brazil world cup

রিও দে জেনেরিও: খেলা শুরু হওয়ার ঘণ্টা দুয়েক আগে থেকেই শহরের বিভিন্ন জায়গায় জলসা শুরু হয়ে গিয়েছিল। তৈরি রাখা হয়েছিল আতসবাজি। বেলজিয়ামকে হারিয়ে সেমিফাইনালে উঠে পড়লেই পোড়ানো শুরু হত। কিন্তু হায়, হল না। এ বারও হল না। গত চারটে বিশ্বকাপের মধ্যে এই নিয়ে তিন বার কোয়ার্টার ফাইনালেই বিদায় নিতে হল ব্রাজিলকে।

ম্যাচ শুরুর সময়ে মানুষের মধ্যে যে উন্মাদনা ছিল, প্রথমে ফার্নান্ডিনহোর আত্মঘাতী এবং পরে কেভিন ডি ব্রুইনের দুর্ধর্ষ গোলে শ্মশানের শান্তি গ্রাস করে গোটা দেশকে।

বিশ্বকাপ তো সব সময় জিততে চায় ব্রাজিল। কিন্তু এ বার বাড়তি কোনো উন্মাদনা ছিল না। দেশে রাজনৈতিক মেরুকরণ, মন্দা বাজার, জনপ্রিয় বামপন্থী নেতার কারাবাস এবং চরম দক্ষিণপন্থী এক নেতার প্রেসিডেন্ট পদে বসার জন্য ডাক। এই সব রাজনৈতিক পরিস্থিতি থেকে ভুলে থাকতে এই কাপকেই সম্বল করতে চেয়েছিল ব্রাজিল।

২০১৪ সালে জার্মানির কাছে ৭-১-এ হারের পর দেশে যে পরিস্থিতি ছিল, এ বার সেটা ভিন্ন। সে বার মানুষ রাগে, দুঃখে, জ্বালায় ভরে গিয়েছিলেন, কিন্তু কোনো ভয় ছিল না। কিন্তু এ বার রাগ দুঃখ নেই রয়েছে ভয়। দেশের ভবিষ্যতের ভয়।

রিও বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের এক অধ্যাপক নিজের ফেসবুকে পোস্টে লেখেন, “আত্মঘাতী গোলে ব্রাজিল বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে যাচ্ছে। এটা যেন ব্রাজিলের বর্তমান পরিস্থিতিকেই তুলে ধরছে।” এক সরকারি কর্মচারী মার্কোস কর্দিলিনহো বলেন, “খুব খারাপ লাগছে। ব্রাজিলের যতটা ভালো খেলা উচিত ছিল, সেটা খেলেনি।”

পাঁচ বার বিশ্বকাপ জিতেছে ব্রাজিল। কিন্তু সাম্প্রতিক ইতিহাসে টুর্নামেন্টের সঙ্গে ব্রাজিলের সম্পর্ক যেন ক্রমশ শীতল হয়ে যাচ্ছে।

২০১৪-তে ব্রাজিলে বিশ্বকাপ আয়োজিত হয়। কিন্তু রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের ছবিটা তার আগের বছর থেকেই পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল। দুর্নীতি এবং স্টেডিয়াম তৈরিতে আর্থিক অনিয়মের বিরোধিতা করে পথে নামে মানুষ। সামাজিক এবং আর্থিক উন্নয়নে যে দেশটা প্রথম সারিতেই ছিল, তার আর্থিক অবস্থা ক্রমশ ভেঙে পড়তে শুরু করে।

তার পর থেকে আর কিছুই ঠিক পথে চলেনি, কোটি কোটি টাকার দুর্নীতি, জিকা ভাইরাস, অপরাধ বেড়ে যাওয়া, রিও শহরে ছোটোখাটো সেনা অভ্যুথান, প্রেসিডেন্ট ডিলমা রুসেফের বিরুদ্ধে ইম্পিচমেন্ট এবং পরবর্তীকালে তাঁর আসনে এক অতি দক্ষিণপন্থী মিচেল টেমেরের বসে পড়া।

এই সবের মধ্যে এ বার বিশ্বকাপ নিয়ে ব্রাজিলের উন্মাদনা যেন একটু কম ছিল। বিশ্বকাপের শুরুর দিকে মানুষের মধ্যে অন্য বারের আগ্রহটাও দেখা যায়নি। কিন্তু দল যখন কোয়ার্টার ফাইনালে উঠল, তখন বদলে গেল ছবিটা। আবার স্বপ্ন দেখা শুরু করল ব্রাজিল।

ব্রাজিলের বর্তমান পরিস্থিতিটা যেন রিও-এর জায়ান্ট স্ক্রিনেও ফুটে উঠেছিল, যখন জাতীয় সংগীত শুরুর সময়েই বিগড়ে যায় সেটি। স্ক্রিনের সামনে ভিড় করা মানুষ কোনো প্রতিবাদ করেনি, প্রতিবাদের শব্দ যে ছিল না। বরং স্ক্রিনের পাশে একটা ছোটো টিভিতেই চোখ রাখছিল সবাই। দ্বিতীয় অর্ধে স্ক্রিন যখন ঠিক হল, তখন ব্রাজিলের বিশ্বকাপ ভবিষ্যৎ অনেকটাই ঠিক হয়ে গিয়েছে।

শেষ বাঁশি বাজার পর, পুরো রিও শহর চুপচাপ হয়ে যায়। কিন্তু কোনো রাগ, দুঃখ মানুষের মধ্যে ছিল না। কারণ যে সে সবের ঊর্ধ্বে উঠে গিয়েছে। জুলিয়া মেয়ার নামক এক তরুণী বলেন, “না, আর ফুটবল নিয়ে ভাবলে চলবে না। এ বার স্বাস্থ্য এবং শিক্ষার দিকেও ভাবতে হবে। সংগ্রাম চলছে।”

সৌজন্য: দ্য গার্ডিয়ান

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here