)
  • সম্পত্তির উত্তরাধিকারে সমানাধিকার থাকবে
  • দত্তক আইন চালু করতে হবে
  • স্বামী মারা গেলেও তার বাড়িতে থাকার অধিকার থাকবে মেয়েদের
  • তালাকপ্রাপ্ত, স্বামীপরিত্যক্ত এবং বিধবাদের জন্য স্বনির্ভর প্রকল্প চালু করতে হবে

আলোচনার শেষ পর্বে রোকেয়া নারী উন্নয়ন সমিতির সম্পাদিকা খাদিজা বানু তাঁর বক্তব্য রাখেন। খাদিজা মনে করিয়ে দিলেন, একশো বছরে সমাজে এত পরিবর্তন এল, তবে ধর্মের নিয়মে কোনো পরিবর্তন আসবে না কেন? না, ধর্মের নিয়মেও পরিবর্তন এসেছে, খাদিজা নিজেই বললেন, সুদ ভোগ করা ইসলাম ধর্মে পাপ, তবু প্রত্যেক ইমাম তা ভোগ করেন কী ভাবে? শুধু নিজেদের প্রয়োজনে স্বার্থান্বেষী মানুষ পরিবর্তন করে ধর্মের বিধান। ইসলামের জন্ম যে আরবে, সেখানেই সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পালটাচ্ছে ধর্ম। তা হলে ভারত কেন পারবে না মুসলিম মেয়েদের জন্য আইন করে তিন তালাক বন্ধ করতে? শুধুই মুসলিম ব্যাক্তিগত আইনের বিরুদ্ধে নয়, রাজ্য এবং কেন্দ্রীয় স্তরে ধর্মের নামে চলতে থাকা রাজনীতি নিয়েও সরব হলেন সম্পাদিকা। বললেন, একটা ধর্ম-নিরপেক্ষ দেশে নানা অছিলায় সব ধর্মীয় অনুষ্ঠানে এত উৎসাহ দেয় কেন রাজ্য সরকার? কেন এত ইমাম ভাতা, এত মৌলবী ভাতার ব্যবস্থা? এটা কি মুসলিম সমাজের ভালোর জন্য, নাকি শুধুই ইমামদের সন্তুষ্ট রাখার জন্য? খাদিজা বলেন, “২০০২ সালে, গুজরাতে দাঙ্গা লাগানো মোদী যখন ‘মুসলিম সমাজে নারীর নিরাপত্তা’ নিয়ে হঠাৎ চিন্তিত হয়ে পড়েন, তখন ভাবনা হয়’’।

চার বছর আগে ঠিক এ রকম সময় দামিনীকে প্রাণ দিতে হয়েছিল। তার পর সারা দেশ জুড়ে কতটা সুনিশ্চিত হল মেয়েদের নিরাপত্তা? তাই রাজনীতি, ধর্মান্ধতা, বিজ্ঞান-বিরোধী মন এবং মননকে নস্যাৎ করে চেতনাকে হাতিয়ার করে এগিয়ে চলার ডাক দিলেন খাদিজারা।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here