কিয়েভে গুলিতে খুন প্রাক্তন রুশ কমিউনিস্ট নেতা

0
266

মস্কো: রহস্যজনক ভাবে মৃত্যু হল আরেক পুতিন-সমালোচকের। বৃহস্পতিবার ইউক্রেনের কিয়েভে গুলি করে মারা হল রুশ কমিউনিস্ট পার্টির প্রাক্তন নেতা ডেনিস ভোরোনেনকভকে। ২০১৬-য় ইউক্রেনে পালিয়ে যাওয়ার পর থেকে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের তীব্র সমালোচক হয়ে উঠছিলেন ভোরোনেনকভ। তাঁর খুন হওয়ার ঘটনাকে ‘রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস’ বলে মন্তব্য করেছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট পেত্রো পোরোশেঙ্কো। ইউক্রেনের এই অভিযোগ নস্যাৎ করেছেন পুতিনের মুখপাত্র। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে অভিযোগ উঠছে যে, যাঁরাই পুতিনের গভীর সমালোচনা করেছেন, তাঁদের অনেকেরই পরিণতি ভোরোনেনকভের মতোই হয়েছে।

ওয়াশিংটন পোস্ট-এর মস্কো চিফ ডেভিড ফিলিপভ পুতিনের কয়েক জন সমালোচকের তালিকা করেছেন যাঁরা হয় খুন হয়েছেন কিংবা রহস্যজনক ভাবে নিখোঁজ। তবে তিনি পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন, এ সবের পিছনে পুতিনের হাত আছে, এমন কথা বলা যায় না। বরং কয়েকটি ক্ষেত্রে পুতিন বেশ ক্ষুব্ধ হয়েছেন, তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন, যদিও দোষী ধরা পড়েনি।

ফিলিপভের তালিকায় এক বার চোখ বোলানো যাক।  

বরিস নেমত্‌সভ ২০১৫

সোভিয়েত ইউনিয়নের পরবর্তী সময়ে নতুন রাশিয়ার ‘নতুন নেতা’ হিসেবে দেখা হত নেমত্‌সভকে। বরিস ইয়েলৎসিন গদি ছাড়ার পর ২০০০ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে সেই পদের অন্যতম দাবিদারও ছিলেন তিনি। কিন্তু তাঁর বদলে প্রেসিডেন্ট হন পুতিন। পুতিনের প্রেসিডেন্ট হওয়াকে জনসমক্ষে সমর্থন করেছিলেন নেমত্‌সভ। কিন্তু ধীরে ধীরে পুতিনের নীতির অন্যতম সমালোচক হয়ে ওঠেন তিনি। ২০১১-তে রাশিয়ায় পার্লামেন্ট নির্বাচনের সময়ে দুর্নীতির অভিযোগে সরব হয়েছিলেন নেমস্তভ। পথে নেমে বিক্ষোভও দেখিয়েছিলেন। এর পরই পুতিনের সরকার বিরোধীদের গ্রেফতার করা শুরু করে, বাদ যাননি নেমত্‌সভও। ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযানের বিরুদ্ধে ২০১৫-এর ফেব্রুয়ারিতে ফের পথে নামেন তিনি। এর পরেই রুশ প্রেসিডেন্টের বাসভবন ‘ক্রেমলিন’-এর অদূরে আততায়ীর গুলিতে নিহত হন। নেমত্‌সভের খুনের তদন্তে ‘ব্যাক্তিগত উৎসাহ’ দেখান পুতিন। কিন্তু এখনও পর্যন্ত তাঁর খুনিরা অধরাই থেকে গেছে।

বরিস বেরেজোভস্কি ২০১৩

ক্ষমতার শীর্ষে পুতিনের আরোহণের ক্ষেত্রে বড়ো রকম হাত ছিল বেরেজোভস্কির। ভেবেছিলেন, পুতিন ক্ষমতায় থাকলে তিনি ছড়ি ঘোরাতে পারবেন। কিন্তু তা হল না। পুতিনের সঙ্গে দূরত্ব বাড়ল, চলে গেলেন ব্রিটেনে। শপথ করেন, ক্ষমতা থেকে হটাবেন পুতিনকে। ক্রেমলিনের ষড়যন্ত্রেই আলেকজান্ডার লিৎভিনেঙ্কো খুন হয়েছেন, এই অভিযোগ করেন বেরেজোভস্কি। ব্রিটেনে তাঁর বাড়ির তালা লাগানো বাথরুমে তাঁকে এক দিন মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। গলায় ফাঁস লাগানো। মনে হবে আত্মহত্যা। কিন্তু করোনারের অফিস তাঁর মৃত্যুর কারণ নির্ণয় করতে পারেনি।    

স্তানিস্লাভ মার্কেলভ এবং আনাস্তাসিয়া বাবুরোভা ২০০৯

চেচেন নাগরিকদের ওপর রুশ সেনা অনেক অত্যাচার চালিয়েছে বলে অভিযোগ। সেই সব মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় চেচেন নাগরিকদের জন্য লড়েছেন পেশায় আইনজীবী মার্কেলভ। ২০০৯-এ ক্রেমলিনের সামনেই আততায়ীর গুলিতে নিহত হন তিনি। তাঁকে সাহায্যে এগিয়ে এসেছিলেন পেশায় সাংবাদিক বাবুরোভা। গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে যান তিনিও। রাশিয়ান কর্তৃপক্ষ বলেছিল, একটি নিও-নাৎসি গোষ্ঠী এই খুনের জন্য দায়ী। ওই গোষ্ঠীর দুই সদস্য দণ্ডিত হয়।  

সের্গেই মাগনিৎস্কি ২০০৯

আয়কর-দুর্নীতি বিষয়ে ব্রিটিশ-মার্কিন ব্যবসায়ী উইলিয়াম ব্রওডারের হয়ে তদন্ত করছিলেন আইনজীবী মাগনেৎস্কি। আয়কর-দুর্নীতিতে রুশ পুলিশ-যোগের কথা ফাঁস করেছিলেন তিনি। এর পরই তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। ২০০৯-এর নভেম্বরে পুলিশ হেফাজতে মৃত্যু হয় তাঁর। অভিযোগ, পুলিশি অত্যাচার এবং তার পর চিকিৎসা পরিষেবা না পাওয়ায় মৃত্যু হয় মাগনেৎস্কির।

নাতালিয়া এস্তেমিরোভা ২০০৯

চেচেনিয়া প্রদেশে ইসলামিক জঙ্গিদের দমনে নেমেছিল রুশ সেনা। কিন্তু জঙ্গি দমনের নামে প্রদেশের সাধারণ নাগরিকদের ওপর অত্যাচার চালানো হত। অনেকটা ছত্তীশগঢ়ের বস্তারে মাওবাদী দমন বা শ্রীলঙ্কায় এলটিটিই জঙ্গি দমনে ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ওঠা অত্যাচারের অভিযোগের মতোই। চেচেন প্রদেশের নাগরিকদের ওপর অত্যাচারের কথাই রিপোর্ট করতেন পেশায় সাংবাদিক নাতালিয়া। ২০০৯-এ নিজের বাড়ি থেকেই অপহৃত হন তিনি। কিছুক্ষণ পরেই বাড়ির কাছের জঙ্গলে তাঁর দেহ পাওয়া যায়। গুলিতে ক্ষতবিক্ষত হয়ে গিয়েছে দেহ। এখনও পর্যন্ত ওই ঘটনার অভিযুক্তরা অধরা।

অ্যানা পোলিতকভস্কায়া ২০০৬

রুশ সংবাদপত্র ‘নোভায়া গাজেতা’য় সাংবাদিকতা করতেন অ্যানা। পুতিনের শাসনে রাশিয়াকে ‘পুলিশ রাষ্ট্র’ তৈরি করা হয়েছে, নিজের বই ‘পুতিন’স রাশিয়া’-এ এই অভিযোগ করেছিলেন অ্যানা। চেচেন প্রদেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাও ফুটে উঠত তাঁর কলমে। ২০০৬-এ নিজের বাড়িতে খুন হন অ্যানা। তদন্তে দেখা যায় তাঁকে খুন করার জন্য টাকা পেয়েছিল খুনিরা। কিন্তু খুনের মূল পাণ্ডাকে এখনও ধরা যায়নি। এই ঘটনায় ক্রেমলিনের যোগাযোগ অস্বীকার করেছিলেন পুতিন।

আলেকজান্ডার লিৎভিনেঙ্কো ২০০৬

সরকারি নিরাপত্তা সংস্থা, ‘রাশিয়ান ফেডারেল সিকিউরিটি সার্ভিস’-এর কর্মী ছিলেন লিৎভিনেঙ্কো। কিন্তু এই সংস্থা ছেড়ে পুতিনের অন্যতম সমালোচক হয়ে যান প্রাক্তন কেজিবি এজেন্ট। ১৯৯৯-এ দেশে একের পর এক আবাসন-বিস্ফোরণে ওই নিরাপত্তা সংস্থার জড়িত থাকার অভিযোগ করেন তিনি। ২০০৬-এ লন্ডনের হোটেলে বিষাক্ত চা খান তিনি। এর তিন সপ্তাহের মধ্যেই তাঁর মৃত্যু হয়। ব্রিটিশ তদন্তে দেখা যায়, তাঁর চায়ে বিষ মিশিয়েছিল দুই রুশ এজেন্ট, আন্দ্রে লুগোভয় আর দিমিত্রি কোভতুন। উল্লেখ্য, ২০১৫-তে ‘দেশের জন্য সেবা’র স্বীকৃতি হিসাবে লুগোভয়কে মেডেল দেন পুতিন।

সের্গেই ইউশেনকভ ২০০৩

১৯৯৯-এর আবাসন-বিস্ফোরণ পুতিন সরকারের জড়িত থাকার প্রমাণ জোগাড় করছিলেন ‘লিবারেল রাশিয়া’-এর নেতা ইউশেনকভ। চার বছর পর মস্কোয় তাঁর বাড়ির সামনেই খুন হন এই প্রাক্তন সেনা অফিসার।  

ইউরি শেকোচিখিন ২০০৩

‘নোভায়া গাজেতা’-র হয়ে আবাসন বিস্ফোরণের তদন্ত করছিলেন সাংবাদিক শেকোচিখিন। ২০০৩ সালে তদন্তের সময়েই রহস্যময় রোগে আক্রান্ত হন তিনি। প্রস্তাবিত সূচি অনুযায়ী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার কিছু দিন আগেই তাঁর মৃত্যু হয়।

সৌজন্যে: এনডিটিভি 

এক ক্লিকে মনের মানুষ,খবর অনলাইন পাত্রপাত্রীর খোঁজ

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here