জয়ন্ত মণ্ডল

সঙ্গে নিয়ে আসা আস্ত দু’প্যাকেট এক কেজি টাটা সল্ট ভক্তিভরে ‘মা গঙ্গা’য় নিক্ষেপ করলেন ভদ্রলোক। কোনো এক ‘দোষ’ কাটাতে জ্যোতিষবাবাজি এমন নিদেনই দিয়েছেন তাঁকে। তা যাই হোক, এই কর্মে তাঁর দোষ না কাটুক, গঙ্গায় লবণ ফেলে তিনি হয়তো ঘোলাটে জল প্ররিশ্রুতকরণের বিন্দুমাত্র কাজ করলেন। তবে নুন ঢালার আগেই আরও এক সাংঘাতিক কাণ্ড করেছেন তিনি। হাতের বিশালাকার একটা ব্যাগে ভরে নিয়ে আসা তিন প্লাস্টিক ক্যারিব্যাগ ভর্তি ফুল-বেলপাতা-ভস্মের ছাই ভক্তিভরেই বিসর্জন দিয়েছেন ‘সর্বপাপহারিণী’র বুকে!

একটা ছুটির দিনে ঘর-লাগোয়া আলমবাজার গঙ্গার ঘাটে গিয়ে এমন দৃশ্যই চোখে পড়ল ক’ দিন আগে। তবে এটার কারিকুরিতে অভিনবত্ব থাকলেও এমন ঘটনা অনেকের চোখেই প্রথম দেখা গঙ্গা-দূষণের কোনো ছবি নয়। সেই কবে থেকে দেখে আসা গঙ্গার দূষণরোধে স্থানীয় স্তরে নেওয়া হয়েছে হরেক উদ্যোগ। সংলগ্ন পুরসভা বসিয়েছে আবর্জনা ফেলার ঢাউস পাত্র। ঘাটের মাথায় লেগেছে সিসিটিভি ক্যামেরা। কিন্তু পুণ্য সঞ্চয়ে গঙ্গায় আবর্জনা ফেলায় দাঁড়ি পড়েনি। প্রতিবাদ করলে বরাতে জুটেছে শুধু হতাশা।

এরই মধ্যে সম্প্রতি হাতে এসেছে কেন্দ্রীয় দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের একটি তথাকথিত চাঞ্চল্যকর রিপোর্ট। গত সপ্তাহেই প্রকাশিত ওই রিপোর্ট বলা হয়েছে, গঙ্গার জল সম্পূর্ণ ভাবে সরাসরি পানের অযোগ্য। গঙ্গার দীর্ঘ যাত্রাপথে মাত্র সাতটি নির্দিষ্ট স্থানের জল পরিশোধন করে অথবা জীবাণুমুক্ত করে পান করা যেতে পারে।

এ ব্যাপারে পর্ষদ একটি মানচিত্র প্রকাশ করে বলেছে, উত্তরপ্রদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত গঙ্গার জল যেমন পানের অযোগ্য তেমনই স্নান করলেও আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থেকে যায় একাধিক রোগে।

এই রিপোর্ট পর্ষদের হাতে এসেছে গঙ্গার গতিপথে ৮৬টি স্থানে সরাসরি পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র বা লাইভ মনিটরিং স্টেশনের মাধ্যমে। তারা জানিয়েছে, এই ৮৬টি স্থানের মধ্যে ৭৮টি স্থানের জল সম্পূর্ণ ভাবে পানের অযোগ্য।

ওই রিপোর্টেই প্রকাশ, এই ৮৬টি স্থানের মধ্যে মাত্র ১৮টি জায়গায় স্নান করা যেতে পারে গঙ্গার জলে। বাকি ৬২টি স্থানের জল স্নান করার অযোগ্য। এই বিপদসংকেত থাকা স্থানগুলির মধ্যে রয়েছে পশ্চিমবঙ্গের হাওড়া-শিবপুর এবং সংলগ্ন অঞ্চল। প্রসঙ্গত, এই স্থানগুলির জলে কলিফর্ম ব্যাকটিরিয়ার উপস্থিতি মাত্রাতিরিক্ত।

রিপোর্ট যাই বলুক, সে কথা শুনছে আর কে? সূর্যোদয় থেকে মাঝরাত সমানে চলছে গঙ্গাস্নান। সঙ্গে সাবান-শ্যাম্পু-নবরত্ন তেল। শুধু কি তাই, স্থানীয় এলাকায় বসবাসকারীদের কাছে এখনও আমাদের গঙ্গা কাপড় কাচার সেরা গন্তব্য। যে গঙ্গাজলে এ ভাবেই চলছে শরীর থেকে কাপড় ঘষা, তা নিয়ে কোনো সতর্কতাবাণীই যে কাজে লাগার নয়, তা যে কোনো ঘাটে দাঁড়ালেই স্পষ্ট।

তবে মন্দের ভালো একটাই তথ্য – যে সাতটি স্থানের গঙ্গার জল জীবাণুমুক্ত করার পর পানের যোগ্য, সেই তালিকার একটি এখনও দখল করে রেখেছে ডায়মন্ড হারবার। অন্য দিকে স্নানের যোগ্য স্থানগুলির তালিকায় রয়েছে আমাদের রাজ্যের চারটি স্থান। যেগুলির মধ্যে রয়েছে হুগলির শ্রীরামপুর।

নিয়মিত গঙ্গায় স্নান করা উমেশ নামের বছর তিরিশের এক যুবককে প্রশ্ন করা হয় – তিনি কি কেন্দ্রীয় দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের রিপোর্টটার কথা শুনেছেন। তিনি এক কথায় বলেন, ‘না’। তাঁকে বলা হয়, ওই রিপোর্ট বলছে, গঙ্গার অধিকাংশ জায়গায় জল পান এবং স্নানের অযোগ্য। তিনি এ বার কিছুটা বিরক্ত হয়েই বলেন, ‘কিঁউ’?

-এই জলে রোগজীবাণু থাকে।

বিরক্তি ডিঙিয়ে তাচ্ছিল্যের সুরে উমেশ বলেন, ‘গঙ্গার জলে জীবাণু কিছু করবে না। তা ছাড়া আমি তো সাবুন মেখে স্নান করি’।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here