মাত্র দু’মাসের ব্যবধান। আর তাতেই সম্পূর্ণ বদলে গেল মহারাষ্ট্রের জলছবি। জলের অভাবে ত্রাহি ত্রাহি রব উঠে গিয়েছিল রাজ্যে, বেশি জল নষ্ট হবে বলে আইপিএলের ম্যাচ মহারাষ্ট্র থেকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, জলভর্তি করে ট্রেন ছুটেছিল লাতুরে আর চাষবাসের অভাবে চাষিদের আত্মহত্যা তো লেগেই ছিল। সেই মহারাষ্ট্রে এখন জলই জল। কিছু কিছু জায়গায় জারি হয়েছে বন্যার সতর্কবার্তা। গত তিন-চার দিনে পাহাড়ি শহর মহাবালেশ্বরে বৃষ্টি হয়েছে প্রায় হাজার মিলিমিটারের কাছাকাছি। এই অতিবৃষ্টির ফলে ফুলে ওঠা নদীর স্রোতে মুম্বই-গোয়া জাতীয় সড়কের একটি সেতুও ভেঙে পড়ে। ওই ঘটনায় এখনও পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা ১৭।

অতিরিক্ত বৃষ্টির ফলে নাসিক আর পুনেতে বন্যার সতর্কতা জারি করা হয়েছে। নাসিকে গোটা আগস্ট মাসে যা বৃষ্টি হয়, এ বার আগস্টের প্রথম দু’দিনেই তার দ্বিগুণেরও বেশি বৃষ্টি হয়েছে। গোদাবরীর তীরে অবস্থিত নাসিক। গত দু’বছরের কম বৃষ্টির ফলে নদী একদম শুকিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু এ বার নিজের স্বরূপ ধারণ করেছে সে। নাসিকের কাছেই রয়েছে গঙ্গাপুর জলাধার। গত দু’বছর কম বৃষ্টির ফলে ওখানে ধরে রাখা জল আসতে আসতে শেষ হয়ে যাচ্ছিল। এমনকি এ বছর গ্রীষ্মে জলাধারের সঞ্চিত জল মাত্র ১ শতাংশে এসে ঠেকেছিল। সেই গঙ্গাপুর জলাধার এখন টইটম্বুর। এই জলাধার থেকে ছাড়া জলে প্লাবিত হয়েছে নাসিক শহরের গোদাবরী তীরবর্তী এলাকা।

একই অবস্থা পুনেতেও। শহরের জল সরবরাহের জন্য মুথা নদীর ওপর কৃত্রিম হ্রদ বানিয়ে তৈরি হয়েছে খড়গভাসলা জলাধার। গঙ্গাপুর-সহ মহারাষ্ট্রের বাকি জলাধারগুলির মতো এখানেও গরমকালে সঞ্চিত জলের মাত্রা কমে গিয়ে ভয়াবহ জায়গায় পৌঁছে গিয়েছিল। গত জুলাই থেকে চলতে থাকা বৃষ্টির ফলে এই জলাধারও এখন জলভর্তি। জলধারণের ক্ষমতা কমে আসছিল বলে জল ছাড়তে বাধ্য হয় জলাধার কর্তৃপক্ষ। এর ফলে জলাধার তীরবর্তী ও শহরের নিচু এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ জায়গায় সরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে প্রশাসন।

আবহাওয়া দফতর মহারাষ্ট্রকে বৃষ্টির তারতম্যের বিচারে চারটি ভাগে ভাগ করেছে। এর মধ্যে বর্ষায় সব থেকে বেশি বৃষ্টি, গড়ে ৩০০০ মিলিমিটার হয় উপকূল মহারাষ্ট্রে। বিদর্ভে হয় গড়ে ১০০০ মিমি, মরাঠাওয়াড়ে হয় গড়ে ৭০০ মিমি আর মধ্য মহারাষ্ট্রে হয় ৭৫০ মিমি। বিশেষত বৃষ্টিচ্ছায়া অঞ্চল হওয়ায় মধ্য মহারাষ্ট্র আর মরাঠাওয়াড়ে এত কম বৃষ্টি হয়। এ বার গোটা রাজ্যে এখনও পর্যন্ত বৃষ্টি বাড়তি। বৃহস্পতিবার পর্যন্ত উপকূলে বৃষ্টির পরিমাণ স্বাভাবিকের থেকে ২৭ শতাংশ বেশি, মধ্য মহারাষ্ট্রে ২৫ শতাংশ বেশি। মরাঠাওয়াড়ে ৩০ শতাংশ আর বিদর্ভে ৩৩ শতাংশ বেশি।

তবে বন্যার ভ্রূকুটি থাকলেও, এর মধ্যেই ভালো কিছুর আশা দেখছেন রাজ্যবাসী। রাজ্যের প্রায় সবক’টি জলাধারে এখন জল ভর্তি। সামনের বছরের গরমকাল পর্যন্ত যে আর জলকষ্টে ভুগতে হবে না এতেই আশ্বস্ত স্থানীয় মানুষ। স্বস্তিতে মুম্বইও। উপকূল মহারাষ্ট্র হওয়ায় এমনিতে বৃষ্টির কোনও অভাব হয় না মুম্বইয়ের। কিন্তু মুম্বই শহরে জল সরবরাহ করা হয় ৭টি লেক থেকে। লেকগুলো সবই বৃষ্টিছায়া মধ্য মহারাষ্ট্রে অবস্থিত। গত দু’বছর সে ভাবে বৃষ্টিও হয়নি সেখানে, তাই গরম পড়তেই জলের জন্য হাহাকার শুরু হত ভারতের বাণিজ্যনগরীতে। কিন্তু এ বার আর সেই সমস্যায় পড়তে হবে না মুম্বইকে। সাতটির মধ্যে তিনটি লেকই সম্পূর্ণ ভর্তি হয়ে গেছে আর বাকি চারটিতেও ৯০ শতাংশে পৌঁছে গেছে জলের মাত্রা।

আবহাওয়া দফতরের তরফ থেকে আগামী দু’দিন গোটা মহারাষ্ট্র জুড়েই ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির সতর্কবার্তা জারি রাখা হয়েছে। এখনও বৃষ্টি চলছে মুম্বই, পুনে-সহ রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায়। শুক্রবার সকাল সাড়ে ৮টা থেকে দুপুর আড়াইতে পর্যন্ত ১২৬ মিমি বৃষ্টি হয়েছে মুম্বইতে। জলমগ্ন গোটা শহর। এই অবস্থায় মুম্বইয়ে জল সরবরাহকারী বাকি চারটি লেকও যে সম্পূর্ণ ভাবে ভরে যাবে সেটা বলাই যায়।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here