এই জমিরই একাংশে তৈরি হবে বৃদ্ধাবাস।

অর্ণব দত্ত :

বার্ধক্যে যৌনকর্মীদের বারাণসী নেই! পেশা থেকে অবসর নেওয়ার পরে যৌনকর্মীরা অনেকেই বাসস্থান নিয়ে সমস্যায় পড়েন। শেষ বয়সটুকু কোথায়, কার কাছে কাটাবেন? কেননা যৌনপল্লিতে বছরের পর বছর স্থায়ী ভাবে বসবাস করে যে সমস্ত যৌনকর্মী তাঁদের ভাতরুটির সংস্থান করেছেন, অবসরের পরে নিজেদের গ্রামে ফেরার সুযোগটুকু তাঁদের প্রায় থাকেই না। গ্রামে ফিরে বসবাস করতে গেলে তাঁদের পরিবারকে গ্রামবাসীরা একঘরে করতে পারেন।

তা হলে ওঁরা যাবেন কোথায়?

এ বার এই সমস্যা নিরসনে উদ্যোগী হয়েছে দুর্বার মহিলা সমন্বয় কমিটি। সংগঠনের তরফে বারুইপুরে কেনা চার বিঘে জমির ওপর প্রাক্তন যৌনকর্মীদের জন্য একটি বৃদ্ধাবাস তৈরির কথা ভাবা হচ্ছে। সংগঠনের মেন্টর ভারতী দে বলেছেন, “আমাদের মেয়েরা যখন পেশা থেকে সরে আসেন, তাঁদের যাওয়ার তখন কোনো জায়গা থাকে না। নতুন মেয়েদের জায়গা ছেড়ে দিয়ে অধিকাংশই পুরোনো আস্তানায় মাথা গুঁজে কোনোক্রমে পড়ে থাকেন, যে হেতু গ্রামে ফেরার উপায় নেই। একদা যৌনকর্মীকে পেশা থেকে সরে আসার পরে কলকাতা শহরেরও কোন পাড়া স্বাভাবিক ভাবে থাকতে দেবে?

ফলে যৌনকর্মীদের সম‌বায় উষা মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেডের বারুইপুরে যে নিজস্ব জমি রয়েছে, সেখানেই ২৫ থেকে ৩০জন অবসরপ্রাপ্ত যৌনকর্মীর থাকার মতো একটি বৃদ্ধাবাস তৈরির পরিকল্পনা করা হচ্ছে। সারা ভারতে তো বটেই, সারা দুনিয়াতে এ ধরনের কোনো নজির নেই বলে জানালেন ভারতীদেবী।

জানা গিয়েছে, বছর কয়েক আগেই পড়ে থাকা এই জমিতে একটি আবাসন প্রকল্প নির্মাণের কথা ভাবা হয়েছিল। প্রথম দফায় যে ক’টি ফ্ল্যাট তৈরি করা হবে, সেগুলিতে প্রাক্তন যৌনকর্মীরা থাকবেন বলে পরিকল্পনা করা হয়। পরে ওই পরিকল্পনাটি স্থগিত হয়ে যায়। এ ব্যাপারে নতুন করে চিন্তাভাবনা করতে গিয়ে দুর্বারের চিফ অ্যাডভাইসার স্মরজিৎ জানা ওই জমিতে বৃদ্ধাবাস তৈরির পরিকল্পনা দেন।

জানা গিয়েছে, বৃদ্ধাবাসে ২৫ থেকে ৩০টি কামরা থাকবে। ওই কামরাগুলি যৌনকর্মীরা স্বল্পমূল্যে কিনতে পারবেন। সহজ কিস্তিতে ও ন্যূনতম সুদে উষা মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি থেকে ঋণ নিয়ে অবসরপ্রাপ্ত ২০-৩০ জন যৌনকর্মী ওই বৃ্দ্ধাবাসে পাকাপাকি ভাবে থাকতে পারবেন।

দুর্বারের মেন্টর ভারতী দে জানিয়েছেন, তাঁদের সমবায়ের নিজস্ব ফিশারি, হ্যাচারি রয়েছে। তা ছাড়া, সমবায়ের নিজস্ব জমিতে এখন ধান-সবজিও চাষ করা হচ্ছে। যে সমস্ত বয়স্ক যৌনকর্মী বারুইপুরের ওই বৃদ্ধাবাসে থাকবেন তাঁদের জন্য অত্যন্ত সস্তায় খাবার-দাবারের ব্যবস্থা করা হবে। এ বাবদ মাসিক সামান্য টাকা তাঁদের কাছ থেকে নেওয়া হবে।

উল্লেখ্য, গত দু’দশকে এই রাজ্যের বাসিন্দা যৌনকর্মীদের মানসিকতায় উল্লেখযোগ্য পরিববর্তন এসেছে। যৌনকর্মীদের সমবায়ের ফিনান্স ডিরেক্টর শান্তনু চ্যাটার্জি জানিয়েছেন, উষা মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেডের গত বছরের টার্নওভার ২৯ কোটি। সমবায়ের বিভিন্ন স্কিমে কলকাতা-সহ দক্ষিণবঙ্গ ও উত্তরবঙ্গে বিভিন্ন যৌনপল্লির মেয়ে বাসিন্দারা নিয়মিত ভাবে টাকা জমাচ্ছেন। মেয়ে যৌনকর্মীদের লাগাতার কাউন্সেলিংয়ের ভিতর দিয়ে তাঁদের অনেক জীবনমুখী করা গিয়েছে। সঞ্চয়ের প্রয়োজনীয়তা বুঝে ছেলেমেয়ের লেখাপডা, অসুখ-বিসুখ-সহ খরচের নানা ঝড়ঝাপটা সামলাতে যৌনকর্মীরা ক্রমে সঞ্চয়ী হয়ে উঠছেন। রোজগারের পুরো টাকাটা আর মদ খেয়ে বেহিসেবি ভাবে উড়িয়ে দিয়ে নিজেদের সর্বস্বান্ত করে ফেলছেন না।

কিন্তু এখন হাতে টাকা থাকলেও যে উপায় নেই!

সমাজের মূলস্রোতের মানুষ তো একদা যৌনকর্মীকে তাঁর প্রতিবেশী হিসাবে মেনে নেওয়ার মতো মানবিকতা দেখাবেন না। ভারতীদেবী বললেন, ফলে শেষ বয়সটাও ওই যৌনপল্লিই ভরসা। কিন্তু পেশা ছাড়লে ঘর ছেড়ে দেওয়াও নিয়ম। সে ক্ষেত্রে বেশি বয়সি এই মহিলারা না ঘর কা না ঘাট কা পরিস্থিতির ভিতর গিয়ে পড়েন।

ভারতীদেবী বলেন, “সমাজের হাল তো দেখছি। এ যুগে ক’টা ছেলেপুলে তাঁদের বৃদ্ধ বাবা-মাকে দেখেন? যৌনকর্মীদের আমরা আগেভাগে সতর্ক করে দিচ্ছি, ছেলেমেয়ে বড়ো হয়ে দেখবে বলে কিন্তু একদম আশা কোরো না। তোমার নিজের জীবনে তোমায় নিজেকে গুছিয়ে নিতে হবে। না হলে পস্তাবে।”

তবে কবে নাগাদ বারুইপুরে সমবায়ের কেনা জমিতে কাজ শুরু হবে, কাজ শেষ হবে কবে – সে ব্যাপারে দুর্বারের তরফে এখনও কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি বলে জানা গিয়েছে।

বৃদ্ধাবাসটি বারুইপুরে অবস্থিত স্কুল-কলেজে পাঠরত যৌনকর্মীদের সন্তানদের হস্টেল রাহুল বিদ্যানিকেতনের লাগোয়া জায়গায় করা হচ্ছে। ভারতীদেবী বললেন, বৃদ্ধাবাসে থাকবেন ৬০ থেকে ৭০ বছর বয়সের অবসরপ্রাপ্ত যৌনকর্ম‌ীরা। ষাট-সত্তরেও তো মানুষ যথেষ্ট সচল থাকে। ওঁদের হাতে ন্যস্ত থাকবে হস্টেলের ছেলেমেয়েদের ভার। দু’পক্ষই পরস্পরের সাহচর্যে আত্মীয়তা উপভোগ করতে পারবে বলে আমাদের আশা। 

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here