দেখতে দেখতে বছর ঘুরে গেল। আর মাত্র ক’টা দিন। পড়বে নতুন বছর। ২০১৬ জন্য সারা বিশ্বের জন্য কী বার্তা নিয়ে এসেছিল এক বার ফিরে দেখা যাক।

donald-trump

১) নয়া মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প

নিঃসন্দেহে বছরের সব থেকে আলোচিত বিষয় ছিল মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। বছরের শুরু থেকেই বিভিন্ন প্রচারসভায় একে অপরের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ইস্যুতে তোপ দাগছিলেন ট্রাম্প-হিলারি। একটু বেশিই আগ্রাসী ছিলেন ট্রাম্প। তাঁর বক্তব্য অনেক সময় শালীনতার মাত্রাও ছাড়িয়েছে। মুসলমান-বিরোধী, সমকামী-বিরোধী এবং নারী-বিরোধী মন্তব্য করে বারবার বিতর্ক বাড়িয়েছেন রিপাবলিকান এই চরম দক্ষিণপন্থী প্রার্থী। নির্বাচনের দিন পর্যন্ত বিশেষজ্ঞ মহলের ধারণা ছিল, প্রেসিডেন্ট  নির্বাচনে হেরেই যাবেন ট্রাম্প। ৮ নভেম্বরের ভোটে কিন্তু সব হিসেব উল্টে দিয়ে মার্কিন মসনদ দখল করেন এই মার্কিন ব্যবসায়ী। তবে মার্কিন নাগরিকদের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে নয়, এ ইলেক্টোরাল কলেজের ভোটেই জিতেছেন ট্রাম্প। তাঁর জয়ের পর নজিরবিহীন বিক্ষোভে উত্তাল হয়েছে মার্কিন মুলুক। ট্রাম্প-বিরোধী বিক্ষোভ হয়েছে পড়শি কানাডাতেও।       

               theresa-may     

২) ‘ব্রেক্সিট’ এবং নয়া ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী  

বছরের সব থেকে আলোচ্য বিষয় যদি মার্কিন প্রেসিডেন্ট হয়, তা হলে দ্বিতীয় আলোচ্য বিষয় নিঃসন্দেহে ‘ব্রেক্সিট’, অর্থাৎ ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) থেকে ব্রিটেনের বিদায়। ইইউ-তে থাকার আর কোনো প্রয়োজন নেই, এমন দাবি উঠছিল ব্রিটেনের বিভিন্ন মহল থেকে। এই সব দাবির কথা মাথায় রেখে গণভোটে রাজি হন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন। ২৩ জুন গণভোট অনুষ্ঠিত হয় ব্রিটেনে। ভোটের রায়ে দেখা যায় ৫২ শতাংশ ব্রিটিশ নাগরিক ইইউ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পক্ষে রায় দেন। বাকি ৪৮ শতাংশ মানুষের ইইউ-তে থেকে যাওয়ারই মত ছিল। প্রধানমন্ত্রী ক্যামেরন ইইউ-তে থেকে যাওয়ার পক্ষে ছিলেন। তাই গণভোটের রায়ের পর প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে ইস্তফা দেন তিনি। নতুন প্রধানমন্ত্রী হন থেরেসা মে।

turket

৩) তুরস্কে ব্যর্থ অভ্যুথান

বছরের সব থেকে রক্তক্ষয়ী ঘটনা কিন্তু কোনো জঙ্গি হামলা নয়। ১৫ জুলাই তুরস্ক সেনার একাংশ দেশের সরকারের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থানের চেষ্টা করে। রাজধানী আঙ্কারার বিভিন্ন সরকারি দফতর, পার্লামেন্ট, রাষ্ট্রপতি ভবন দখলে নেওয়ার চেষ্টা করে অভ্যুথানকারীরা। কিন্তু সরকারপন্থী বাহিনীর সঙ্গে লড়াইয়ে হার স্বীকার করে নেয় তারা। ঘটনায় মৃত্যু হয় ৩০০ জনের, আহত হন ২১০০। ১০,০০০ জওয়ান, ২৫৭৫ বিচারক-সহ ৪০,০০০ জনকে গ্রেফতার করে সরকার। অভ্যুথানকারীদের দাবি ছিল প্রেসিডেন্ট এর্দোগানের আমলে তুরস্কের অসাম্প্রদায়িক ভাবমূর্তিতে পচন ধরেছে, লোপ পাচ্ছে মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার।   

dhaka

৪) ঢাকায় জঙ্গি হামলা

বাংলাদেশের ইতিহাসে সব থেকে বড়ো জঙ্গি হামলা। ১ জুলাই সন্ধ্যায় ঢাকার অভিজাত এলাকা গুলশনে হোলি আর্টিসান বেকারিতে হামলা চালায় পাঁচ জন জঙ্গি। মৃত্যু হয় কুড়ি জন পণবন্দি-সহ ২৪ জনের, যার মধ্যে অধিকাংশই বিদেশি নাগরিক। পরের দিন ভোরে নিরাপত্তারক্ষীদের গুলিতে মৃত্যু হয় সব জঙ্গির। এই ঘটনার পাঁচ দিন পর ঈদের দিন বাংলাদেশের সব থেকে বড়ো ঈদের জমায়েতে ফের হামলা চালানোর চেষ্টা করে জঙ্গিরা। তবে এই ঘটনার পরই জঙ্গিদের বিরুদ্ধে জোরদার অভিযানে নামে বাংলাদেশ সরকার। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে গোপন ডেরায় লুকিয়ে থাকা জঙ্গিদের খুঁজে বার করে মারা হয়। ২৪ ডিসেম্বর জঙ্গি দমনে আরও বড়ো সাফল্য আসে বাংলাদেশের।  

istanbul-blast

৫) আইসিস হানায় ত্রস্ত বিশ্ব

গত বছরের প্যারিসে জঙ্গি হামলার ভয়াবহ স্মৃতি ভুলে ক্রমশ ছন্দে ফিরতে শুরু করেছিল ফ্রান্স। ১৪ জুলাই বাস্তিল দিবস উপলক্ষে নিসের সমুদ্র তীরে জমায়েত হয়েছিল সাধারণ মানুষ। কিন্তু তাল কাটল আনন্দে। ভিড়ের মধ্যে দিয়ে মানুষকে পিষে দিয়ে চলে যায় বিস্ফোরক ভর্তি ট্রাক। নিহত হন অন্তত ৮৬ জন, আহত আরও ৪৩৪। পুলিশের সঙ্গে গুলি বিনিময়ে মৃত্যু হয় তুনিসিয়ার বাসিন্দা ওই ট্রাকচালকের। ঘটনার দায় স্বীকার করে আইসিস। শুধু নিসেই নয়, এ বছর আরও বেশ কয়েকটি জঙ্গি হামলার ঘটনা ঘটে। মার্চে পরপর তিনটে বিস্ফোরণে কেঁপে ওঠে বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলস। মৃত্যু হয় ৩২ জনের। জানুয়ারিতে ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তায় জঙ্গি হামলা হয়। শহরের বিভিন্ন প্রান্তে বিস্ফোরণে মৃত্যু হয় চার জনের। তুরস্কের ইস্তানবুলে আতাতুর্ক বিমানবন্দরে জঙ্গি হামলার ঘটনায় মৃত্যু হয় ৪৫ জনের। বছরের একদম শেষ মুহূর্তে বার্লিনে বড়োদিন বাজারে জঙ্গি হামলায় মৃত্যু হয় ১২ জনের। সব ঘটনার দায় স্বীকার করে আইসিস।  

syria-blast

৬) আলেপ্পো পুনর্দখল এবং রুশ রাষ্ট্রদূত খুন

বিদ্রোহীদের হাতে থাকা সিরিয়ার আলেপ্পো দখল করল প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের বাহিনী। শেষ হল চার বছর ধরে চলা আলেপ্পোর যুদ্ধ। সিরিয়া এবং রাশিয়ার যৌথ হামলায় ক্রমশ কোণঠাসা হয় বিদ্রোহীরা। শেষে বিদ্রোহীরা সবাই আত্মসমর্পণ করতে রাজি হাওয়ায় শেষ হয় যুদ্ধ। সিরিয়া সরকারের কাছে এটা একটা বিরাট সাফল্য হলেও বারবার মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে সিরিয়া আর রাশিয়ার বাহিনীর বিরুদ্ধে। বিদ্রোহীদের এবং সরকারের যুদ্ধের মধ্যে পড়ে সাধারণ নিরপরাধ আলেপ্পোর বাসিন্দারাও যথেষ্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। সিরিয়ার বিমান হানায় ধ্বংস হয় হাসপাতালও। ১৯ ডিসেম্বর, তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারায় আততায়ীর গুলিতে খুন হন রুশ রাষ্ট্রদূত। আলেপ্পোতে রুশ-সিরিয়ার যৌথ বিমানহানার প্রতিবাদেই তাঁকে খুন করা হল বলে দাবি করে ওই আততায়ী।

bob-dylan

৭)  নোবেল পেলেন বব ডিলান

সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেলেন বব ডিলান। ‘মার্কিন সংগীতের ধারায় নতুন কাব্যিক প্রকাশ নিয়ে আসার’ জন্য তাঁকে এই সম্মান, জানায় সুইডেনের নোবেল কমিটি। নোবেল পুরস্কার প্রাপক হিসাবে ১৩ অক্টোবর ডিলানের নাম ঘোষণা হওয়ার পর বেশ কিছু দিন চুপচাপ ছিলেন ‘ব্লোয়িং ইন দ্য উইন্ড’-এর স্রষ্টা। তার নীরবতায় অসন্তুষ্ট হয়ে তাঁকে ‘অভদ্র ও উদ্ধত’ বলে দেন নোবেল অ্যাকাডেমির এক সদস্য। কিছু দিন পর নোবেল প্রসঙ্গে মুখ খুললেও সময়াভাবে পুরস্কার নিতে জাননি ডিলান।

castro

৮) চলে গেলেন ফিদেল কাস্ত্রো

২৬ নভেম্বর মৃত্যু হল বিশ্বের বামপন্থী রাজনীতির সব থেকে বড়ো জীবন্ত মুখ ফিদেল কাস্ত্রোর। বয়স হয়েছিল ৯০ বছর। কিউবা বিপ্লবের এই মহানায়ক প্রায় ৫০ বছর দেশের রাষ্ট্রনেতা ছিলেন। ২০০৮-এ ভাই রাউলকে দায়িত্ব দিয়ে প্রেসিডেন্ট পদ থেকে অবসর নেন তিনি। এ বছর এপ্রিলে পার্টি কংগ্রেসে শেষ বারের জন্য সর্বসমক্ষে এসেছিলেন কাস্ত্রো। তাঁর মৃত্যুতে শোকপ্রকাশ করেন গোটা বিশ্বের তাবড় তাবড় রাজনীতিকরা।

cohen

৯) লিওনার্দ কোহেন প্রয়াত  

৭ নভেম্বর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন ‘হাল্লেলুজা’ খ্যাত লিওনার্দ কোহেন। কানাডানিবাসী কোহেন ছিলেন একাধারে গায়ক, কবি, লেখক এবং চিত্রশিল্পী। অক্টোবরে নিজের ১৪তম গানের অ্যালবাম প্রকাশিত হওয়ার পর সাংবাদিকদের বলেছিলেন, তিনি মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত। তাঁর কয়েকদিন পরই চলে যান ৮২ বছরের কোহেন।

george-michael

১০) ব্রিটিশ পপ গায়ক জর্জ মাইকেল প্রয়াত

তাঁর কণ্ঠে বিখ্যাত ‘ল্যাস্ট ক্রিসমাস আই গেভ ইউ মাই হার্ট’। এ বছরের বড়োদিন সত্যি সত্যিই ‘লাস্ট ক্রিসমাস’ হল জর্জ মাইকেলের কাছে। বড়োদিনের রাতে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ঘুমের মধ্যেই চলে গেলেন ব্রিটিশ এই পপ গায়ক। বয়স হয়েছিল ৫৩। তাঁর মৃত্যুতে শোকস্তব্ধ সারা বিশ্বের সাংস্কৃতিক জগত। 

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here