নিজস্ব সংবাদদাতা, জলপাইগুড়ি : জলপাইগুড়ি শিশুপাচার কাণ্ডে চাঞ্চল্যকর মোড়। এই প্রথম গ্রেফতার এক সরকারি আধিকারিক। গ্রেফতার এক চিকিৎসকও। আরও এক সরকারি আধিকারিককে আটক করে চলছে জেরা। গ্রেফতার করা হতে পারে তাঁকেও।

গ্রেফতার দার্জিলিং জেলার শিশু সুরক্ষা আধিকারিক মৃণাল ঘোষ। গ্রেফতার হওয়া চিকিৎসক দেবাশিস চন্দ দার্জিলিং শিশু সুরক্ষা সমিতির সদস্য। আটক জলপাইগুড়ির শিশু সুরক্ষা আধিকারিক সাস্মিতা ঘোষও। তিনি সম্পর্কে মৃণাল ঘোষের স্ত্রী। তাঁকে এর আগে এই শিশুপাচার কাণ্ডে গাফিলতির অভিযোগে শো-কজ করেছিলেন জলপাইগুড়ির জেলাশাসক রচনা ভগত। শুক্রবার বিকেল থেকে এই তিন জনকে দফায় দফায় জেরা করা হয় শিলিগুড়ির পিনটেল ভিলেজে। রাত সাড়ে ৯টা নাগাদ গ্রেফতার করা হয় দু’ জনকে। অভিযোগ, দত্তক দেওয়ার নামে যে ১৭টি শিশু বিক্রি হয়েছে চন্দনার হোম থেকে, তাতে বেশ ভালো ভাবেই জড়িত এঁরা। জানা গিয়েছে, সাস্মিতা ও মৃণাল একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থায় কাজ করার সুবাদে চন্দনা চক্রবর্তীর পুর্ব পরিচিত। বছর চারেক আগে এই দু’ জনের শিশু সুরক্ষা আধিকারিক হিসেবে চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে চন্দনা চক্রবর্তী তাঁর প্রভাব খাটিয়েছিলেন বলে খবর। চন্দনা বেশ কিছু দিন আগে মৃণাল ঘোষকে একটি দামি গাড়িও উপহার দেন বলে সূত্রের খবর। অভিযুক্ত চিকিৎসক দেবাশিস চন্দ চন্দনার হোমের প্যানেল ডাক্তার ছিলেন। শিশু দত্তক দেওয়ার ক্ষেত্রে ওই চিকিৎসকের দেওয়া ছাড়পত্র ছিল বড় হাতিয়ার। তবে এই সব তথ্য খতিয়ে দেখতে আগামী কাল এঁদের জলপাইগুড়ি আদালতে তুলে নিজেদের হেফাজতে চাইবেন তদন্তকারীরা।

এ দিকে শুক্রবার দিনভর জেরা করা হয় জুহি চৌধুরী ও চন্দনা চক্রবর্তীকে। জেরা করা হয় মানস ভৌমিক ও সোনালি মণ্ডলকেও। জুহির মোবাইলের কললিস্ট ঘেঁটে বহু তথ্য পেয়েছেন তদন্তকারীরা। উঠে এসেছে বিজেপির এক প্রভাবশালী নেত্রীর নাম, যিনি হোম চালানো এবং জুহির আত্মগোপনের ক্ষেত্রে সাহায্য করেছিলেন বলে অভিযোগ। তাঁকেও তলব করতে পারে সিআইডি।

আরও পড়ুন :

juhi-1

জুহিকে লুকিয়ে থাকতে সাহায্য করেন বিজেপির যুব মোর্চার নেতা

 

অন্য দিকে, শিশুপাচার কাণ্ডে জলপাইগুড়ি আদালতে বিচারকের সামনে গোপন জবানবন্দি দিলেন তিন জন। এঁদের মধ্যে একজন সুরেন্দ্রনারায়ণ চৌধুরী, জুহি চৌধুরীর জ্যাঠামশাই, দ্বিতীয় জন জুহির জ্যাঠতুতো দাদা সুকান্ত চৌধুরী এবং তৃতীয় জন জুহিদের পারিবারিক বন্ধু পাপিয়া চৌধুরী। নিজেদের হেফাজতে নেওয়ার পর জেরা করে সিআইডি জানতে পারে, জুহি বেশ কয়েক জনের কাছ থেকে সাড়ে চার লক্ষ টাকা নিয়েছিলেন। সেই টাকা গ্রেফতার হওয়ার আগে গিয়েছিল চন্দনা চক্রবর্তীর হাতে। এর পর তদন্তে নেমে সিআইডি জানতে পারে, কাদের অ্যাকাউন্ট মারফত এই টাকা গিয়েছিল জুহির কাছে। সেই সূত্রেই গত ২৮ ফেব্রুয়ারি এই তিন জনকে ডেকে পাঠায় তদন্তকারীরা। জেরায় টাকা দেওয়ার কথা স্বীকারও করেন সুরেন্দ্রনারায়ণ চৌধুরী ও পাপিয়া চৌধুরী। গত ১৩ ফেব্রুয়ারি ৫০ হাজার করে তিন দফায় দেড় লক্ষ টাকা জুহিকে দিয়েছিলেন সুরেন্দ্রনারায়ণ। ১৬ ফেব্রুয়ারি দু’ দফায় ১ লক্ষ করে দুই লক্ষ টাকা দিয়েছিলেন পাপিয়া দেবী। সেই টাকা হোম চালানোর জন্য গিয়েছিল চন্দনা চক্রবর্তীর হাতে। ১৮ ফেব্রুয়ারি গ্রেফতার হন চন্দনা। তবে এত বড় অঙ্কের টাকা তাঁরা কেন জুহিকে দিলেন তা পরিষ্কার নয়। তবে বাকি এক লক্ষ টাকা জুহিকে কে দিয়েছেন তার হদিশ এখনও পাননি তদন্তকারীরা। আজ বিচারকের সামনে গোপন জবানবন্দির পর আদালত থেকে বেরিয়ে সংবাদমাধ্যমের কাছে সে ভাবে কিছু বলতে চাননি তাঁরা। শুধু পাপিয়া দেবী জানিয়েছেন, ধার হিসেবেই জুহিকে টাকা দিয়েছিলেন তিনি। কী কাজে জুহি টাকা নিচ্ছেন তাঁরা তা জানতেন না। আর সুরেন্দ্রনারায়ণবাবু জানান, যা বলার আদালতেই জানিয়েছেন তিনি। তবে এঁদের এই গোপন জবানবন্দি সিআইডির অন্যতম হাতিয়ার জুহি ও চন্দনার বিরুদ্ধে। এই মামলায় এঁদের রাজসাক্ষী করা হতে পারে বলে সূত্রের খবর। সিআইডি হেফাজতের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় আগামী কাল চন্দনা চক্রবর্তী ও সোনালি মণ্ডলকে ফের জলপাইগুড়ি আদালতে তোলা হবে। আদালতে আনা হবে আজ গ্রেফতার হওয়া শিশু সুরক্ষা আধিকারিক মৃণাল ঘোষ ও দেবাশিষ চন্দকেও।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here