নিজস্ব সংবাদদাতা, জলপাইগুড়ি : সক্কালবেলায় বাবুদের ছোট্টো ছোট্টো ছেলেমেয়েগুলো সেজেগুজে গাড়িতে চেপে শহরের নার্সারি স্কুলে যায়। আর তাদের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকে বনবস্তির কচিকাঁচারা, তাকিয়ে থাকে তাদের মা-বাবারাও। তাকিয়ে দেখে আশ মেটে না। কিন্তু তাদের ঘরের ছেলেদের সেই সুযোগ নেই। প্রত্যন্ত বনবস্তির বাসিন্দাদের নুন আনতে পান্তা ফুরোয় যেখানে, সেখানে সাধ থাকলেও সাধ্যি কোথায়? তাই এত দিন শুধু তাকিয়ে থাকাই সার ছিল। তবে এ বার সেই অভাব পূরণ করতে এগিয়ে এলেন বেলাকোবার বনাধিকারিক সঞ্জয় দত্ত।

দীর্ঘদিন ধরে জলপাইগুড়ির বৈকুণ্ঠপুর বন বিভাগের বেলাকোবা রেঞ্জের দায়িত্বে রয়েছেন সঞ্জয় দত্ত। মলিংগাঝোরা, মেচপাড়া, নধাবাড়ির মতো এলাকার বনবস্তিবাসীদের দুর্দশার কথা তাঁর অজানা নয়। প্রত্যেকেরই অভাবের সংসার। ছোটোখাটো কাজ করে যৎসামান্য আয়। সেখানে ছেলেমেয়েদের শহরের নার্সারি স্কুলে পাঠানোর মতো বিলাসিতা তাঁদের পক্ষে সম্ভব নয়। সন্তানদের বয়স ৬ হলে ভরসা তাঁদের সেই সরকারি স্কুল। অথচ চোখের সামনে বাবুদের সন্তানেরা আড়াই-তিন বছরেই নার্সারি স্কুলে ভর্তি হয়ে পড়াশোনায় এগিয়ে যাচ্ছে। গরিব হলে কী হবে, তাঁদেরও ইচ্ছে হয়, ঘরের ছেলেমেয়েরা ওই বাবুদের ছেলেমেয়েদের মতো জুতো-মোজা পায়ে, পিঠে ব্যাগ নিয়ে স্কুলে যাক। কথায় বলে, ইচ্ছে থাকলে তা পূরণ হয়। সেই সাহসেই ভর করে এক দিন বনবস্তিবাসীরা আবদার করে তাঁদের অতি আপনজন জঙ্গলপ্রিয় মানুষটির কাছে। কথা মনে ধরে রেঞ্জ অফিসার সঞ্জয় দত্তেরও। এতগুলো বছর যাঁদের সঙ্গে কাটিয়েছেন, তাঁদের দুঃখ তিনি ভালোই জানেন। বনের গাছপালার সঙ্গে সঙ্গে জঙ্গলের মানুষগুলিকেও ভালোবেসে ফেলেছেন তিনি। সেই ভালোবাসার তাগিদেই যেমন ভাবা, তেমন কাজ। আসরে নেমে পড়েন তিনি। তবে সব ভালো কাজের মতোই, এখানেও প্রথমে তাঁকে অনেক বাধার মুখে পড়তে হয়। যদিও শেষমেষ প্রায় অসাধ্যসাধন করলেন তিনি। নধাবাড়ি গ্রামে তৈরি হল বনবন্ধু শিশু শিক্ষা নিকেতন, যার আনুষ্ঠানিক পথ চলা শুরু হল বুধবার। রাজগঞ্জের বিধায়ক খগেশ্বর রায়, অতিরিক্ত প্রধান মুখ্য বনপাল (উত্তরবঙ্গ) এম আর বালুচ স্কুলটির উদ্বোধন করেন। আপাতত স্কুলটিতে ১০০ জন ছাত্রছাত্রী পড়তে পারবে। স্কুল তৈরিতে বহু মানুষ সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। যেমন প্রাক্তন পুর্তমন্ত্রী শংকর চক্রবর্তী দিয়েছেন নগদ টাকা, বিধায়ক খগেশ্বর রায় ছোট্টোছোট্টো ছেলেমেয়েগুলির জন্য জুতোর ব্যাবস্থা করে দিয়েছেন। স্কুলের বেঞ্চ থেকে শুরু করে পড়াশোনার অন্যান্য সামগ্রীর জন্য সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন অনেক শুভানুধ্যায়ী। একটি স্বনির্ভর গোষ্ঠীর চার তরুণী সামান্য সান্মানিকের বিনিময়ে পড়াবেন ছাত্রছাত্রীদের। স্কুলের উদ্বোধনে এসেছিলেন জলপাইগুড়ি প্রাথমিক বিদ্যালয় সংসদের সভাপতি ধর্তিমোহন রায়। তিনি আশ্বাস দিয়েছেন, স্কুলটি যাতে দ্রুত সরকারি স্বীকৃতি সহ অন্যান্য সুযোগসুবিধে পায় তা তিনি দেখবেন। সঞ্জয় দত্তর এই ব্যাক্তিগত প্রয়াসের প্রশংসা করেছেন অতিরিক্ত প্রধান বনপাল এম আর বালুচ। তিনি জানিয়েছেন, এই ধরনের উদ্যোগে বনবস্তির মানুষদের সঙ্গে বন দফতরের সম্পর্ক আরও ভালো হবে।

স্বপ্ন পূরণের পর সঞ্জয় দত্তকে মুখে কিছু বলেননি বনবস্তি বাসীরা, শুধু দু’ হাত তুলে তাঁর মঙ্গল কামনা করেছেন।

বনবস্তির বাসিন্দারা জানেন, প্রশংসার ঝুলি ভরানোর জন্য এই জঙ্গলপ্রিয় মানুষটি কোনো কাজ করেন না। ভালো কাজের জন্য বন বিভাগ থেকে পুরুস্কার পাওয়া সঞ্জয় দত্তকে ‘বনসিংহম’ নামে ডাকেন তাঁরা। শিক্ষাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে তাঁর এই পদক্ষেপ আর এক নতুন দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

নতুন স্কুল পেয়ে খুশিতে ঝলমল করে উঠেছে বনবস্তির কচিকচি মুখগুলিও। তবে তাদের আবদার ‘বনসিংহম’ কাকুকেও এই স্কুলে পড়াতে আসতে হবে। এক কথায় রাজি সঞ্জয় দত্ত। আসলে বনবস্তিবাসীদের সঙ্গে তিনিও তো স্বপ্ন দেখছেন, গুটিগুটি পায়ে হাঁটা এই কচিকাঁচাগুলোর শিক্ষার আলোয় ভবিষ্যতের অঙ্গীকার।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here