গরু-মোষের সঙ্গে এক শিবিরে ঘরছাড়া চাষিরা : জলছবি/৫

0

খবর অনলাইন: ২১টা গরু, কিছু জামাকাপড়, সামান্য বাসন, একটা দড়ির খাটিয়া আর একটা ক্যালেন্ডার –- এই সম্বল করে চলে এসেছে ঘোলাপ পরিবার। বিডের গ্রাম থেকে পালওয়ানের এই ঝোপড়িতে। আসলে এটা ঝোপড়ি নয়, বাঁশের খুঁটি গেড়ে মাথায় তেরপল ছাওয়া। এগুলো গবাদিপশুর আশ্রয়স্থল। এখানেই রয়েছে ঘোলাপ পরিবার।

গ্রামে তিন বছর বৃষ্টি নেই। তিন একর জমিই শুখা পড়ে রয়েছে। গরু-মোষের কোনও খাদ্য নেই, কুয়োগুলো শুকনো খটখটে। বেশির ভাগ যুবক কাজের খোঁজে কাছাকাছি শহরে চলে গেছে। ঘোলাপরা তিন ভাই তাই বউদের নিয়ে চলে এসেছেন এই পালওয়ানে। সঙ্গে গরুগুলো ছিল। তাই আশ্রয় মিলেছে গবাদিপশুর খোঁয়াড়ে। স্কুলপড়ুয়া চারটে বাচ্চাকে রেখে এসেছেন তাদের দাদু-ঠাকুমার জিম্মায়। বাচ্চাগুলো অন্তত আঁতিপাঁতি করে জল জোগাড় করে আনতে পারবে, খুঁজে আনবে খাবারও। যে দুটো জিনিস এখানকার এই খোঁয়াড়ে পর্যাপ্তই পাচ্ছেন ঘোলাপরা। সবই বিনা পয়সায়, সরকার দিচ্ছে। “আমরা যদি গ্রামে ফিরে যাই, না খেতে পেয়ে মরব। এটাই এখন আমাদের বাড়ি” –- অনেকটাই যেন স্বস্তির সুর বাল ভিম ঘোলাপের গলায়।

পালওয়ানের মতো গবাদিপশুর জন্য এ রকম আশ্রয়শিবির সারা মহারাষ্ট্র জুড়ে খোলা হয়েছে সাড়ে তিনশো। এর মধ্যে পশ্চিম মহারাষ্ট্রের বিড জেলাতেই ২৬৭টি। দেশের ২৫৬টি খরাগ্রস্ত জেলার একটি বিড। এই শিবিরগুলিতে রয়েছে ২ লক্ষ ৮০ হাজার গবাদিপশু এবং তাদের মালিক হাজারখানেক চাষি পরিবার। শুধু সরকারই নয়, এ ধরনের বহু আশ্রয়শিবির খুলেছে এনজিও-রা।

আপ্পা সাহেব মাসকে, ওই খোঁয়াড়েতে ঘোলাপদেরই প্রতিবেশী। মাসকের জমিজিরেত ঘোলাপদের চেয়ে অনেক বেশি, ১৫ একর। ৩৫ বছরের মাসকে কিছু দিন আগেও ছিলেন এক সম্পন্ন চাষি। কিন্তু খরার হাত থেকে তো নিস্তার নেই কারও, সে জমি যতটাই থাক, ৩ একর বা ১৫ একর। ২০টি অনাহারী গরুকে নিয়ে তিনিও উঠেছেন পালওয়ানের এই খোঁয়াড়ে। “পাঁচটা ছেলেমেয়েকে বাড়িতে বাবা-মায়ের কাছে রেখে চলে এলাম। আমার এত জমি আছে, অথচ ফলন হয়নি এক দানাও। এখানে কী দুর্দশার মধ্যে আছি” — কপাল চাপড়াচ্ছিলেন মাসকে।

আশেপাশের ৩০টা গ্রামের মানুষজন তাঁদের গরু-মোষ-ছাগল নিয়ে এখানে এই তেরপলের আস্তানায় রয়েছেন। নিত্যদিন প্রাতঃকৃত্য সারতে হচ্ছে খোলা জায়গায়। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ। বাঁশের খুঁটি পুঁতে, মাথায় তেরপল ছেয়ে টানা শিবির বানানো হয়েছে। এ রকম সমান্তরাল সারিতে শিবির তৈরি করে আশ্রয় দেওয়া হয়েছে পশু আর মানুষদের। শিবিরগুলির মাঝে যে গলিপথ সেখানে সার দিয়ে রাখা আছে সার, পশুখাদ্য আর প্লাস্টিকের ট্যাংকে জল। ভোরবেলায় চাষিরা দুধ দুয়ে নিয়ে যাচ্ছেন কাছের বাজারে এবং তা বিক্রি করে ফিরে এসে স্নান সারছেন, গরুগুলোকে খাওয়াচ্ছেন। পাগড়ি মাথায় বয়স্করা খাটিয়ায় শুয়ে রোদে ঝলসাতে ঝলসাতে দ্বিপ্রাহরিক ঘুম দিচ্ছেন, কমবয়সিরা আশেপাশের কয়েকটি টিভি সেট ঘিরে ভিড় জমিয়েছেন, আর শিশুরা সারা চত্বর জুড়ে এলোপাথাড়ি ঘুরে বেড়াচ্ছে। গরুগুলো জাবর কাটছে। সন্ধে হতেই মশা তাড়ানোর ধুম, সাপ-বিছে বেরোচ্ছে কিনা নজর রাখা। তার পর রাতের খাওয়া যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সারা এবং শুয়ে পড়া।

চারিদিকে ধূসর গাছপালাহীন পাহাড়ে ঘেরা ৪০ একর জায়গা জুড়ে এই শিবির। রোজ ৪০ কিমি দূর থেকে ট্রাক আর ট্যাংকারে করে ৭০ হাজার টন খাবার (মানুষ ও গবাদিপশুর জন্য) এবং ২ লক্ষ লিটার জল আসে। এখানে রয়েছে ৪৩০৯টা গরু-মোষ-ছাগল, আর একটা মাত্র ঘোড়া। ঘোড়ার মালিকও রয়েছেন এই শিবিরে। গ্রামের বিয়েশাদিতে এই ঘোড়া ভাড়া দিয়ে দু’টো পয়সা রোজগার করেন তিনি। আবার সেই দিন কবে আসবে সেই প্রতীক্ষায় দিন গুনছেন।

আশ্রয় নেওয়া পরিবারগুলোর হাতে কোনও পয়সা নেই। তাই এক দিন এই  শিবিরেই গণবিবাহের আসর বসেছিল। ৪০ জোড়া যুবক-যুবতীর বিয়ে হল, একটা ছোটোখাটো খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থা হল, ছোটোখাটো উপহারও জুটল কারও কারও।

কিন্তু আশ্রয়শিবিরের এই দিন গুজরান কারও কারও জীবনে চরম হতাশাও ডেকে আনছে। ২২ বছরের বিজয় বাগলানে তিন বছর ধরে কলেজে কম্পিউটার সায়েন্স পড়েছেন। চার বছর ধরে ৫ একর জমিতে কিছুই ফলেনি। দু’ বছর আগে বাবা মারা গিয়েছেন, দুই বোনের বিয়ে হয়ে গিয়েছে। যখন তিনি চাকরির জন্য তৈরি হচ্ছিলেন তখনই ১০টা গরু নিয়ে চলে আসতে হল এই শিবিরে।

“এটা কি একটা জীবন? এই নোংরা, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ। ভেবেছিলাম একটা সরকারি চাকরি করব, মাস গেলে একটা বাঁধা রোজগার থাকবে, শান্তিতে দিন কাটাব। বৃষ্টি পড়লেই এখান থেকে চলে যাব। গরুগুলো বিক্রি করে শহরে চাকরির জন্য নিজেকে তৈরি করব। চাষির কোনও ভবিষ্যৎ নেই” – একরাশ আপসোস ঝরে পড়ছিল বাগলানের গলায়।

বাগলানের সুরেই সুর মেলালেন এখানে আশ্রয় নেওয়া বহু যুবক।

বিড জেলায় ২৭ লক্ষ মানুষের বাস, গবাদিপশুর সংখ্যা ৮ লক্ষ ৩০ হাজার। জেলার ১৪০৩টি গ্রামের অর্ধেক পর পর তিন বছর খরার কবলে। এখানকার জমি একেবারেই বৃষ্টিনির্ভর। জলের প্রধান উৎস মনজরা নদী গত বছরেই শুকিয়ে গিয়েছে। ১৪৮টি জলাশয় আর ছোট ড্যামের মধ্যে ৬০ শতাংশতেই জল নেই। গোটা জেলা জুড়ে জলের যে শ’ সাতেক ছোটোখাটো উৎস আছে তার মধ্যে শ’ তিনেকে ছিটেফোঁটা জল আছে। ব্যক্তি মালিকানাধীন বোরওয়েল আর পুকুর থেকে জল তুলে রোজ সাড়ে আটশোর মতো ট্যাংকার খরায় পোড়া গ্রামগুলোতে জল পৌঁছে দিচ্ছে। মূল চাষ তুলো আর সয়াবিন। ফলন এক দানাও হয়নি। পশুখাদ্য নেই, জল নেই। গত বছর ৩০০ চাষি আত্মঘাতী হয়েছে। এ বার জানুয়ারি থেকে মার্চের মধ্যে ৪৫ জন আত্মহত্যা করেছেন।

মহারাষ্ট্রে এই নিদারুণ খরার জন্য অনেকেই ব্যাপক হারে আখচাষকে দুষছেন। আখচাষের দরুন ভূ-জলের ভাণ্ডার ক্রমশ কমছে। রাজ্যের মোট ৪ শতাংশ জমিতে আখচাষ করা হয়, অথচ সেচের জলের দুই-তৃতীয়াংশই লাগে এই চাষে।

এ বার ভালো বর্ষার প্রতীক্ষায় রয়েছেন সকলেই। “পরিস্থিতি খুব খারাপ। প্রতিনিয়ত প্রার্থনা করছি এ বার যেন ভালো বর্ষা হয়। আশা করছি জুনের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে বুঝতে পারব, কেমন বর্ষা হবে” –- জলের জন্য ২৪ ঘণ্টা ‘ওয়র-রুম’ খুলে বসে আছেন জেলার যে শীর্ষস্থানীয় অফিসার সেই নওলকিশোর শর্মার গলায় যেন প্রকৃতিদেবীর কাছে কাতর প্রার্থনার সুর।

সৌজন্যে: বিবিসি নিউজ

------------------------------------------------
সুস্থ, নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার স্বার্থে খবর অনলাইনের পাশে থাকুন।সাবস্ক্রাইব করুন।
সুস্থ, নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার স্বার্থে খবর অনলাইনের পাশে থাকুন।সাবস্ক্রাইব করুন।
সুস্থ, নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার স্বার্থে খবর অনলাইনের পাশে থাকুন।সাবস্ক্রাইব করুন।
সুস্থ, নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার স্বার্থে খবর অনলাইনের পাশে থাকুন।সাবস্ক্রাইব করুন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.