will and hiers

ওয়েবডেস্ক: নিজের স্থাবর বা অস্থাবর সম্পত্তি যাতে যোগ্য উত্তরসূরির হাতে পৌঁছোয়, তার জন্য উইল করা মানেই তৃতীয় পক্ষ প্রস্তুত হয়ে রয়েছে তার ন্যায্য দাবি আদায়ে মামলা করার জন্য। আবার উইল না করে যাওয়া মানে মৃত্যুর পর দিন থেকেই শুরু হবে সম্পত্তির ভাগ-বাঁটোয়ারা নিয়ে আইনি লড়াই।

একটি বেসরকারি সমীক্ষক সংস্থার রিপোর্ট বলছে, ২০১৫-১৬ বর্ষে দেশের ১৭০টি জেলা আদালতে ৬৬ শতাংশ মামলা দায়ের হয়েছে শুধু মাত্র জমি এবং সম্পত্তি সংক্রান্ত বিবাদের অবসান চেয়ে। এর মধ্যে ৫২.৭ শতাংশ মামলা দায়ের হয়েছে পারিবারিক সদস্যদের বিবাদে।

তার মানে কি ধরে নিতে হবে, মৃত্যুর পূর্বে উইল করে যাওয়া নিরর্থক? মোটেই না। উইল করার আইন যখন রয়েছে, তখন তার ইতিবাচক দিকও রয়েছে। উত্তরাধিকারী নির্ঝাঞ্ঝাটে নিজের প্রাপ্য সম্পত্তির অধিকার ভোগ করতে পারেন এই ধরনের উইল মারফত।

কিন্তু সম্পত্তির মালিকের মৃত্যুর আগে করা উইলের কাজটি করতে হবে নিখুঁত ভাবে। কোনো রকমের ন্যূনতম ফাঁকফোকরও পরবর্তীকালে বিবাদের সৃষ্টি করতে পারে। শুধু আইন নয়, এর জন্য সম্পত্তির মালিকের মানবিকতা বোধেরও ছোঁয়াচ থাকার কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা। নিজের সম্পর্কে বিশ্লেষণে কোনো গাফিলতি পরবর্তী কালে আইনি লড়াইকে অনিবার্য করে তুলতে বাধ্য।

উইলের খসড়া তৈরি করার সময়, কোনো রকমের ত্রুটি রাখা‌ চলবে না। সম্পত্তি বিতরণের সময় এমন কোনো তথ্যকে এড়িয়ে যাওয়া চলবে না যাতে যোগ্য উত্তরাধিকারী ভবিষ্যতে আইনি জটিলতায় পড়তে পারেন। যে কারণে প্রাথমিক কয়েকটি বিষয় অবশ্যই মাথায় রাখা প্রয়োজন ওই খসড়া উইল রচনার সময়।

মৃত্যু তো হতেই পারে

সম্পত্তির মালিক হলেও এ কথা সহজে মাথায় আসতে চায় না যে আমার মৃত্যু হতে পারে যে কোনো মুহূর্তে। যে কারণে ওই সম্পত্তির উত্তরাধিকার নির্বাচন হয়ে থাকে গা-ছাড়া মনোভাবেই। অনেক সময় মৃত্যুর আগে সেই উইল তৈরি করা সম্ভব হয়ে ওঠে না। আবার এমন একটা সময় সেই উইল তৈরি করা হচ্ছে যখন সম্পূর্ণ ভাবে শারীরিক এবং মানসিক ভাবে সুস্থ নন সম্পত্তির মালিক। তিনি খতিয়ে দেখতে পারেন না সেই খসড়া উইল। কোনো রকমে আইনজীবী বা সাক্ষীর কথায় সায় দিয়ে স্বাক্ষর করে দ‌েওয়ার ফলে ওই সম্পত্তি নিয়ে বিবাদ শেষমেশ পৌঁছোয় আদালতে।

সুনির্দিষ্ট বণ্টন

সম্পত্তির সঠিক বণ্টনের মানসিকতার অভাব। ধরে নেওয়া যাক কারও সম্পত্তির উত্তরাধিকারী মোট পাঁচ জন। তাঁর হাতে রয়েছে এক কোটি টাকা। কিন্তু ইচ্ছা রয়েছে নাবালক ছেলে বা মেয়েটির উচ্চশিক্ষার। মৃত্যুর পর দেখা যাবে ওই এক কোটি টাকা থেকে পাঁচ জনে সমান ভাবে পাচ্ছে ২০ লক্ষ টাকা করে। নাবালক ছেলে বা মেয়ের বাড়তি প্রয়োজন হলেও উইল না করে যাওয়ায় সেও একই পরিমাণ অর্থ পাবে। সাবালকদের শিক্ষাদীক্ষায় আগেই খরচ করেছেন ওই ব্যক্তি। কিন্তু নাবালকটি সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়ে সাবালকদের মতোই সমান অর্থ পাচ্ছে।

সঠিক ভাবে খসড়া তৈরি

উইল করার সময় অবশ্যই কোনো আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। সম্ভাব্য আইনি ফাঁকফোকরগুলি থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার জন্য আইনজীবীর আবশ্যকতা রয়েছে। অনেকে অনলাইনে চালু হয়ে ব্যবস্থার সুবিধা নিয়ে থাকেন। ভালো। কিন্তু অনলাইনে সঠিক তথ্য না দেওয়া হলে খতিয়ে দেখা সম্ভব হয় না। ফলে পরবর্তীকালে বিবাদ-মামলা অনিবার্য হয়ে উঠতে পারে। নাম, ঠিকানা-সহ অন্যান্য বিবরণ যেমন নির্ভুল হতে হবে তেমনই স্বাক্ষরের বিষয়টিও অতি-স্পর্শকাতর। কোনো কোনো ক্ষেত্রে দেখা যায়, শেষবেলায় সাদা কাগজে স্বাক্ষর করে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। সে সব ক্ষেত্রে মামলা-মোকদ্দমা না হলে অবাক হতে হবে।

অস্পষ্টতা থেকে যাওয়া

অস্পষ্টতা আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। জমির ক্ষেত্রে দাগ-খতিয়ান-মৌজা নম্বর না থাকলে সেই অস্পষ্টতা প্রবল হয়ে দাঁড়ায়। আবার স্থাবর সম্পত্তির ক্ষেত্রে ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট নম্বর, লকার নম্বর, পলিসি নম্বর ইত্যাদি আনুষঙ্গিক বিষয় না উল্লেখ করলে সমূহ বিপদ। আমার সমস্ত সম্পত্তি অমুককে দিয়ে গেলাম লিখে ফেললেই কাজ শেষ নয়, উলটে অ-কাজ (আদালতে দৌড়োনো)-র শুরু হল বলে ধরে নেওয়া যেতেই পারে।

উইলের আপডেট

একবার উইল করেই যে কাজ শেষ, তেমনটাও নয়। মানুষের মৃত্যু যেমন অনিশ্চিত, তেমনই তার বেঁচে থাকার নির্দিষ্ট কোনো মেয়াদ নেই। ফলে জীবনে নানান উত্থান-পতন হতে পারে। এমনও হতে পারে, ওই উইল করার পর আবার নতুন কোনো সম্পত্তি কেনা হল। ফের সন্তানের জন্ম হল বা বিবাহ-বিচ্ছেদ হয়ে গেল। সে সব ক্ষেত্রে আগের উইলের আপডেট করাতে হবে। তার মানে এই নয়, পুরোনো উইলটি বাতিল হয়ে গেল। কিন্তু সংযোজন করানো আবশ্যক।

সঠিক নির্বাহক নিয়োগ

নির্বাহক নিয়োগ করতে গিয়ে সব থেকে বড়ো ভুল হয়ে যায়। যখন কোনো ব্যক্তি উইল করছেন তখন নির্বাহক নিয়োগের সময় তাঁর ঘনিষ্ঠ এবং বিশ্বস্ত ব্যক্তিকেই নির্বাচন করেন। কোনো নিকট আত্মীয় বা বন্ধুবান্ধবকে চয়নের সময় দেখা যায়, যিনি উইল করছেন, তাঁর বয়স আর যাঁকে নির্বাহক নিয়োগ করা হচ্ছে তাঁর বয়স প্রায় সমান। ফলে উইলকারী ব্যক্তির আগেই যদি নির্বাহক গত হন, সে ক্ষেত্রে তো জটিলতা বাড়বেই। তাই এই বয়সের বিষয়টি যতটা সম্ভব মনোযোগ দিয়ে ভাবতে হবে।

নাবালক উত্তরাধিকারীর ক্ষেত্রে

উইল করার সময় নাবালক সন্তানের অভিভাবকের কথাটি গুরুত্ব দিয়ে পর্যালোচনা করতে হবে। নাবালক উত্তরসূরির ক্ষেত্রে সম্পত্তি দেখভালের জন্য যোগ্য ব্যক্তি নির্বাচন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যদি ভবিষ্যতের জন্য নিকট কোনো অভিভাবক না পাওয়া যায়, সে ক্ষেত্রে কী করণীয় তা আইনজীবীর সঙ্গে পরামর্শ করতে হবে।

দানের ক্ষেত্রে

সন্তান বা নিকটাত্মীয়দের প্রতি তিতিবিরক্ত হয়ে অনেকেই জীবদ্দশায় নিজের সম্পত্তি দান করে দেন উইলের মাধ্যমে। এ ক্ষেত্রে সামাজিক দিকটিকে গুরুত্ব না দেওয়ার জন্য জটিলতা বাড়ে। সন্তানের মতিগতি ঠিক নয়, তারা হাতে সম্পত্তি গেলে নয়ছয় হয়ে যাবে, এমন চিন্তাও পুরো সম্পত্তি দান করে দিতে বাধ্য করে। সে ক্ষেত্রে আইনি এবং সামজিক দিকগুলি নিয়ে আইনজীবীর সঙ্গে বিশদ আলোচনা করা দরকার।

নিজের শারীরিক অবস্থা

উইলে এই বিষয়টির উল্লেখ স্পষ্ট ভাবে করা বাঞ্ছনীয়। কে, কখন, কোন পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে জীবন অতিবাহিত করবেন, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। হতে পারে গুরুতর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হতে হল। সে মুহূর্তে চিকিৎসার খরচাপাতি নিয়ে সুনির্দিষ্ট উল্লেখ করতে হবে উইলে। অর্থাৎ, চিকিৎসাধীন থাকাকালীন সম্পত্তির রক্ষণাবেক্ষণ এবং পাশাপাশি চিকিৎসার খরচ জোগানের বিষয়টি সুস্পষ্ট ভাবে উল্লেখ করতে হবে সময় থাকতেই।

দ্রষ্টব্য: উইল করানোর জন্য এই প্রতিবেদনটিই পর্যাপ্ত নয়। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here