৩৩ বছর ধরে চলছে বাহরাইন বঙ্গীয় সমাজের পুজো

0
বাহরাইন বঙ্গীয় সমাজের পুজো

পাপিয়া মিত্র

দিনটা ছিল বৃহস্পতিবার। শুক্রবার যে হেতু ছুটি তাই আগের দিনটা সকলেই খোশমেজাজে থাকে, বসে আড্ডা। কিন্তু সেই বৃহস্পতিবারের আলাপ একবারে অন্য সুরে গাওয়া হল। বাহরাইনের খামিজ অঞ্চলে মিঠুদা ও পাপিয়াদির বাড়িতে বসেছে আড্ডা। সে দিনও শুভ সরকার, স্বাতী সরকার, প্রদীপ্ত ও গোপা গুহ, আশিস মুখোপাধ্যায়, অনিল-শ্রীলেখা নাগ ও পোদ্দারবাবুরা আড্ডায় রয়েছেন। চায়ের কাপে উঠল পুজোর কথা। আর চারটে বাঙালি যেখানে এক হয় সেখানে মুখ থেকে কথা বের হতে যেটুকু সময় লাগে, এই আর কি!

কথা তো হল, কিন্তু দুর্গাপুজো করা কি চাট্টিখানি কথা? তা-ও এই বিদেশের মাটিতে? প্রচার চলল অটাম ফেস্টিভ্যাল নামে। মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়তে খুব বেশি দিন লাগল না। এগিয়ে এলেন পরিবারের মহিলারাও। সে দিনের হাত ধরে এই বছর বাহরাইন বঙ্গীয় সমাজ পুজো সমিতির দুর্গাপুজো ৩৩ বছরে পদার্পণ করল। গত বছর বিশ্ব জুড়ে কোভিডজনিত অস্বাভাবিক পরিস্থিতির জন্য পুজো বন্ধ ছিল।

তখন চলছে প্রস্তুতি।

কথা হচ্ছিল ক্লাবসদস্য সুদীপ্ত সাহার সঙ্গে। বারো বছর তিনি এই পুজোর সঙ্গে যুক্ত আছেন।  জানালেন, বর্তমানে প্রায় ১২০টি পরিবার যুক্ত আছে এই পুজোর সঙ্গে। সব বাঙালি মিলে একটা পরিবার হয়ে এই দুর্গাপুজো করে চলেছে। প্রতি পাঁচ বছর অন্তর ঠাকুর পরিবর্তন করা হয়। এ বার ঠাকুর কলকাতার কুমোরটুলি থেকে এসেছে। প্রতিমা তৈরি করেছেন অমরনাথ ঘোষ ও কৌশিক ঘোষ।

প্রশ্ন করেছিলাম প্রথম বছরের প্রতিমা সম্পর্কে। একবারে সলতে পাকানোর সময় থেকে জড়িয়ে আছেন শিল্পী শুভ সরকার, শান্তিনিকেতনের প্রাক্তনী। তিনিই জানালেন সে কথা।

মণ্ডপসজ্জার এক ঝলক।

মুখে মুখে রটে যাওয়া কথার সঙ্গে সঙ্গে ঠিক করে ফেলেছিলেন মিঠুদি, দুর্গাপ্রতিমা গড়ার কৌশল। কার্ডবোর্ডে কাটিং করে তাতে রঙের তুলি ছুঁইয়ে তৈরি হল প্রতিমা। ঘটে প্রতিষ্ঠা পেল প্রাণ। খুলে গেল আনন্দের দ্বার। সময় ১৯৮৮। পরের বছর পুজো হলেও তার পরের বছর ইরান-কুয়েতের যুদ্ধের জন্য কপালে ভাঁজ পড়ল। কিন্তু সব বাধা কেটে আবার বেলতলা তৈরি হল। আবার মন্ত্র উচ্চারণের সঙ্গে ধুনুচির ধোঁয়া উঠল।

সব তো এগিয়ে চলেছে কিন্তু উৎসব হবে কোথায়? শেখ মুহম্মদ নামে এক প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তির সাহায্যে তাঁর নামাঙ্কিত হলে পুজো হল। সেই প্রথম বারের পুজো যেন আজও চোখে ভাসে। বাহরাইনে সব ধরনের উৎসবই অনুষ্ঠিত হয় কেবলমাত্র ঘেরা জায়গায়। 

এ বারের দুর্গাপ্রতিমা।

এক বছর কাগজ কেটে প্রতিমা বানানো হল, তো পরের বছর শোলাতে। এক বছর তো কলকাতার শিল্পী বুদ্ধদেব দত্তরায় মাটির প্রতিমা তৈরি করেছিলেন। প্রতিমার রকমফেরের সঙ্গে জায়গা বদল হয়েছে বেশ কয়েক বার। কোনো বার কেরালা সমাজ তো কোনো বছর গুজরাতি সমাজের হলে। বছর গড়ানোর পাশাপাশি বাহরাইন বঙ্গীয় সমাজ পুজো সমিতি সরকারের কাছ থেকে অনুমোদন পায়। গত পাঁচ বছর হল নির্দিষ্ট ব্যাঙ্কোয়েট হল ভাড়া নিয়ে সেখানে পুজোর দিনগুলো কাটানো হয়। সকলে হাত লাগান মণ্ডপ সজ্জায়। সদস্যরা ঢাক যেমন বাজান তেমন কাঁসরও বাজান। 

কর্মসূত্রে থাকা মানুষগুলো শিকড়ের স্বাদ আস্বাদনের জন্য নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করে থাকেন। ধুনুচি নাচের পাশাপাশি শঙ্খধ্বনি, উলুধ্বনি, নাচ-গান হয়ে থাকে।

এঁরাই ঢাক বাজান, এঁরাই বাজান কাঁসর।

আর বাঙালি যেখানে, সেখানে খাওয়া থাকবে না, তা-ই হয় নাকি? তাই পুজোর ক’টা দিন রান্নাঘর বন্ধ। লাবড়া, খিচুড়ি, জিলিপি, পোলাও, আলুর দম, আমের চাটনি, নারকেল দিয়ে ছোলার ডাল, গোলাপজাম মিষ্টি সহ নানা দেশীয় খাবারের আয়োজন থাকে। সেইমতো রান্নার লোককে শিখিয়ে পড়িয়ে নেওয়া হয়। 

২০২০-তে করোনা আবহে পুজো হয়নি। এই বছর বাড়তি আনন্দ মনে থাকলেও কঠিন নিয়মে বাঁধা আছে উৎসব। সমস্ত রকম নিয়ম মেনে চলছে পশ্চিম এশিয়ার বাহরাইন বঙ্গীয় সমাজের অটাম ফেস্টিভ্যাল।

ছবি: সৌজন্যে বাহরাইন বঙ্গীয় সমাজ পূজা সমিতি।

আরও পড়তে পারেন

পটলডাঙার বসুমল্লিক বাড়ির পুজোর এ বার ১৯১ বছর

অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শিল্পকলায় সেজে উঠেছে জয়নগরের ১২৯টি পুজো মণ্ডপ

বড়িশা ক্লাবে এ বার ‘ভাগের মা’

হীরকজয়ন্তী বর্ষে লাইব্রেরি বানিয়ে বাবুবাগান শ্রদ্ধা জানাচ্ছে বাংলার মনীষীদের

দুর্গাপুজোর মণ্ডপসজ্জায় ‘রাজনৈতিক ইস্যু’, পুজো কমিটিকে আইনি নোটিশ

নোটিশ পেয়েও জুতো সরাতে নারাজ পুজো কমিটি, আইনি পথেই জবাব

অক্সিজেন প্রকল্প যে কত জরুরি সেই ভাবনাই তুলে ধরা হচ্ছে ৫৬তম বর্ষে তেলেঙ্গাবাগানের পুজোয়

পশ্চিম পুটিয়ারির পল্লি উন্নয়ন সমিতির পুজোয় এ বার ৬০০ বছরের প্রাচীন সৌরা চিত্রকলা

খবরের সব আপডেট পড়ুন খবর অনলাইনে। লাইক করুন আমাদের ফেসবুক পেজ। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল

বিজ্ঞাপন