বাতাসে বিষ, অহর্নিশ! মৃত্যু ডাকছে যে পথে

0
সরকারি নির্দেশে, ধুলোজনিত বায়দূষণ রুখতে এ ভাবেই 'ঢাকা' দিয়ে চলছে নির্মাণকাজ।
জয়ন্ত মণ্ডল

পাশের লোকটা ঘন ঘন ধোঁয়া ছাড়ছিল সিগারেটের। অস্বস্তি, বিরক্তি নিয়ে কেটে পড়াই ভালো মনে হল দ্য ৪২-র উলটো দিকে এস-নাইনের অপেক্ষায় দাঁড়ানো আমার মতো অ-ধূমপায়ীর। এবড়ো-খেবড়ো ফুটপাতে একটু সরে দাঁড়াতেও রক্ষে নেই, সেখানেও ধোঁয়া। সিগারেটের। এ ভাবেই ধোঁয়া এড়ানোর খেলা চলতে চলতেই বিকট শব্দে ধোঁয়া উড়িয়ে চলে এল একটা লজঝড়ে বেসরকারি বাস।

পরিবেশ দিবস নিয়ে লিখতে বসা প্রতিবেদনের মুখবন্ধে এই ছোট্ট ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার অবতারণা এই কারণেই, ভারতে ধূমপানজনিত কারণে যত মানুষের মৃত্যু হয় এক বছরে, তার থেকে অনেক বেশি মানুষের জীবনদীপ নিভে যাচ্ছে বায়ু দূষণের কারণে। তাই বলে, ‘ক্যান্সারের কারণ’ ধূমপান মোটেই সাধুবাদ প্রাপ্য নয়।

সরকারি তথ্য বলছে, গত ২০১৭ সালে বায়ুদূষণ থেকে সৃষ্ট রোগের প্রকোপে পড়ে মৃত্যু হয়েছে ১২ লক্ষ ভারতবাসীর। কথা বলেছিলাম রাজ্য দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের এক কর্তাব্যক্তির সঙ্গে। বিষয়টা ছিল দুর্গাপুরে স্পঞ্জ আয়রন কারখানার দূষণ নিয়ে। তিনি পক্ষান্তরে বলেছিলেন, মালিকরা জানেন, জনবহুল এলাকা থেকে নির্দিষ্ট দূরত্বে স্পঞ্জ আয়রন কারখানা করলেও দূষণের প্রকোপে পড়বে জনজীবন। তাঁরা লাইসেন্সের আবেদন করেন। কেউ কেউ লাইসেন্সও পেয়ে যান। কিন্তু লাইসেন্স দেওয়ার পাশাপাশি কারখানার মালিকদের যে যে শর্ত মেনে চলার নির্দেশ দেওয়া হয়, পরে সে সব লাটে ওঠে।

দেশে শিল্পের আকাল। কোনো ব্যক্তি বা সংস্থা যখন গাইডলাইনে উল্লেখিত নির্দিষ্ট দূরত্বের থেকে জনবহুল এলাকায় তার থেকে কম দূরত্বে শিল্পস্থাপনের আবেদন জানান, তখন কর্তাদেরও বিষয়টা অন্য ভাবে ভাবায় বলেও তিনি জানিয়েছিলেন।

স্পঞ্জ আয়রন কারখানার ধোঁয়ায় মিশে থাকা কয়লা বা লোহার গুঁড়ো কী মারাত্মক ক্ষতিকারক হয়ে ওঠে বাতাসে মিশে, তা ভুক্তভোগী মাত্রই জানেন। তবে বিষয়টা এমন নয় যে শুধু মাত্রা স্পঞ্জ আয়রন কারখানাই বাতাসে দূষণ ছড়াচ্ছে। শহরাঞ্চলের গাড়ির ধোঁয়া তো দূষণ ছড়ানোর দৌড়ে কম যায় না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ফি বছরের রিপোর্টে উঠে আসছে সেই তথ্য।

প্রায় এক দশক আগেই সংস্থা সতর্ক করে দিয়ে বলেছিল, ভারতের রাজধানীর ভবিষ্যৎ কী হতে চলেছে। এখন প্রায়শই দিল্লির দূষণ খবরের শিরোনামে উঠে আসছে। বাদ পড়ছে না কলকাতাও। রাজ্য সরকার অবশ্য আশ্বাস দিয়ে জানিয়েছে, চলতি বছরের শীতকালের মধ্যেই মহানগরীর বায়ু দূষণ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণের মধ্যে চলে আসবে। ১৫ বছরের গাড়ি বাতিল-সহ একাধিক কার্যকর পদক্ষেপের সূত্রেই এ ধরনের ইতিবাচক আশ্বাস দিয়েছে সরকার। সঙ্গে রয়েছে শহরের ১০টি জায়গায় কার্বন ডাই অক্সাইড নিয়ন্ত্রণের জন্য বিশেষ যন্ত্র বসানোর উদ্যোগও।

তবে রাস্তায় ক্রমশ বেড়ে চলা ছোটো-বড়ো, যাত্রীবাহী-পণ্যবাহী গাড়ির সংখ্যাই শুধু নয়। রাস্তা তৈরি অথবা মেরামতে হটমিক্স প্লান্টও দূষণ ছড়াচ্ছে হুহু করে। গ্রীষ্মের এই তীব্র দাবদাহের মধ্যেই শহর কলকাতা, বিধাননগর এবং হাওড়ায় হটমিক্স ব্য়বহার করে রাস্তা তৈরির ফলে দূষণের মাত্রা ছুঁয়ে ফেলছে দিল্লিকেও।

একই সঙ্গে রয়েছে বাতাসে ধুলোর পরিমাণ বৃদ্ধি। সরকারি ভাবে উদ্যোগ নিয়ে নির্মাণ কাজগুলিকে পুরোপুরি ঢেকে করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু রাস্তার ধুলো। সভ্যতা যে পথে এগোচ্ছে, তাতে বাড়ছে রাস্তা, রাস্তা থাকলে সেখানে থাকবে খানাখন্দ, বাড়বে ধুলো। রাস্তার কোনো জায়গা থেকে পিচ-পাথর উঠে গিয়েই খন্দের সৃষ্টি। সেটাই ধুলোর উৎসস্থল। তবে রাস্তায় জল ঢেলে ধুলো নিবারণ করা সম্ভব হলেও সেটাও যথেষ্ট ব্যয়বহুল। আবার নির্মাণকাজের মতো রাস্তাকে ঢেকে ফেলা তো আর যায় না!

সব মিলিয়ে যানজটে আটকে পড়া রাস্তায় ধুলো-ধোঁয়ায় প্রাণ ওষ্ঠাগত। যে কারণে এখন অনেকেই রাস্তায় বেরোন মাস্ক পরে। কিন্তু ঘরের ভিতরেও মাস্ক পরে জীবনযাপনের দিন তা হলে কি এল বলে!

উত্তর দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here