IMG_6453

শ্রয়ণ সেন

চির-বসন্তের শহর বেঙ্গালুরুতে এ রকম গরম! বিশ্বাস করতে পারছেন না কলেজ পড়ুয়া তরুণী কথাকলি ব্যানার্জি। তাঁর কথায় “চার বছর হল এই শহরে আছি, তারও আগে বেশ কয়েক বার এখানে এসেছি, কিন্তু কোনও দিন এত গরম দেখিনি”। প্রায় একই মত বেসরকারি সংস্থার কর্মী দেবোপম মিত্রের। “কলকাতা থেকে চাকরি নিয়ে বেঙ্গালুরুতে এসে ভাবলাম কলকাতার প্যাচপ্যাচে গরমের হাত থেকে মুক্তি পাব। কিন্তু কোথায় কী!” বলছেন দেবপম।

শুধু কথাকলি বা দেবোপম নয়, স্থানীয় বেঙ্গালুরুবাসীরা বিস্মিত! শেষ কবে এ রকম আবহাওয়া দেখেছেন কিছুতেই মনে করতে পারছেন না তাঁরা। সমুদ্রতল থেকে সাড়ে ৩ হাজার ফুট উচ্চতায় অবস্থানের জন্য গ্রীষ্মে বেঙ্গালুরুর তাপমাত্রা কখনওই ৩২-৩৩ ডিগ্রির বেশি ওঠে না, কিন্তু এ বার সেই যে ফেব্রুয়ারিতে ৩৬ ছুঁয়েছিল পারদ, তার পর থেকে তার আর নামার নাম গন্ধ নেই। গত কয়েক দিন হল শহরের কিছু অংশে ৪০ পেরিয়ে গেছে পারদ। আশ্বাসবাণী শোনায়নি আবহাওয়া দফতরও। এই মুহূর্তে রেহাই পাওয়ার কোনও সম্ভাবনাই নেই বেঙ্গালুরুবাসীর।

বেঙ্গালুরু কিন্তু ব্যতিক্রমী শহর নয়। পশ্চিম ভারতের গরম-শুষ্ক বাতাসের প্রভাবে এপ্রিলের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকেই ঝাড়খণ্ড-ওড়িশা-পশ্চিমবঙ্গে তাপমাত্রা বেড়ে আছে। এপ্রিলের ১১ তারিখ কলকাতার সর্বোচ্চ তাপামাত্রা রেকর্ড করা হয় ৪১.৩ ডিগ্রি। আপাত কম গরমের জায়গা কলকাতার যখন এই অবস্থা তখন পশ্চিমের বাঁকুড়া-পুরুলিয়া-বর্ধমান-বীরভূমের অবস্থা সহজেই অনুমেয়। বিগত দশ-এগারো দিন ধরে বাঁকুড়ার সর্বোচ্চ তাপমাত্রা থাকছে ৪৫ ডিগ্রির ওপরে। মাঝে দু-এক দিনের জন্য তাপমাত্রা একটু কমলেও এখন আবার পুরনো ফর্মে চলে এসেছে গরম। গত কাল বাঁকুড়ার তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ৪৬.৭ ডিগ্রি। উল্লেখ্য, এখন পশ্চিমবঙ্গের উষ্ণতম জায়গা বাঁকুড়াই। সকাল সাড়ে ৯টার পর রাস্তায় বেরোতে গেলে চোখ-মুখ ঢেকে বেরোতে হচ্ছে, এমনটাই জানাচ্ছেন বাঁকুড়ার আকুই গ্রামের বাসিন্দা ইন্দ্রাণী সেন। কয়েক দিন আগে উপকূলবর্তী ডায়মন্ড হারবারেও তাপমাত্রা ৪২ ডিগ্রি ছুঁয়েছিল।

ইতিমধ্যেই রেকর্ড বইয়ে নাম লিখিয়ে ফেলেছে ওড়িশার রাজধানী ভুবনেশ্বর।  তিরিশ বছরের রেকর্ড ভেঙে ১১ এপ্রিল ভুবনেশ্বরের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৪৫.৮ ডিগ্রি। বঙ্গোপসাগর থেকে মাত্র ৬০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত হওয়ার সুবাদে জলীয় বাষ্প ভরা দখিনা হাওয়াই দস্তুর ভুবনেশ্বরের, তাই স্বাভাবিক ভাবেই গ্রীষ্মের তাপমাত্রা ৩৬-৩৭ ডিগ্রির বেশি ওঠার কথা নয়। কিন্তু এ রকম আবহাওয়া দেখে হতচকিত ভুবনেশ্বরবাসী থেকে আবহাওয়াবিজ্ঞানী সবাই। এই মুহূর্তে কিছুটা তাপমাত্রা কমলেও তা ৪০-৪১ ডিগ্রির আশেপাশেই থাকছে। ভুবনেশ্বরের যখন এই অবস্থা তখন রাজ্যের পশ্চিমের জায়গাগুলির অবস্থা কী রকম ? ঝাড়সুগুদা, সম্বলপুরের তাপমাত্রা ৪৫ ডিগ্রি পেরিয়ে গেছে। তিতলাগড়ে তাপমাত্রা ৪৮ ডিগ্রি ছুঁয়ে ফেলেছে। এই মুহূর্তে দেশের উষ্ণতম জায়গা তিতলাগড়ই। এ রাজ্যে গরমের বলি হয়েছেন ৭৩ জন।

এ বার আসা যাক অন্ধ্র-তেলঙ্গানার কথায়। হায়দরাবাদের তাপমাত্রা গত দশ বছরের রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে। গত কয়েক দিন ধরেই ৪৩-৪৪ ডিগ্রির কাছাকাছি ঘোরাঘুরি করছে শহরের তাপমাত্রা। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে তীব্র জলসংকট। সব মিলিয়ে কাহিল দশা হায়দরাবাদবাসীর। তেলঙ্গানার খাম্মাম, ওয়ারাঙ্গল আর অন্ধ্রের তিরুপতি, অনন্তপুর, কুর্নুলে তাপমাত্রা ৪৫ ছুঁয়ে ফেলেছে। দুই রাজ্য মিলিয়ে গরমের বলি হয়েছেন প্রায় দেড়শো জন।

পিছিয়ে নেই তামিলনাড়ুও। রাজ্যের ১৫টি শহরের আবহাওয়ার অফিসের মধ্যে ৬টিতেই সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৪০-এর ওপর রেকর্ড করা হয়েছে। আর বাকি জায়গাগুলিতেও সর্বোচ্চ তাপমাত্রা স্বাভাবিকের থেকে ৪-৫ ডিগ্রি বেশিই থাকছে। তুলনায় ভালো অবস্থা কেরলের।

তীব্র গরমের কবলে কর্ণাটকও। শুধুমাত্র বেঙ্গালুরু নয়, রাজ্যের উপকূলবর্তী অঞ্চল ছাড়া প্রায় সব জায়গায়তেই ৪০ ডিগ্রির ওপরে রেকর্ড করা হচ্ছে তাপমাত্রা। এমনকি ঠান্ডা অঞ্চল পাহাড়ি কুর্গেও ৩২-৩৩-এর কাছে ঘোরাঘুরি করছে তাপমাত্রা। মহারাষ্ট্রের অবস্থা তুলনায় ভালো। উল্লেখ্য, গত মার্চ থেকে এ রাজ্যের বিদর্ভ আর মরাঠাওয়াড়েই মরসুমের প্রথম বারের জন্য ছড়ি ঘোরানো শুরু করেছিল রোদ্দুর। নাগপুর ঔরঙ্গাবাদে তখনই তাপমাত্রা ৪৩-৪৪ ডিগ্রি ছুঁয়ে ফেলেছিল। ওই সময়েই পরিবার আর বন্ধুদের সাথে অজন্তা-ইলোরা ঘুরতে গিয়ে গরমের দাপটে তাদের কাহিল অবস্থা হয়ে গিয়েছিল, এমনটাই জানাচ্ছেন মুম্বইয়ের অমিত দাস। এই মুহূর্তে অবশ্য তাপমাত্রা কিছুটা কমেছে।

হতবাক করা ব্যাপার হলেও এটা সত্যি, যে দেশের উত্তর ভাগে কিন্তু এখনও সে ভাবে থাবা বসাতে পারেনি গরম। এর কৃতিত্ব মূলত পরের পর বয়ে আসা পশ্চিমী ঝঞ্ঝার। পশ্চিমী ঝঞ্জার প্রভাবে মাঝেমধ্যেই বৃষ্টির কৃপা পাচ্ছে দেশের উত্তরাংশ। তবে উত্তর ভারতের সুখের দিন শেষ হতে চলেছে বলে জানাচ্ছে আবহাওয়া দফতর। দু-তিন দিন পর থেকেই ক্রমশ বাড়তে থাকবে এই অঞ্চলের তাপমাত্রা, থাবা বসাবে তাপপ্রবাহ।

কিন্তু এই গরমের পেছনে কারণ কী ?

বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ওয়ার্ল্ড ওয়েদার অর্গানাইজেশন) এই বছরের গোড়াতেই জানিয়েছিল, ২০১৬ হতে পারে উষ্ণতম বছর। এর জন্য অনেকটাই দায়ী করা হয়েছে ‘এল নিনো’-কে। ভারতীয় আবহাওয়া দফতরের অধিকর্তা লক্ষণ সিংহ রাঠোর জানাচ্ছেন, গত বছর যে ‘এল নিনো’র জন্য দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চল খরাকবলিত হয়েছিল তার প্রভাব এখনও চলছে, তাই অস্বাভাবিক হারে বেড়ে চলেছে তাপমাত্রা। তিনি জানান, আগামী মাস পর্যন্ত এর প্রভাব থাকবে। তাই গরমের দাপট মে মাসেও সমান ভাবে থাকবে বলে জানানো হয়েছে। তবে আশার কথাও শোনানো হয়েছে আবহাওয়া দফতর থেকে। জুন মাসের মধ্যে অর্থাৎ দেশে বর্ষা আসার সময়ে এই ‘এল নিনো’র প্রভাব কমে আসবে, তাই এই বর্ষায় দেশে বৃষ্টিও হবে স্বাভাবিকের অনেক বেশি।

এখন একটাই প্রার্থনা মানুষের, আবহাওয়া দফতরের এ বারের বর্ষার পূর্বাভাস যেন সত্যি হয়। মাস দেড়েক পর থেকে যেন বরুণদেবের কৃপাবর্ষণ ঝরে পড়ে বৃষ্টির জন্য চাতক হয়ে বসে থাকা দেশবাসীর ওপরে।


4 মন্তব্য

  1. lekha khub valo hoyeche.paribeshbid der vasae “L nino” kintu amra boli nirbichare paribesh dhanser janya sara deshe ei parinati.er theke mukti pabo bole mone hoye na.

  2. lekha khub valo hoyeche.paribeshbid der vasae “L nino” kintu amra boli nirbichare paribesh dhanser janya sara deshe ei parinati.er theke mukti pabo bole mone hoye na.

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here