WORLD-ROUND-UP 2017

১) মুসলিম দেশের ওপরে নিষেধাজ্ঞা, মেক্সিকো দেওয়াল, জেরুজালেমকে নীতি, গদিতে বসেই ট্রাম্পের বিতর্কিত সিদ্ধান্ত

দেশ জুড়ে প্রেসিডেন্ট বিরোধী বিক্ষোভের মধ্যেই জানুয়ারি মাসের তৃতীয় সপ্তাহে মার্কিন মসনদে বসলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। এবং বসেই নিলেন একাধিক বিতর্কিত সিদ্ধান্ত। প্রথমে ট্রাম্পের অভিবাসন নীতির কোপে পড়ল সাতটি মুসলিম-প্রধান দেশ, ইরাক, ইরান, সুদান, লিবিয়া, সোমালিয়া, ইয়েমেন ও সিরিয়া। ঘরে-বাইরে সমালোচিত হলেও নিজের সিদ্ধান্ত থেকে খুব একটা সরে আসেননি ট্রাম্প। দেড় মাস পর নতুন সিদ্ধান্তে ইরাক বাদে বাকি ছ’টি দেশের ওপরে তাঁর নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখেন তিনি। সেপ্টেম্বরে এই নিষেধাজ্ঞা সংক্রান্ত আরও একটি নির্দেশিকা। সেখানে ঢোকে আরও তিনটে দেশ, উত্তর কোরিয়া, ভেনেজুয়েলা এবং চাদ।

বিতর্ক হয়েছে ট্রাম্পের মেক্সিকো নীতি নিয়েও। নির্বাচনী প্রচারে তিনি বলেছিলেন মেক্সিকো সীমান্তে দেওয়াল তোলা হবে। সেই মতো কাজ করলেন তিনি। সিদ্ধান্ত নিলেন যুক্তরাষ্ট্র এবং মেক্সিকোর মধ্যে দেওয়াল তোলার।

তবে বছরের থেকে বিতর্কিত সিদ্ধান্তটি ট্রাম্প নিয়েছেন জেরুজালেমকে ইজরায়েলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে। ইজরায়েল এবং প্যালেস্তাইনের মধ্যে যাবতীয় গণ্ডগোল এই জেরুজালেমকে ঘিরে। ইজরায়েল-পালেস্তাইন মনে করে জেরুসালেম তাদের। ইজরায়েলের রাজধানী হিসেবে আন্তর্জাতিক স্তরে স্বীকৃত তেল আভিভ। আন্তর্জাতিক মহল, এমনকি নিজের মিত্র দেশের সতর্কতা উপেক্ষা করেই জেরুজালেমকে ইজরায়েলের রাজধানী ঘোষণা করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। এই সিদ্ধান্তের ফলে পশ্চিম এশিয়ায় নতুন করে ঝামেলা শুরু হওয়ার আশঙ্কা করছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, রাষ্ট্রপুঞ্জ এবং আরব দেশগুলি।

২) আইসিস হানায় ত্রস্ত বিশ্ব

আগের বছরের মতো এ বারও জঙ্গি সংগঠন আইএসের হানায় ত্রস্ত হল বিশ্ব। বছরের প্রথম দিনই হামলা হয় ইস্তানবুলের একটি নাইট ক্লাবে। বন্দুকবাজের গুলিতে প্রাণ হারান ৩৯ জন। ব্রিটেনের ক্ষেত্রে ২০১৭টি বড়ো আতঙ্কের। মার্চে শুরু হয়েছিল লন্ডনের ওয়েস্টমিনিস্টার হামলা দিয়ে। ঘটনায় মৃত্যু হয় পাঁচ জনের। এর এক মাস মরেই ম্যানচেস্টার এরিনায় বোমা বিস্ফোরণে মৃত্যু হয় ২২ জনের। ঘটনায় আহত হন আড়াইশো জন। এর সপ্তাহ দুয়েকের মধ্যেই আবার হামলা। এ বার হামলা হয় লন্ডন ব্রিজে। ঘটনায় প্রাণ হারান ৮ জন।

ব্রিটেনের পরে চোখ রাখা যেতে পারে স্পেনের দিকে। আগস্টে ট্রাক-হামলা হয় বার্সেলোনায়। ভিড়ের মধ্যে দিয়ে সাধারণ মানুষকে পিষে দিয়ে চলে যায় একটি ট্রাক। ঘটনায় মৃত্যু হয় তেরো জনের। বার্সেলোনায় হামলার ঘন্টা পাঁচেকের মধ্যেই হামলা হয়ে স্পেনের আর এক শহর আম্ব্রিসে। সেখানে মৃত্যু হয় পাঁচ জনের।

বার্সেলোনার ধাঁচেই ট্রাক হামলা হয়ে নিউ ইয়র্কের ম্যানহ্যাটানেও। ঘটনায় মৃত্যু হয় ৮ জনের। ৯/১১-এর পরে এটিই নিউইয়র্কে সব থেকে বড়ো জঙ্গি হামলা।

৩) মেক্সিকো, ইরানে ভূমিকম্প

বিজ্ঞানীদের দাবি, অন্যান্য বছরের তুলনায় ২০১৭-তে অনেক কম ভূমিকম্প হয়েছে বিশ্বে। এটা যেমন ঠিক, তেমন এটাও ঠিক যে বিধ্বংসী ভূমিকম্পে কেঁপে উঠেছে মেক্সিকো, ইরান এবং ইরাক। মাত্র দু’সপ্তাহের ব্যবধানে দুটি ভয়ংকর ভূমিকম্পে কেঁপে ওঠে মেক্সিকো। প্রথমটির তীব্রতা ছিল ৮.২, পরেরটি ৭.১। প্রথমটি হয়েছিল মেক্সিকোর দক্ষিণে চিয়াপাস উপকূলের কাছে সমুদ্রের মধ্যে। পরেরটি হয়েছিল রাজধানী মেক্সিকো সিটির কাছে। প্রথম ভূমিকম্পের তীব্রতা অনেক বেশি হলেও কেন্দ্রস্থল সমুদ্রে হওয়ায় মৃত্যু হয়েছিল ৯৮ জনের। পরেরটিতে মৃত্যু হয় সাড়ে তিনশো মানুষের। শুধুমাত্র রাজধানী শহরে মৃত্যু হয়ে প্রায় ২৩০ জনের।

তবে মৃত্যুর দিক থেকে বছরের ভয়ংকরতম ভূমিকম্পটি হয়েছিল ইরান-ইরাক সীমান্তে। প্রায় সাড়ে পাঁচশো মানুষের মৃত্যু হয়েছে এই ভূমিকম্পের ফলে, শুধুমাত্র ইরানের মৃত্যু হয়েছিল পাঁচশোর বেশি মানুষের।

৪) যুক্তরাষ্ট্র জুড়ে তাণ্ডব বন্দুকবাজের

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বন্দুক-নীতি খুবই ঠুনকো। সেই নিয়মকে কাজে লাগিয়ে সারা বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রে তাণ্ডব চালিয়ে গেল বন্দুকবাজরা। সব থেকে ভয়ংকর ঘটনাটি ঘটেছিল গত অক্টোবরে লাস ভেগাসের একটি নাইট ক্লাবে। সেখানে বন্দুকবাজের গুলিতে লুটিয়ে পড়েন ৫৮ জন, আহত হন অন্তত পাঁচশো। ভয়াবহতার নিরিখে এর পরেই থাকবে টেক্সাসের একটি গির্জায় বন্দুকবাজের হামলায় নিহত হন ২৬ জন। এ ছাড়াও বন্দুকবাজের হামলা হয়েছে কোলোরাদোর একটি শপিং মলে এবং উত্তর ক্যালিফোর্নিয়ায়। দু’টি ঘটনায় মৃত্যু হয়েছে যথাক্রমে তিন এবং চার জনের।  জুনে ফ্লোরিডাতে বন্দুকবাজের হামলায় মৃত্যু হয় পাঁচ জনের। এই ফ্লোরিডাতেই বছরের শুরুতেই বন্দুকবাজের হামলার ঘটনা ঘটে। সেখানেও পাঁচ জন গুলিতে লুটিয়ে পড়েন।

৫) যুক্তরাষ্ট্র-উত্তর কোরিয়া চাপানউতোর তুঙ্গে

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং উত্তর কোরিয়ার মধ্যে বরাবরই চাপানউতোর ছিল। ট্রাম্প গদিতে বসার পর সেই ঝগড়া আরও বেড়ে গেল। ডোনাল্ড ট্রাম্প-কিম জন উনের ঝগড়ায় ত্রস্ত হয়ে উঠল বিশ্ব। একটার পর একটা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা করে আমেরিকা এবং সেই সঙ্গে গোটা বিশ্বের টেনশন বাড়িয়ে তুলল পিয়ংইয়ং। উত্তর কোরিয়ার ওপরে নিষেধাজ্ঞার মাত্রা বাড়ানো, দেশটাকে সন্ত্রাসের পৃষ্টপোষক ঘোষণা করা, কী করেননি ট্রাম্প। তবুও উত্তর কোরিয়াকে দমানো যায়নি। শেষে উত্তর কোরিয়াকে থামানোর জন্য তার দুই মিত্র দেশ চিন এবং রাশিয়ার শরণাপন্নও হতে হয়েছে ট্রাম্পকে।

এই চাপানউতোর তো কমবেই না, বরং আগামী কয়েক বছরে আরও বাড়ারই সম্ভাবনা।

৬) জিম্বাবোয়েতে শেষ মুগাবে যুগ

mugabeস্বাধীনতা সংগ্রামী হিসেবে হয়ে উঠেছিলেন মানুষের নয়নের মণি। কিন্তু দীর্ঘ ৩৭ বছর ক্ষমতায় থেকে ধীরে ধীরে মানুষের ক্ষোভের কারণ হয়ে উঠেছিলেন তিনি। মুদ্রাস্ফীতি, দুর্নীতিতে জেরবার হচ্ছিল জিম্বাবোয়ে। এই সব কারণে অভ্যুথান করার সিদ্ধান্ত নেয় জিম্বাবোয়ে সেনা। মুগাবেকে নিরাপদে রেখেই তার বিশ্বস্ত কয়েক জন গ্রেফতার করার সিদ্ধান্ত নেয় সেনা। মুগাবে বুঝতে পারেন, তাঁর গদি টলমল। তাঁকে সরে যাওয়ার পরামর্শ দেয় নিজের দলই। অবশেষে প্রেসিডেন্ট পদ থেকে ইস্তফা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন মুগাবে। জিম্বাবোয়ের নতুন প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেন এমার্সন নাঙ্গাগওয়া। বিশ্বের ইতিহাসে রক্তহীন অভ্যুথান করার জন্য জিম্বাবোয়ের সেনার প্রশংসা প্রাপ্য।

৭) স্পেন থেকে আলাদা হওয়ার জন্য ঐতিহাসিক গণভোট কাতালোনিয়ায়

স্পেন থেকে আলদা হয়ে স্বাধীন রাষ্ট্রের দাবিতে ঐতিহাসিক গণভোট অনুষ্ঠিত হল কাতালোনিয়ায়। কাতালোনিয়ার প্রধান শহর বার্সেলোনা। নতুন রাষ্ট্রে কাতালোনিয়ার পক্ষে ভোট পড়ে প্রায় ৯০ শতাংশ। মাত্র দশ শতাংশ মানুষ স্পেনেই থেকে যেতে চেয়েছিলেন। এই গণভোটের পরেই স্পেন সরকার বিশাল আকারে ধরপাকড় শুরু করে। শুরু থেকেই তারা এই গণভোটকে অবৈধ ঘোষণা করেছিল।

৮) রোহিঙ্গা ইস্যু

মায়ানমারের রাখাইন প্রদেশ থেকে রোহিঙ্গা মুসলিমদের বিতাড়িত হওয়ার ঘটনা নতুন কিছু নয়। কিন্তু এই ইস্যুটা নতুন মাত্রা পেল এ বছর আগস্টে। ২৫ আগস্ট মায়ানমারের নিরাপত্তাবাহিনীর ওপরে হামলা চালায় রোহিঙ্গাদের একটি জঙ্গি সংগঠন। ঘটনায় মৃত্যু হয় নিরাপত্তাবাহিনীর বারোজন জওয়ানের। এর পালটা হিসেবে নিরপরাধ রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপরে আক্রমণ শুরু করে মায়ানমার সেনা। স্থানীয় বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী মানুষদের নিয়ে রোহিঙ্গা মুসলিমদের বাড়ি ঘরদোর জ্বালিয়ে দেয় মায়ানমার সেনা। উপায়ন্তর না দেখে দলে দলে রোহিঙ্গা মুসলিম বাংলাদেশে চলে যেতে শুরু করে।

দলে দলে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের গ্রহণ করলেও অসহায় অবস্থা হয় বাংলাদেশের। রাষ্ট্রপুঞ্জের খবর বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে প্রায় চার লক্ষ রোহিঙ্গা শরণার্থী। রোহিঙ্গা পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে বিদ্রুপের শিকার হন মায়ানমারের নেত্রী তথা নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী আন সান সু কি। তাঁর নোবেল পুরস্কার কেড়ে নেওয়ার দাবি ওঠে বিভিন্ন মহল থেকে। জাত হিসেবে রোহিঙ্গাদের মুছে দেওয়ার অভিযোগ রাষ্ট্রপুঞ্জের মানবাধিকার সংগঠনের প্রধান। মায়ানমার সেনার গুলিতে অসংখ্য রোহিঙ্গার মৃত্যু হয়েছে। যদিও অনেকাংশেই তথ্য গোপন করেছে মায়ানমার সেনা। অভিযোগ, পরিস্থিতি যাচাইয়ের জন্য মায়ানমারে যেতে চাইলেও মানবাধিকার কর্মীদের সে দেশের যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না।

৯) পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নওয়াজ শরিফের অপসারণ

পানামা পেপারে নাম জড়িয়ে যাওয়ায় এমনিতেই গদি টলমল ছিল পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের। এ বছর জুলাইয়ে তাঁকে প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে বরখাস্ত করে সে দেশের সুপ্রিম কোর্ট। পাশাপাশি নির্দেশ দেয় আগামী পাঁচ বছর নির্বাচনে লড়তে পারবেন না তিনি।

বিপুল অঙ্কের বেনামী সম্পত্তি রাখার অভিযোগে শরিফ এবং তাঁর তিন সন্তানের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করার নির্দেশ দেয় সুপ্রিম কোর্ট। শরিফের পাশাপাশি মন্ত্রিত্বপদ খোয়ান পাকিস্তানের অর্থমন্ত্রী ইশাক দারও। শরিফ বরখাস্ত হওয়ায় পাকিস্তানের নতুন প্রধানমন্ত্রী হন শাহীদ খাকান আব্বাসি।

১০) জিল্যান্ডিয়া, বিশ্বের অষ্টম মহাদেশ

কোন মহাদেশের অন্তর্গত দ্বীপরাষ্ট্র নিউজিল্যান্ড? এই প্রশ্ন করা হলে বিশ্বের প্রায় প্রত্যেক মানুষই বলবেন ওসেনিয়া। বিজ্ঞানের নতুন আবিষ্কার কিন্তু সেই তত্ত্বকে খারিজ করে দিল। একটি গবেষণার ভিত্তিতে বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেছেন একটি নতুন মহাদেশের। বিশ্বের অষ্টম এই মহাদেশের নাম জিল্যান্ডিয়া। তিন লক্ষ বর্গ মাইল আয়তনের এই মহাদেশের প্রায় ৯৪ শতাংশ রয়েছে প্রশান্ত মহাসাগরের তলায়। নিউজিল্যান্ড এবং প্রশান্ত মহাসাগরের আরও একটি দ্বীপ রাষ্ট্র নিউক্যালেডোনিয়া, এই মহাদেশটির বাকি ছ’শতাংশ জায়গার অধিকারী।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here