funeral of asma jahangir
nilanjan dutta
নীলাঞ্জন দত্ত

‘ভারতের দালাল – ওকে ভারতে কবর দিলেই ভালো হত।’

‘র-এর এজেন্ট।’

‘পশ্চিমী এজেন্ট।’

‘হিন্দুদের এজেন্ট।’

‘ইজরায়েলি এজেন্ট।’

‘শেখ মুজিবের মেয়ের এজেন্ট।’

‘পাকিস্তান কি গদ্দার।’

‘আমরিকী কুত্তি।’

‘ইন্ডিয়ান রান্ডি।’

আসমা জাহাঙ্গির (১৯৫২—২০১৮)।

১১ ফেব্রুয়ারি তাঁর মৃত্যুর খবর পাকিস্তানের গণমাধ্যমগুলির ইন্টারনেট সংস্করণে যেখানে যেখানে প্রকাশিত হয়েছে, আর তার পর থেকে এখন পর্যন্ত যেখানেই তাঁকে নিয়ে কোনো লেখা বেরোচ্ছে, কারা যেন নিরলস ভাবে তার নীচে মন্তব্যের জায়গায় ছড়িয়ে দিচ্ছে এই সব কষ্টকল্পিত কটূক্তি। এরা আমাদের চেনা। কিছু দিন আগেই গৌরী লঙ্কেশের হত্যার পর এ দেশে এদের দোসরদের দৌরাত্ম্য দেখেছি আমরা। মৃতদেরও এরা ট্রল করে পৈশাচিক আনন্দ পায়। দেশভেদে গালাগালির সারমর্মে খুব একটা তফাত হয় না, দু’একটা শব্দ বা বাক্য উলটে দিলেই হয় শুধু। মেয়ে হলে তো কথাই নেই, কুত্তি-টুত্তি এই সব শব্দ কমন পড়ে যায়। আর, উপলক্ষ ভারতীয় হলে বলা হয় পাকিস্তানে চলে যাও, পাকিস্তানি হলে বলা হয় ইন্ডিয়ায় মরো গিয়ে।

কাদের বলা হয়? গৌরী লঙ্কেশের মতো মানুষদের বলা হয়। আসমা জাহাঙ্গিরের মতো মানুষদের বলা হয়। শুধু বলাই হয় না, তাঁদের মতো ‘পাপীয়সী’দের এই দুনিয়া থেকে মুছে দেওয়ার মহান ব্রতও কেউ কেউ নিয়ে ফেলে। আসমাকে হত্যার চেষ্টা হয়েছে একাধিক বার। গৌরীর মতোই তাঁরও বাড়ি বয়ে গিয়ে ঘাতকরা হাজির হয়েছে, যদিও সে যাত্রায় প্রাণটা নিতে পারেনি। হঠাৎই মস্তিষ্কে রক্ত ঝরল, আর আসমা চলে গেলেন।

মুশকিল হল, এ-পারের গৌরীরা কেমন মানুষ, সে সম্পর্কে তবু যদি বা আমাদের কোনো ধারণা থাকে, ও-পারের আসমাদের আমরা জানতেও পারি না। আসমার মতো খুব বিখ্যাত কেউ হলে হয়তো তিনি মারা গেলে একদিন কাগজে বেরোয়, পাকিস্তানের একজন প্রথম সারির মানবাধিকার কর্মী মারা গেছেন। কিন্তু এটা বেরোয় না, তাঁকে সারা জীবন কী রকম লড়াই করতে হয়েছিল, কত কুকথা শুনতে হয়েছিল, এবং এত কুৎসা সত্ত্বেও ১৩ ফেব্রুয়ারি তাঁর শেষ যাত্রায় কী আশ্চর্য ঘটনার সাক্ষী হল লাহোরের রাজপথ, গদ্দাফি স্টেডিয়াম। সেটা জানতে পারলেও হয়তো আমাদের একটু আগ্রহ জাগত তাঁকে আর একটু বেশি করে চেনার জন্য।

মিছিলেই ছিলেন চিরকাল, মিছিলেই যে যাবেন সে আর আশ্চর্য কী? কিন্তু যারা আসমার জানাজার মিছিল দেখেছে বা যাদের তাতে হাঁটার সৌভাগ্য হয়েছে, তারা জানিয়েছে, সে এক স্মরণীয় অভিজ্ঞতা। এমন রক্ষণশীল দেশে পুরুষদের সংখ্যা ছাপিয়ে এত মেয়েরা রাস্তায়! কালো কোট পরা বড়ো বড়ো উকিলদের সঙ্গে পায়ে পা মিলিয়ে চলেছে এত জন চালচুলোহীন গরিব মানুষ! তালেবানি দাপাদাপিতে জড়সড়ো হয়ে থাকা ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়গুলোর এত নারী-পুরুষ সমস্ত ভয় ভুলে কীসের টানে বেরিয়ে এসেছে!

এমন শেষকৃত্যও এ শহরে আর দেখেনি কেউ। ভিড়ঠাসা স্টেডিয়ামের মাঝখানে আসমার কফিনের সামনে পাশাপাশি প্রার্থনা করছেন মওলানা সৈয়দ হায়দার ফারুক মওদুদি আর লাহোরের বিশপ রেভারেন্ড শাহিদ মিরাজ। তাদের দু’পাশে সার বেঁধে দাঁড়িয়ে নিজেদের নিজেদের মতো করে প্রার্থনারত একদল নান আর একদল শিখ। আরও কত যে বিচিত্র প্রার্থনা সমবেত জনতার মধ্যে থেকে শোনা যাচ্ছে, কে জানে।

মওলানা সৈয়দ হায়দার ফারুক মওদুদির নামটা দেখে কারও যদি আর কোনো মওদুদির কথা মনে পড়ে থাকে তবে তিনি ঠিকই ধরেছেন। ইনি এই উপমহাদেশের সব চেয়ে রাজনৈতিক ইসলাম মওদুদিবাদের উদ্গাতা, জামাতে ইসলামির প্রতিষ্ঠাতা আবুল আ’লা মওদুদির পুত্র। যদি অবাক হয়ে ভাবেন, তিনি আবার আসমার মতো একজনের নামাজ-এ-জানাজা পড়তে এলেন কেন, তবে ২০১৩ সালের অক্টোবর মাসে বাংলাদেশের খবরের কাগজগুলোতে প্রকাশিত হওয়া তাঁর সেই বিস্ফোরক সাক্ষাৎকারটা পড়ে নিতে পারেন। যেখানে তিনি বর্ণনা করেছেন কী ভাবে পাকিস্তানের দাবি তোলা জিন্না শেষ পর্যন্ত সেই রাষ্ট্রকে ধর্মনিরপেক্ষ রাখার চেষ্টা করেও হেরে গিয়েছিলেন, আর আবুল আ’লা মওদুদি পাকিস্তানের দাবির বিরোধিতা করেও ধর্মকেই তাঁর রাজনীতির ভিত্তি করায় দেশভাগের পর সেখানেই চলে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন এবং ইসলামী রাষ্ট্রের প্রবক্তা হয়েছিলেন। সব কিছুই রাজনীতির জন্য। এই রাজনীতির ফলটাই এখন আমরা দেখছি। ফারুক মওদুদি বলেন, ধর্মাশ্রয়ী রাজনীতি কোনো দিনই গণতান্ত্রিক হতে পারে না। এ সব কথা আমরা শুনিনি, জানি না, কারণ এমন মওলানারা পাকিস্তানে আছেন তা আমাদের জানতে দিলে অনেকের বিপদ। আমরা এটাও জানতে পারিনি যে আসমার বাবা মালিক গুলাম জিলানি বাংলাদেশের মুক্তি আন্দোলনের সময় সেখানে ইয়াহিয়া খানের সৈন্যদের অত্যাচারের বিরোধিতা করে বহু দিন জেলে কাটিয়েছিলেন আর তাঁর পক্ষে সুপ্রিম কোর্টে পিটিশন করে জিতেছিলেন সদ্যতরুণী আসমা। আসমার জন্য অন্তিম প্রার্থনা করে ফারুক মওদুদি বন্ধুকৃত্যই করেছেন।

জিয়া উল হকের রাজত্বে যখন সব চেয়ে মৌলবাদী ইসলামীদের সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধল পাকিস্তানী রাষ্ট্র, সেই সময়েই গণআন্দোলনের কর্মী হিসেবে আসমার প্রথম সারিতে উঠে আসা। সেটা বিশেষ করে মেয়েদের পক্ষে সব চেয়ে খারাপ সময়ও বটে। অ্যাকটিভিস্ট জীবনের শুরুতেই এমন আগুনে নিজেকে ঝলসে নিয়েছিলেন বলেই বোধহয় পরে তিনি এত ঝুঁকি নিয়ে কাজ করতে পারতেন। মেয়েদের অধিকার নিয়ে লড়বেন তা তো স্বাভাবিক, কিন্তু আরও এমন সব মানুষের অধিকার নিয়ে লড়াইয়ের ভার তিনি কাঁধে তুলে নিয়েছেন যে এক এক সময় তাঁর বন্ধুরাও চমকে উঠেছেন। যেমন, পাকিস্তানের মোহাজির বা বালোচ নেতাদের মতপ্রকাশের অধিকার। তা বলে আবার কাশ্মীরিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের পক্ষে কথা বলতেও তিনি পিছপা হননি। ব্লাসফেমি বা ধর্মদ্রোহে অভিযুক্ত অসংখ্য মানুষের হয়ে মামলা লড়েছেন, তাঁদের মুক্তির জন্য আন্দোলন করেছেন তিনি।

২০০৮ সালে রাষ্ট্রপুঞ্জের ধর্মীয় স্বাধীনতা বিষয়ক বিশেষ দূত হিসেবে আসমা ভারতে এসেছিলেন। সেই সময় ২০০২ সালের গুজরাত গণহত্যার সময় উদ্বাস্তু হওয়া মানুষদের আশ্রয়শিবিরে যেমন গেছেন, তেমনই গেছেন তখনকার মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর কাছে। ১৯৯৩-এর বম্বে বিস্ফোরণ ও দাঙ্গার পর থেকে যে সব মুসলিম যুবকদের নির্বিচারে তুলে নিয়ে গিয়ে সন্ত্রাসবাদী বলে জেলে পচানো হয়েছে তাদের এবং তাদের আত্মীয়বন্ধুদের অভিযোগ যেমন শুনেছেন, তেমনই দেখা করেছেন শিবসেনা নেতা বাল ঠাকরের সঙ্গে। সব কিছু নিয়েই সমালোচনা হল, মোদী-সমর্থকরা সেই সাক্ষাতের ছবি দেখিয়ে এটা তাদের নেতার এক বড়ো সাফল্য বলে দাবি করল আর পাকিস্তানি মিডিয়া তাঁকে গালি দিল, কিন্তু তা বলে রাষ্ট্রপুঞ্জে আসমার রিপোর্টে কোনো রাখঢাক রইল না।

দিল্লিতে নরেন্দ্র মোদী ক্ষমতায় আসার আগেই এস আর পেরুমল ‘ডটার অভ দি এনিমি’ নামে এক অদ্ভুত ঐতিহাসিক কল্প-উপন্যাস লিখেছিলেন। তাতে আছে, ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে পাকিস্তানে এক নারীজাগরণ হল এবং আসমা জাহাঙ্গিরের সহায়তায় প্রধানমন্ত্রী হলেন একজন জন্মসূত্রে ভারতীয়, হিন্দু নারী। তিনি আবার আসমাকে ভারতে পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত নিযুক্ত করলেন। ভারতে তখন নরেন্দ্র মোদী প্রধানমন্ত্রী, সুষমা স্বরাজের হাতে বিদেশ দফতর। তার পর কী হল, তার মধ্যে না গিয়ে বরং ভাবা যাক, এ সব লেখার মানে কী? মানে হল, অনেকেই মনে করতেন, আসমা জাহাঙ্গির অসাধ্যসাধন করতে পারেন।

কল্প-উপন্যাসে যে সময়টার কথা বলা হয়েছে, তা আসার কয়েক মাস আগেই আসমা চলে গেলেন। পেরুমলের কাহিনিতে যে অসম্ভবকে সম্ভব করার কথা বলা হয়েছে তা তিনি করতে পারতেন কিনা জানি না। আমরা শুধু এইটুকু জানি, যে পাকিস্তানে ভারতের চর অভিযোগে মৃত্যুদণ্ডাজ্ঞাপ্রাপ্ত কুলভূষণ যাদবের আইনি সহায়তার জন্য শেষ পর্যন্ত ভারত সরকার আর কুলভূষণের পরিবার আসমা জাহাঙ্গিরকেই চেয়েছিলেন। নিজের দেশে সমস্ত গঞ্জনা সয়ে আসমা হয়তো এই গুরুদায়িত্ব নিয়েও নিতেন। কুলভূষণকে বাঁচাতে পারতেন কী?

তিনি যখন আর নেই, এ সব নিয়ে জল্পনার কোনো মানে হয় না। বরং নিজেদের প্রশ্ন করা যাক, এই রকম পরিস্থিতিতে আমরা কী করতাম?

 

উত্তর দিন

আপনার মন্তব্য দিন !
আপনার নাম লিখুন