সশরীরে না গিয়েও ভ্রমণের অভিজ্ঞতা থেকে অনলাইনে পোশাক কেনার জন্য ঘরে বসে ট্রায়াল অথবা গাড়ি কেনার সময় ঘরে বসেই টেস্ট ড্রাইভিং— সবই সম্ভব মেটাভার্সে।

কলকাতা: মেটাভার্স— কতকটা যেন কমিকস অথবা সায়েন্স ফিকশন বইয়ের শব্দের মতোই শোনাচ্ছে। তবে মেটাভার্স একটি বাস্তবতা। এটা সেই দুনিয়া, যেখানে আপনার জন্য থরে থরে সাজানো রয়েছে ডিজিট্যাল উপকরণ।

বর্তমান সময়ের বহু আলোচিত প্রযুক্তির নাম এই মেটাভার্স (Metaverse)। ওয়াকিবহাল মহলের মতে, মেটাভার্স হবে ইন্টারনেট জগতের ভবিষ্যৎ। প্রযুক্তির নানান দিকের সমন্বয়ে এতে থাকছে ভার্চুয়াল রিয়্যালিটি, অগুমেন্টেড রিয়্যালিটি এবং ভিডিও-সহ সবকিছুই।

আরও সহজ করে বললে, ঘরে বসেই মেটাভার্সের মাধ্যমে ভ্রমণ করার অভিজ্ঞতা মিলবে উত্তর আমেরিকার নায়াগ্রা জলপ্রপাত থেকে বাঁকুড়ার প্রত্যন্ত কোনো অঞ্চলে। একা নয়, সঙ্গীর সঙ্গেই। আবার অনলাইনে পোশাক কেনার সময় যদি ট্রায়ালের প্রয়োজন হয়, সেটাও করে নেওয়া সম্ভব মেটাভার্সে। কিছুটা কাল্পনিক মনে হলেও, আপনি গাড়ি কেনার ক্ষেত্রে বাড়িতে বসেই টেস্ট ড্রাইভিং করতে চাইলে, সেটাও সহজে হয়ে যাবে এই নতুন ইন্টারনেট দুনিয়ায়।

মেটাভার্স কী?

মেটাভার্স হল, ব্লকচেন সাপোর্টেড একটি ভার্চুয়াল দুনিয়া। এমন এক দুনিয়া যেখানে অগুমেন্টেড রিয়্যালিটি, ভার্চুয়াল রিয়্যালিটি, হলোগ্রামের থ্রি-ডি অবতার, ভি়ডিয়ো এবং জনসংযোগের আরও নানা দিক একসঙ্গে মিশবে। গ্রিক শব্দ ‘মেটা’-র অর্থ উপর বা পরে। মেটা এবং ইউনিভার্স শব্দযুগলের সমন্বয়ে হয়েছে মেটাভার্স। যার অর্থ দাঁড়াচ্ছে, পৃথিবীর বাইরের জগৎ। যেখানে সশরীরে উপস্থিতির বিপরীতে বাস্তবের মতো উপভোগ করা যাবে প্রায় সবকিছু।

মেটাভার্স মোটেই নতুন নয়

মেটাভার্স শব্দটি কারও কারও কাছে নতুন হতে পারে, কিন্তু প্রায় তিন দশক আগেই এ ব্যাপারে ধারণা মিলেছিল কল্পকাহিনিতে। ১৯৯২ সালে কল্পবিজ্ঞানের আমেরিকান লেখক নীল স্টিফেনসন প্রথম ‘মেটাভার্স’ শব্দটি ব্যবহার করেন তাঁর ‘স্নো ক্র্যাশ’ উপন্যাসে। যেখানে তিনি কল্পনা করে ছিলেন প্রায় মানুষের মতোই বিভিন্ন অবতাররা থ্রি-ডি বহুতলে দেখা করছে। ধরে নেওয়া যেতে পারে, ৩০ বছর আগে সেই কল্পকাহিনির মাধ্যমেই আজকের মেটাভার্স দুনিয়ার ভিত গড়ে দিয়েছিলেন লেখক। এখন তো ভার্চুয়াল রিয়েলিটি আরও বেশি জনপ্রিয় এবং সাশ্রয়ী। বিশ্বব্যাপী দ্রুত বেড়েছে ইন্টারনেটের ব্যবহার। অনলাইন গেমের চাহিদা আকাশছোঁয়া।

কী ভাবে কাজ করছে?

আমরা বহু বছর ধরেই Fortnite এবং Roblox-এর মতো ভিডিও গেমগুলিতে মেটাভার্সের প্রয়োগ দেখে আসছি। এ ক্ষেত্রে ভার্চুয়াল বাস্তবতা আরও বেশি আকর্ষক হয়ে উঠেছে। ওই সব ভিডিও গেম সংস্থাগুলো মেটাভার্সের বিবর্তনের জন্য বছরের পর বছর লড়াই করেছে। যেখানে দুনিয়া জুড়ে ভার্চুয়াল ট্যুর করতে পারেন মেটাভার্স ব্যবহারকারীরা। তাঁরা একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ, এমনকী অনুষ্ঠানেও অংশ নিতে পারেন ভার্চুয়াল মাধ্যমে।

যে সব ক্ষেত্রে জোরালো প্রভাব

দ্বি-মাত্রিক ডিজিট্যাল স্থানগুলি ছাড়াও এখানে এমন এক বাস্তবতা থাকবে, যেখানে ব্যবহারকারীরা একই সঙ্গে বসবাসও করতে পারেন। নতুন একটা অর্থনীতির দরজা খুলে দিতে পারে মেটাভার্স। যেখানে প্রকৃত বিশ্বের থেকে আলাদা কিন্তু সম্পর্কিত একটি মুদ্রা ব্যবহার করে সম্পদ তৈরি, লেনদেন এবং উন্নত করা যেতে পারে।

প্রযুক্তির বিবর্তন

মেটাভার্সের বাস্তবায়নের জন্য নতুন প্রযুক্তির বিবর্তন প্রয়োজন। উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে, বাস্তব-বিশ্বের উপস্থিতি অনুকরণ করতে আপনার একটি ‘ডিজিটাল মি’ বা একজন ব্যক্তির ‘ডিজিট্যাল যমজ’ প্রয়োজন। তথ্যের গোপনীয়তা, নিরাপত্তা, বৈচিত্র্য এবং নৈতিক আচরণ নিয়ে উদ্বেগ তো রয়েছে-ই। বাস্তব জগতের সমস্যাগুলো ভার্চুয়ালে একটা নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। ফেসবুক কী ভাবে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে, সেটাও দেখার। এ ব্যাপারে ফেসবুকের কর্ণধার মার্ক জাকারবার্গ জানিয়েছেন, এই মেটাভার্সের সব রকম সুবিধা পুরোপুরি পেতে সকলকে অন্তত পাঁচ বছর অপেক্ষা করতে হবে।

ফেসবুকের ব্যাখ্যা

ইতিমধ্যেই ফেসবুক নিজের সংস্থার নাম পরিবর্তন করেছে। মেটা নামকরণ নিয়ে অনেকেই অবাক হয়েছিলেন। তবে এর মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে সুদূরপ্রসারী চিন্তাভাবনা। ফেসবুক বলছে, “মেটাভার্স হল নানা রকমের ভার্চুয়াল স্পেসে একটি সেট, যেখানে আপনি শারীরিক ভাবে উপস্থিত না থেকেও বিশ্বের যে কোনো জায়গায় অন্য কারও সঙ্গে বাস্তব দুনিয়ার মতোই যোগাযোগ করতে পারেন। অর্থাৎ, আপনি বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতে, কাজ করতে, খেলতে, শিখতে, কেনাকাটা করতে, কিছু তৈরি করতে এবং আরও অনেক কিছুই করতে সক্ষম হবেন”।

ফেসবুকের এই ব্যাখ্যা থেকে একটা বিষয় স্পষ্ট, আমরা এখনই মেটাভার্সের একটা অংশবিশেষের সঙ্গে পরিচিত। আমরা যখন অনলাইনে দীর্ঘ সময় কাটাই, সেটা আসলে মেটাভার্সেরই উপাদানের মাধ্যমে ভার্চুয়াল যোগাযোগ। তাই বলে ফেসবুক কিন্তু মেটাভার্স চালাবে না। ‘এমবডিয়েড ইন্টারনেট’ যে ভাবে বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে পরিচালিত হয়, মেটাভার্সের ক্ষেত্রেও তেমনটাই হতে চলেছে।

আরও পড়তে পারেন: এনএফটি কী? নতুন এই টোকেন নিয়ে কেন উন্মাদনা মেটাভার্স বিশ্বে

খবরের সব আপডেট পড়ুন খবর অনলাইনে। লাইক করুন আমাদের ফেসবুক পেজ। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল

বিজ্ঞাপন